ভাঙা বোর্ড আর চা-বিস্কুটের শক্তিতেই এশিয়ান গেমসের স্বপ্ন

আপডেট : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:৩১ এএম

জাপানের আইচি-নাগোয়ায় আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হতে যাচ্ছে ২০তম এশিয়ান গেমস। এই ঐতিহাসিক আসরে প্রথমবারের মতো অংশ নিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ সার্ফিং দল। লাল-সবুজের প্রতিনিধিত্ব করবেন কক্সবাজারের দুই উদীয়মান সার্ফার মো. মান্নান (২০) ও ফাতেমা আক্তার (১৬)। কিন্তু জীবনের সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক মঞ্চে নামার আগেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন দুজন। কারণ দীর্ঘদিনের ছায়াসঙ্গী ও প্রশিক্ষক রাশেদ আলমকে বাদ দিয়েই দল পাঠাচ্ছে বাংলাদেশ সার্ফিং অ্যাসোসিয়েশন।

বছরের পর বছর ধরে যে কোচের অধীনে মান্নান ও ফাতেমা নিজেদের গড়ে তুলেছেন, অ্যাসোসিয়েশনের সিদ্ধান্তে তাকে রেখে জাপানে যাচ্ছেন ফোকাল পারসন সাইফুল্লাহ সিফাত। এই সিদ্ধান্তে চরম হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অ্যাথলেটরা।

১৪ বছর ধরে সার্ফিং করা মো. মান্নান বলেন, ‘শুরু থেকেই রাশেদ ভাই আমার কোচ। তার হাত ধরেই দেশ-বিদেশের নানা প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছি। ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় মঞ্চে সেই মানুষটি পাশে না থাকা আমার জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক।’

একই সুর ফাতেমা আক্তারের কণ্ঠেও। তার মতে, সমুদ্রের পরিবেশ, ঢেউ ও আবহাওয়া বুঝে তাৎক্ষণিক নির্দেশনা দিতে অভিজ্ঞ কোচের বিকল্প নেই। ফাতেমা বলেন, ‘রাশেদ ভাই না থাকলে আমার খেলায় আসা তো দূরের কথা, লেখাপড়াই হতো না। সাত বছর ধরে যিনি আমাদের সব খরচ বহন করে প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন, অ্যাসোসিয়েশনের কয়েকজন মানুষ হঠকারী সিদ্ধান্ত নিয়ে তাকে বাদ দিয়েছেন। যার সঙ্গে আমাদের কখনো অনুশীলনই হয়নি, তিনি কীভাবে আন্তর্জাতিক মঞ্চে আমাদের গাইড করবেন?’

মাঠের বাস্তবতা অবশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের লাবণী পয়েন্টে সরেজমিন দেখা যায়, বাংলাদেশ সার্ফ গার্লস অ্যান্ড বয়েজ ক্লাবের তরুণদের নিবিড় প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন রাশেদ আলম। সেখানে অনুশীলনে ব্যস্ত ছিলেন এশিয়ান গেমসে মনোনীত ফাতেমা ও মান্নানও। কিন্তু দেখা গেল না অ্যাসোসিয়েশনের ফোকাল পারসন সাইফুল্লাহ সিফাতের। নিজের দায়িত্ব দাবি করে সাইফুল্লাহ সিফাত বলেন, ‘অ্যাসোসিয়েশন থেকে একজন কর্মকর্তা পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে, তাই আমি যাচ্ছি। সেখানে সার্ফিং বোঝেন এমন একজন থাকা দরকার। তা ছাড়া আমি নিজেই তাদের কোচিং করাই এবং অ্যাসোসিয়েশনের ফোকাল পারসন হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি।’

অন্যদিকে কোচ রাশেদ আলম জানান, ‘অ্যাসোসিয়েশনের কোচ হিসেবে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে কাজ করছি। প্রথমে চারজনের দল যাওয়ার কথা থাকলেও হঠাৎ জানানো হয় একজন কর্মকর্তা যাবেন। অন্য সব দেশ যখন পূর্ণাঙ্গ দল পাঠাচ্ছে, সেখানে আমাদের সার্ফারদের কোচ ছাড়া পাঠানো পারফরম্যান্সের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলবে।’

যোগাযোগ করা হলে সার্ফিং অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মোয়াজ্জম হোসেন চৌধুরী রোকন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, ‘রাশেদ আলম তাদের ব্যক্তিগত কোচ, তাই তাকে নেওয়া হয়নি। কোটা কমিয়ে সার্ফারসহ তিনজনের বাধ্যবাধকতা তৈরি হওয়ায় আমরা স্থানীয় কোচের বদলে জাতীয় কোচ হিসেবে সাইফুল্লাহ সিফাতের নাম অন্তর্ভুক্ত করেছি।’

সুযোগ-সুবিধা ও পৃষ্ঠপোষকতার তীব্র অভাব

নিয়মিত অনুশীলনের জন্য নেই ব্যায়ামাগার, নেই চেঞ্জিং রুম, এমনকি মানসম্মত সার্ফবোর্ডও নেই। বিদেশি অ্যাথলেটদের ফেলে দেওয়া বা ব্যবহৃত পুরনো সেকেন্ডহ্যান্ড বোর্ড দিয়েই বিশ্বমঞ্চের প্রস্তুতি নিচ্ছেন কক্সবাজারের তরুণরা।

কক্সবাজারের আরেক নারী সার্ফার মহিমা আক্তার মিলি আক্ষেপ করে বলেন, ‘ভারতে এশিয়ান কাপে গিয়ে দেখেছি তাদের উন্নত জিম ও প্রশিক্ষণ সুবিধা। আর আমাদের পোশাক পাল্টানোর জায়গাটুকুও নেই। পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে অনেক প্রতিশ্রুতিশীল সার্ফার অকালেই হারিয়ে যাচ্ছে।’

চা-বিস্কুটে ক্যালরি খোঁজার সংগ্রাম : প্রতিদিন সকালে কক্সবাজারের বাদশাঘোনা থেকে সাড়ে চার কিলোমিটার পথ হেঁটে লাবণী পয়েন্টে অনুশীলনে যান ফাতেমা ও মহিমা। লোনা পানিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঢেউয়ের সঙ্গে যুদ্ধ করার পর তাদের পুষ্টির জোগান দেয় চায়ের দোকানের শিঙাড়া, রুটি কিংবা চা-বিস্কুট।

ফাতেমা স্মিত হেসে বলেন, ‘অনুশীলন শেষে আমাদের খাবার বলতে চা-বিস্কুট বা শিঙাড়া। কোনো স্পন্সর বা সরকারি সহযোগিতা আমাদের নেই।’ মান্নান যোগ করেন, ‘এই সামান্য খাবারের খরচও দেন রাশেদ ভাই। এনজিওতে চাকরি করে নিজের আয়ের একটি অংশ দিয়ে তিনি প্রায় ৩০ জন ছেলেমেয়েকে আগলে রেখেছেন। সেখানে পর্যাপ্ত ক্যালরি পাওয়ার চিন্তা করাও বিলাসিতা।’

অবশ্য সাইফুল্লাহ সিফাত দাবি করেন, এশিয়ান গেমসের দুই সার্ফারের প্রস্তুতির সম্পূর্ণ খরচ অ্যাসোসিয়েশন বহন করবে। তবে কবে বা কীভাবে তা প্রদান করা হবে, সে বিষয়ে তিনি নির্দিষ্ট করে কিছু জানাতে পারেননি।

এশিয়ান গেমসে প্রথমবারের মতো সার্ফিংয়ে অংশ নিয়ে ইতিহাস গড়ার অপেক্ষায় বাংলাদেশ। কিন্তু ইতিহাসের সেই মুহূর্তের আগে কোচের অনুপস্থিতি, পুরনো সরঞ্জাম, পুষ্টির সংকট এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাবই যেন বাংলাদেশের দুই সার্ফারের সামনে সবচেয়ে বড় ঢেউ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত