সাতাশ জানুয়ারি ২০১৮-এর দুপুরের ঘটনা। দুদিনব্যাপী সুন্দরবনের কচিখালীর পাখি-প্রাণী দেখে ছুটা কটকা খাল দিয়ে কটকা যাচ্ছিলাম। ঘড়িতে যখন ১২টা ঠিক তখন একটি গোল গাছের তলায় অতি বিরল ও মহাবিপন্ন রহস্যময় এক পাখির দেখা পেলাম। প্রায় ২২ বছর খোঁজার পর এমন একটি পাখির দেখা পেয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়লাম। হাত কাঁপতে লাগল। ফলে ভালো ছবি তুলতে পারলাম না। মুহূর্তেই নিজেকে সামলে নিলাম। কয়েক মিনিটের মধ্যেই আবারও পুরুষ পাখিটির দেখা পেলাম। এবার বেশকিছু ভালো ছবি তোলা গেল। প্রায় পঞ্চাশ মিনিটের মধ্যে একই প্রজাতির আরও দুটি পুরুষ পাখির দেখা পেলাম। তবে অতি লাজুক পাখিগুলো দ্রুত পালিয়ে যাওয়ায় ওদের ছবি তুলতে পারলাম না।
দিনের বাকি সময় কটকা ও জামতলীতে কাটালাম। পরদিন ভোরে লঞ্চ ছাড়ল। এবার হোমরা বা সুন্দরী খালে গোলবনের রহস্যময় পাখিটিকে খোঁজা হবে। কিন্তু অন্যরা সময়মতো ঘুম থেকে উঠতে পারলেও আমি পারলাম না। পক্ষী আলোকচিত্রী ফরিদী নোমানের ডাকে যখন ঘুম ভাঙল তখন সকাল সাড়ে ৭টা। ঘুম ঘুম চোখে চশমা না পরেই ক্যামেরা হাতে লঞ্চের উপরে উঠে এলাম। পাখিটি তখন খাল পার হচ্ছিল। বেশ দেরি করে ফেলেছি। কাজেই আমার ক্যামেরার ফ্রেমে ওর প্রস্থানের ছবিটিও ধরতে পারলাম না। কিন্তু কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই খালের পাড়ে ঝোঁপের নিচে একটি স্ত্রী পাখিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। দ্রুত ক্লিক করা শুরু করলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই আরও দুটিকে দেখলাম। পানিতে ভাসমান অবস্থায় আরেকটি পুরুষের ছবি তুললাম। চশমা ছাড়া ছবি তুলতে বেশ কষ্ট হলো। তারপরও মহাবিপণœ পাখিটির ছবি তুলতে পেরে ধন্য হয়ে গেলাম। এক সফরে এই প্রজাতির সাতটি পাখি দেখা ভাগ্যের ব্যাপার।
পরে বহুবার পাখিটির খোঁজ করেছি সুন্দরবনের বিভিন্ন স্থানে, কোথাও পাইনি। সর্বশেষ নলিয়ান রেঞ্জের কালাবগীতেও খোঁজ করলাম। কিন্তু দুদিন ধরে চেষ্টা করেও পাখিটির দেখা পেলাম না। একটি কথা জেনে রাখা দরকার, গোলবনের রহস্যময় এই পাখিটি বর্তমানে বাঘের থেকেও বেশি বিরল ও বিপণœ। তার খোঁজে গত ২৮ বছর ধরে সুন্দরবন যাচ্ছি। কিন্তু দেখা পেয়েছি মাত্র একবার। সূত্রমতে, বিশ^ব্যাপী গোলবনের রহস্যময় পাখিটির মাত্র ৩০০টির মতো সদস্য বেঁচে আছে যার মধ্যে প্রায় শ-দুয়েক সুন্দরবনে থাকতে পারে।
বাঘের থেকেও বিরল গোলবনের রহস্যময় এই পাখিটি এদেশের মহাবিপণœ আবাসিক পাখি সুন্দরী হাঁস বা গেইলো হাঁস। অন্তত সুন্দরবনের জেলে-বাওয়ালি-মৌয়াল-জোংরাখুটাদের কাছে ওরা এই নামেই পরিচিত। অবশ্য অনেকে হাঁসপাখি বা বাইলা হাঁসপাখি নামেও ডাকেন। তবে নাম হাঁসপাখি হলেও প্রকৃতপক্ষে এটি হাঁস-রাজহাঁসের ধারে-কাছের পাখিও নয়। বরং জলমুরগি, ডাহুক, কোড়া ও সারস ক্রেন পাখিদের নিকটাত্মীয়। ইংরেজি নাম গধংশবফ/অংরধহ ঋরহভড়ড়ঃ। হ্যালিওরনিথিডি গোত্রের পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম ঐবষরড়ঢ়ধরং ঢ়বৎংড়হধঃধ।
সুন্দরী হাঁসের দেহের দৈর্ঘ্য ৪৫-৫৬ সেন্টিমিটার, প্রসারিত ডানা ৭০ সেন্টিমিটার ও গড় ওজন ৫১০ গ্রাম। দেহের পালকের মূল রঙ গাঢ় বাদামি। লম্বা গলাটি হালকা বাদামি। পিঠ জলপাই-বাদামি। ডানার প্রাথমিক পালক কালচে জলপাই-বাদামি। বুক-পেট-লেজতল হালকা বাদামি। চোখের পেছন থেকে ঘাড়ের পার্শ্বদিক পর্যন্ত সাদা ডোরা রয়েছে। হলুদ চঞ্চুটি লম্বা ও ড্যাগারের মতো চোখা। পায়ের আঙুলে পর্দা থাকলেও তা হাঁসের মতো পায়ের পাতায় যুক্ত থাকে না। বরং দেখতে অনেকটা মাছের পাখনার মতো। পায়ের রঙ সবুজাভ-হলুদ। স্ত্রী-পুরুষের চেহারায় সামান্য পার্থক্য রয়েছে। পুরুষের ঘাড়, গলার সম্মুখভাগ ও চিবুক কালো, স্ত্রীটির ক্ষেত্রে যা সাদা। পুরুষের চোখ গাঢ় বাদামি ও চঞ্চুর গোড়ায় শিংজাতীয় পদার্থ থাকে। অন্যদিকে, স্ত্রীর চোখ হলুদ ও চঞ্চুর গোড়ায় শিং থাকে না। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখির কপালের ধূসর ও চঞ্চুর ঘিয়ে-হলুদ রঙ ছাড়া বাকি সবই দেখতে স্ত্রীর মতো।
অতি লাজুক এই পাখিটি একাকী, জোড়ায় বা ছোট পারিবারিক দলে বিচরণ করে। অল্প পানিতে সাঁতার কেটে বা কাদায় হেঁটে চিংড়ি, ছোট মাছ, কাঁকড়া, ব্যাঙাচি, শামুক, জলজ কীটপতঙ্গ ইত্যাদি খায়। ভয় পেলে বা বিপদ দেখলে চঞ্চুসমেত মাথা পানিতে ভাসিয়ে ডুবে থাকে বা দ্রুত দৌড়ে পালায়। এরা হাঁসের মতোই উচ্চস্বরে ‘প্যাক-প্যাক ----’ শব্দে ডাকে। জুলাই থেকে আগস্ট প্রজননকাল। এ সময় মাটি বা পানি থেকে ১-৩ মিটার উপরে গাছের বড় শাখায় ঘন পাতার আড়ালে কাঠিকুটি ও শিকড়-বাকড় দিয়ে স্তূপের মতো গোলাকার বাসা বানায়। ডিম পাড়ে চার থেকে আটটি। লম্বাটে ডিমগুলো ধূসরাভ সাদা, যাতে থাকে গাঢ় ছিটছোপ। সদ্যফোটা ছানার কোমল পালক ধূসর ও চঞ্চুর উপর সাদা ফোটা থাকে। আয়ুষ্কাল ১০ বছরের বেশি।
একসময় বাংলাদেশ ছাড়াও পাখিটি উত্তর-পূর্ব ভারত, মিয়ানমার, লাওস, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার নিচু অঞ্চলজুড়ে বিস্তৃত ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক তথ্য-উপাত্ত থেকে দেখা যায়, পাখিটি তার বিস্তৃত এলাকার বড় একটি অংশ থেকেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বর্তমানে এদের প্রজনন ও টিকে থাকার নিশ্চিত আবাস্থল মূলত সুন্দরবন ও কম্বোডিয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এ ছাড়া মিয়ানমার ও লাওসে এদের যে জনগোষ্ঠী টিকে আছে, তাদের বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত অনিশ্চিত। আর বাদবাকি দেশগুলোতে তাদের অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। তবে, অত্যন্ত শংকার কথা হলো এক সময় যদিও পাখিটি এদেশে বিপণœ পাখির তালিকায় ছিল, কিন্তু ২০২২ সালের এপ্রিলে এটি আরও এক ধাপ উপরে উঠে মহাবিপণেœর তালিকায় নাম লেখায়। বিভিন্ন কারণের মধ্যে মাংসের জন্য সুন্দরবনের জেলে ও অন্যদের হাতে ওদের ডিম ও বড় পাখি শিকার অন্যতম। এ ছাড়া বনে মানুষের অতিরিক্ত আনাগোনা এবং অন্য কারণও রয়েছে।
বর্তমানে সুন্দরবনে বাঘ রক্ষার জন্য কোটি কোটি টাকা খরচ হলেও সুন্দরী হাঁস রক্ষার জন্য তেমন কোনো বরাদ্দ আছে বলে জানা নেই। বনবিভাগ এদের রক্ষার জন্য আদৌ তেমন কোনো শক্তিশালী পদক্ষেপ নিয়েছে কি না জানি না। তবে দ্রুত জোরালো পদক্ষেপ না নিলে গোলাপিশিরের মতো এটি চিরতরে হারিয়ে যাবে। কাজেই পাখিটির বিলুপ্তি ঠেকাতে সর্বপ্রথম এদের সম্ভাব্য আবাস এলাকায় জেলেদের চরপাটা জাল পাতা বন্ধ করতে হবে ও নিয়মিত মনিটরিং করতে হবে। এরপর এদের প্রজনন প্রতিবেশ রক্ষাসহ নানা পদক্ষেপ নিতে হবে। কামনা করি অতি বিরল, মহাবিপণœ ও আমাদের সুন্দরবনের অলংকার গোলবনের রহস্যময় সুন্দরী হাঁস বেঁচে থাকুক অনন্তকাল।
লেখক : পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ