দিন দিন বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। সংক্রমণ কমার কোনো লক্ষণ নেই। সেপ্টেম্বরের শুরু থেকেই রোগীর চাপ উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। প্রতিদিনই হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা হাজারের ওপরে থাকছে। এমন পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, সেপ্টেম্বরের শেষ থেকে অক্টোবরের শুরুর দিকে দেশে ডেঙ্গুর সংক্রমণের পিক সময় আসতে পারে। ডেঙ্গুর এমন ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায় দেশব্যাপী ‘ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান’ পরিচালনা করতে যাচ্ছে সরকার। আগামীকাল শনিবার সকাল ৯টায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন।
চলতি মাসের প্রথম ১০ দিনেই ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১২ হাজার ৫৮৪ জন। একই সময়ে ডেঙ্গুতে মারা গেছেন ৪২ জন। অর্থাৎ সেপ্টেম্বরে প্রতিদিন গড়ে এক হাজার ২৫৮ জনের বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং প্রতিদিন গড়ে চারজনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
গত বুধবার এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত বলেন, সেপ্টেম্বরের শেষে ও অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহ পিক সিজন হতে পারে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার তিন মাসব্যাপী বিশেষ ডেঙ্গু সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন শুরু করতে যাচ্ছে। এ ক্যাম্পেইনের আওতায় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এবং সাধারণ জনগণকে সম্পৃক্ত করে সম্মিলিতভাবে ডেঙ্গু প্রতিরোধে কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, আগস্ট ছিল এ বছরের সবচেয়ে ভয়াবহ মাস। ওই মাসে ২০ হাজার ৫৩৬ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন এবং ৪৩ জনের মৃত্যু হয়। তবে সেপ্টেম্বরের মাত্র ১০ দিনেই আক্রান্তের সংখ্যা ১২ হাজার ছাড়িয়ে যাওয়ায় চলতি মাসেও সংক্রমণ আরও বেশি গতিতে এগোচ্ছে। বছরের মোট ডেঙ্গু রোগীর প্রায় ২৬ শতাংশই সেপ্টেম্বরের প্রথম ১০ দিনে শনাক্ত হয়েছে।
চলতি বছরের সামগ্রিক চিত্রেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছেন ২১ থেকে ২৫ বছর বয়সী ৬ হাজার ৯৯৮ জন এবং ২৬ থেকে ৩০ বছর বয়সী ৬ হাজার ৯৬৪ জন। এরপর রয়েছে ১৬ থেকে ২০ বছর বয়সী ৬ হাজার ৬০৭ জন। বছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে ডিএসসিসিতে (ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন) ৪৬ জন। এরপর খুলনায় ২৫ জন, ডিএনসিসিতে (ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন) ১৭ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ১৪ জন এবং বরিশাল বিভাগে ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। বর্তমানে দেশের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ৩ হাজার ৪৩৪ জন। এর মধ্যে ঢাকার হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা নিচ্ছেন ৫৪৪ জন এবং ঢাকার বাইরের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন ২ হাজার ৮৯০ জন রোগী।
আক্রান্ত গত বছরের তুলনায় এ বছর বেশি। গত বছর এই পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল ৩৬ হাজার ৯৬ জন। এবার ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৪৮ হাজার ৪৩০ জন। এ পর্যন্ত সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন ৪৪ হাজার ৮৫৭ জন। যদিও মৃত্যু সমান সমান। এ পর্যন্ত গত বছর মৃত্যু হয়েছিল ১৩৯ জনের, এবারও ১৩৯ জন। চলতি বছরে আক্রান্তের তুলনায় মৃত্যুর হার কম।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জাহিদ রায়হান বলেন, আমরা এখন ডেঙ্গু মোকাবিলায় জোর দিচ্ছি। আমরা চেষ্টা করছি মৃত্যু যাতে কমানো যায়। আক্রান্ত হলেও চিকিৎসা দিয়ে যাতে মৃত্যু ঠেকানো যায়। গত বছরের তুলনায় এবার মৃত্যুর হার অনেকটাই কম। এ ছাড়া সংক্রমণ রোধেও সরকার উদ্যোগ নিয়েছে। তিন মাসের বিশেষ কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে।
বিভাগভিত্তিক ভর্তির পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, সবচেয়ে রোগী বেশি খুলনা বিভাগে। খুলনা বিভাগে ৭ হাজার ৮৩৭ জন, ঢাকা বিভাগে (সিটি করপোরেশন ছাড়া) ৭ হাজার ৫৩৪ জন, বরিশালে ৭ হাজার ১৫৪ জন, চট্টগ্রামে ৭ হাজার ৯৩ জন, ডিএসসিসিতের হাসপাতালে ৬ হাজার ১৪৫ জন, ডিএনসিসির হাসপাতালে ৫ হাজার ৬৯৬ জন, রাজশাহীতে ২ হাজার ৮০৯ জন, ময়মনসিংহে ২ হাজার ৬৬৭ জন, রংপুরে ১ হাজার ২৬৬ জন ও সিলেটে ২২৯ জন ভর্তি হয়েছে।
গতকাল এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ঢাকার হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীর চাপ কমাতে প্রান্তিক পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাসেবা জোরদার করা হয়েছে। প্রতিটি হাসপাতালে আইসোলেশন বেড প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং মোবাইল হাসপাতালের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। উপজেলা পর্যায়েই রোগীদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করার পাশাপাশি টারশিয়ারি হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ কমাতে সোসাইটি অব মেডিসিনের মাধ্যমে উপজেলা পর্যায়ের চিকিৎসকদের সঙ্গে সমন্বয় ও প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
২৪ ঘণ্টায় ৬ জনের মৃত্যু : গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১ হাজার ৪৯২ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে ডেঙ্গুতে মারা গেছেন আরও ছয়জন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত ডেঙ্গু পরিস্থিতি প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টার বিভাগভিত্তিক চিত্রেও ঢাকার বাইরের এলাকায় সংক্রমণের বিস্তার স্পষ্ট। সবচেয়ে বেশি ৩২৭ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন ঢাকা বিভাগের (সিটি করপোরেশনের বাইরে) বিভিন্ন হাসপাতালে। এরপর খুলনা বিভাগে ২৮৪ জন, চট্টগ্রামে ২০২ জন, বরিশালে ১৭৮ জন, ঢাকা উত্তরে ১৫১ জন ও দক্ষিণে ৮১ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন, রাজশাহীতে ১২২ জন, ময়মনসিংহে ৮০ জন, রংপুরে ৫৪ জন ও সিলেটে বিভাগে ১৩ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। গত ২৪ ঘণ্টায় খুলনায় দুজন, ঢাকা বিভাগের একজন এবং বরিশাল, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিভাগে একজন করে মোট ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে।