মানবাধিকার কমিশন, সম্পত্তি হস্তান্তর ও গুম প্রতিরোধ বিল সংসদে পাস

আপডেট : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৫১ এএম

জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের আপত্তির মধ্যেই জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার এবং সম্পত্তি হস্তান্তরে আজীবন ভোগস্বত্বের আইনি স্বীকৃতি দিয়ে বিল পাস হয়েছে। গতকাল রবিবার জাতীয় সংসদে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীরা বিল ৩টি পাসের জন্য উপস্থাপর করেন। বিলগুলোর কয়েকটি বিধান নিয়ে আপত্তি জানিয়ে সংসদ অধিবেশন থেকে দুই দফা ওয়াকআউট করেছেন বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা। এর মধ্যে মানবাধিকার কমিশন বিলকে কালো আখ্যায়িত করে বিরোধী দল মুখে কালো কাপড় বেঁধে অধিবেশন থেকে ওয়াকআউট করে। এরপরে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল, ২০২৬’, ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ এবং ‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ কণ্ঠভোটে পাস হয়।

স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অধিবেশনে প্রথমে ‘ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল-২০২৬’ নিয়ে আলোচনা হয়। বিল নিয়ে বিরোধী দলের আপত্তির কেন্দ্রবিন্দু ধর্মীয় উত্তরাধিকার আইন। বিলটির কয়েকটি বিধান কোরআন-সুন্নাহর মূলনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে বলে দাবি করেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, উইল বা হেবার ক্ষেত্রে যার নামে সম্পত্তি দেওয়া হবে, তাকে মালিকানা ভোগের সুযোগ দিতে হবে। মৃত্যুর পর কার্যকর হওয়ার বিষয়টি হেবা নয়, বরং অছিয়তের আওতায় পড়ে। অছিয়তের ক্ষেত্রেও কাকে করা যাবে এবং সর্বোচ্চ কত অংশ করা যাবে, সে বিষয়ে কোরআন-হাদিসে নির্দেশনা রয়েছে। আইনটি মানুষের ইমান-আকিদার সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে যথাযথ পর্যালোচনা ছাড়া এটি পাস করা হলে সমাজে বিভ্রান্তি ও বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে।

এর আগে জামায়াতের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেনও বিলটির বিরোধিতা করেন। তার অভিযোগ, আজীবন ভোগদখলের অধিকার রেখে সম্পত্তি দানের সুযোগ তৈরি হলে মুসলিম উত্তরাধিকার বা মিরাসের বিধান পাশ কাটানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বলেন, বাবা-মাকে সন্তানদের নির্যাতন ও সম্পত্তি দখল থেকে রক্ষায় বিলটি গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য আইনমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাই। তবে সন্তান বাবা-মাকে অবহেলা বা নির্যাতন করলে দান বাতিলের সুযোগ রাখা উচিত। পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দাতাকে পারিবারিক আদালতে রেজিস্ট্রি দলিল বাতিলের আবেদন করার সুযোগ দিতে হবে। দাতার লিখিত সম্মতি ছাড়া ওই সম্পত্তি বন্ধক রেখে ঋণ নেওয়া বা তৃতীয় পক্ষের কাছে হস্তান্তর নিষিদ্ধ করা এবং দ্রুত বিচারের ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন।

তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, বিলটির উদ্দেশ্য উত্তরাধিকার আইন পরিবর্তন করা নয়। বরং সম্পত্তি দান করার পর দাতার জীবনকাল পর্যন্ত তার ভোগদখলের অধিকার নিশ্চিত করাই এর অন্যতম উদ্দেশ্য। বিলটির উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, প্রচলিত আইনে সম্পত্তি দানের পর দাতার আজীবন ভোগাধিকারের বিষয়টি স্পষ্ট নয়। নতুন বিধানের মাধ্যমে পিতা-মাতা, দাদা-দাদি, নানা-নানি কিংবা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে দাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত সম্পত্তি ভোগ ও ব্যবহার করার সুযোগ পাবেন। বিলটিতে নতুন ১২২এ ও ১২২বি ধারা যুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে। তিনি বলেন, এই বিধান সব ধর্মাবলম্বীর জন্য প্রযোজ্য হবে। আলোচনার এক পর্যায়ে সন্ধ্যা ৭টা ৫৬ মিনিটে বিরোধী দলের সদস্যরা অধিবেশন থেকে বেরিয়ে যান। পরে কণ্ঠভোটে বিলটি পাস হয়। বিল পাসের কয়েক মিনিট পর বিরোধী দলের সদস্যরা সংসদে ফিরে আসেন।

এরপর মানবাধিকার কমিশন বিল পাসের কার্যক্রম শুরু হয়। আইনমন্ত্রী এই বিল পাসের প্রস্তাব উত্থাপন করলে ফ্লোর নেন বিরোধীদলীয় নেতা। এ সময় অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ বাতিল করে নতুন করে ‘দুর্বল’ আইন পাসের জন্য জাতীয় সংসদে বিল উত্থাপন করা হয়েছে দাবি করে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, সরকারি দলের পক্ষ থেকে যখন বিলগুলো বাতিল করা হয়, তখন বলা হয়েছিল, শক্তিশালী ও আরও ভালো আকারে তারা নিয়ে আসবে। মানবাধিকারসংক্রান্ত যে বিলটা এসেছে, সেখানে আইনের স্পষ্ট দ্বৈত প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে। মানবাধিকার কমিশনকে একটা ইউনিফর্ম অথরিটি দেওয়া হয়নি। আমরা এই আইনের আলোচনায় অংশ নিচ্ছি না এবং ওয়াকআউট করছি।’ এরপরে বিল পাসের কার্যক্রম শুরু হয়।

এ সময় বিল নিয়ে রুমিন ফারহানা চারটি প্রস্তাব করেন। প্রস্তাবগুলো হলোÑ ১. কমিশনের নির্দেশ অমান্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা : কমিশনের নির্দেশ অমান্য করলে ক্ষমতাবান কর্মকর্তা বা বাহিনীর বিরুদ্ধে ‘তাৎক্ষণিক শাস্তিমূলক কিংবা আদালত অবমাননার মতো ব্যবস্থা নেওয়ার’ আইনি ক্ষমতা দিতে হবে। ২. স্বাধীন তদন্ত ব্যবস্থা : ‘কমিশনের তদন্তে কোনো কর্মকর্তা পুলিশ থাকবে না। এটি পরিচালিত হবে সম্পূর্ণ স্বাধীন ফরেনসিক ও তদন্ত ক্যাডারের মাধ্যমে।’ ৩. নিজস্ব প্রসিকিউশন ও ট্রাইব্যুনাল : দুর্নীতি দমন কমিশনের মতো নিজস্ব প্রসিকিউশন উইং, আইনজীবী প্যানেল এবং বিশেষ মানবাধিকার ট্রাইব্যুনালে সরাসরি বিচার পরিচালনার এখতিয়ার দিতে হবে। ৪. সাক্ষী ও ভুক্তভোগী সুরক্ষা : ক্ষমতাশালী মহলের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়া ব্যক্তিদের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তায় ‘উইটনেস প্রোটেকশন’ বা আইনি সুরক্ষা ব্যবস্থা রাখতে হবে। তার প্রস্তাব কণ্ঠভোটে নাকচ হয়। পরে বিলটি পাস হয়। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল, ২০২৬-এর মাধ্যমে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০০৯ রহিত করে নতুন আইনি কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। বিল অনুযায়ী, কমিশনে একজন চেয়ারম্যান ও চারজন কমিশনার থাকবেন। তাদের মধ্যে অন্তত একজন নারী এবং জাতীয় সংখ্যালঘু বা সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর অন্তত একজন সদস্য থাকবেন। নিয়োগের জন্য গঠিত বাছাই কমিটিতে একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, একজন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং জাতীয় সংখ্যালঘু ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের রাখা হয়েছে। এসব জনগোষ্ঠীর যোগ্য প্রার্থীদের নিয়োগের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিধান রয়েছে। কমিশনের এখতিয়ার স্পষ্ট করা এবং অভিযোগ জানানোর প্রক্রিয়া সহজ করার পাশাপাশি তাৎক্ষণিক ঝুঁকিতে থাকা ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা এবং তদন্ত চলাকালে আরও ক্ষতি প্রতিরোধে অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ দেওয়ার ক্ষমতা কমিশনকে দেওয়া হয়েছে।

এরপর গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল পাসের জন্য উত্থাপন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। এ সময় বিরোধী দল উপস্থিত ছিল না। রুমিন ফারহানা গুমকে স্বতন্ত্র অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া এবং গোপন বন্দিশালা নিষিদ্ধ করার উদ্যোগকে নীতিগতভাবে সমর্থন করেন। তবে বিলটি আরও নিবিড় যাচাই-বাছাইয়ের দাবি জানান তিনি। বিলটি সংশোধনের জন্য তিনি পাঁচটি প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, গুমের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের আইন দায়সারা বা তাড়াহুড়ো করে পাস না করে প্রয়োজনীয় সংশোধনসহ বিলটি আরও যাচাই-বাছাই করা প্রয়োজন।

সরকারের অবস্থান তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, নতুন গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন আগের অধ্যাদেশের তুলনায় বেশি শক্তিশালী ও কার্যকর। গুমের শিকার ব্যক্তি ও তার পরিবারের জন্য আইনি প্রতিকার পাওয়ার পথ সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, আগের অধ্যাদেশে গুমের শিকার ব্যক্তি বা পরিবারের আদালতে যাওয়ার ক্ষেত্রে কিছু বাস্তব জটিলতা ছিল। নতুন আইনে তাদের সরাসরি আদালতে যাওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে গুমের বিভিন্ন ধরনকে আইনের আওতায় এনে শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।  ‘এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স’ বা জোরপূর্বক গুমের বিচার আগের মতোই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ারে থাকবে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত