বান্দরবানের সাত উপজেলায় ৮১টি করাতকল চলছে। এর মধ্যে ৩৬টিরই নেই বন বিভাগের লাইসেন্স। আর পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেই অর্ধশতাধিক করাতকলের। অবৈধ করাতকল ও অসাধু কাঠ ব্যবসায়ী ও চক্রের কবলে পড়ে উজাড় হচ্ছে বনাঞ্চল। ফলে হুমকির মুখে পড়েছে সংরক্ষিত বনাঞ্চল।
জানা গেছে, বৈধ-অবৈধ এসব করাতকলে দিনরাত চলছে সংরক্ষিত বনের চোরাই কাঠ চেরাই। বনাঞ্চলের মূল্যবান গর্জন, সেগুনসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাদার ট্রি কেটে নদী ও সড়ক পথে পাচার করা হচ্ছে চট্টগ্রামসহ ঢাকায়। জেলা-উপজেলার একাধিক প্রভাবশালী চক্র এ কাজে জড়িত।
সরেজমিন দেখা যায়, জেলা সদরের উজানী পাড়া, নিউগুলশান, বালাঘাটাসহ লামা, আলীকদম, নাইক্ষ্যংছড়ি, রুমা, রোয়াংছড়ি ও থানছিতে অর্ধশতাধিক করাতকল চালু রয়েছে। এগুলোর অবস্থান জনবসতিপূর্ণ এলাকা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সরকারি স্থাপনার আশপাশে। অধিকাংশ করাতকলের মালিক তাদের প্রতিষ্ঠানের বৈধতা, লাইসেন্স কিংবা পরিবেশ ছাড়পত্রের বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি।
বন বিভাগ ও পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় ৮১টির মতো করাতকল রয়েছে। এর মধ্যে সদর রেঞ্জে ৮টি, সেকদু রেঞ্জে ৩টি এবং থানচি রেঞ্জে ২টি। এ ছাড়া পাল্পউড প্ল্যান্টেশন বিভাগের অধীনে রয়েছে আরও ৮টি। তাছাড়া লামা বিভাগীয় বন বিভাগের আওতায় রয়েছে ৬০টি করাতকল। এর মধ্যে লামা উপজেলায় ২১টি, আলীকদমে ৯টি এবং নাইক্ষ্যংছড়িতে ৩০টি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এসব করাতকলের মধ্যে ৪৫টির লাইসেন্স আছে। তার মধ্যে ৩৫টি লাইসেন্স নবায়ন হয়েছে। ১০টি নবায়ন করা হয়নি। বাকি ৩৬টি করাতকল পরিচালিত হচ্ছে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে। স্থানীয় পরিবেশবাদীদের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নীরব ভূমিকার কারণে অধিক হারে বাড়ছে করাতকল। অথচ করাতকল স্থাপন ও পরিচালনা বিধিমালা ২০১২ অনুযায়ী, সরকারি অফিস, আদালত, হাসপাতাল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আবাসিক এলাকা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসহ জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য সংবেদনশীল স্থাপনা থেকে নির্ধারিত দূরত্ব বজায় রেখে করাতকল স্থাপন করতে হয়। এ ছাড়াও সংরক্ষিত বনের ১০ কিলোমিটারের মধ্যে করাতকল স্থাপন করা যাবে না।
এদিকে, বছরের পর বছর ধরে আবাসিক এলাকা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় স্থাপনা ও সংরক্ষিত বানাঞ্চলের কাছাকাছি করাতকল স্থাপন হয়ে আসলেও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি নিয়ে। অন্যদিকে, করাতকলের শব্দদূষণ, কাঠবাহী ভারী যানবাহনের চলাচল এবং কাঠের বর্জ্যরে কারণে পরিবেশ ও জনজীবন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এসব করাতকলের সঙ্গে সাবেক কমিশনার নাসির উদ্দীনের ভাগিনা আতিকুর রহমান সানি, আবুল বসর, মোরশেদ কোম্পানি, সাবেক পৌর কাউন্সিলর মোহাম্মদ কামাল, সাবেক পৌর চেয়ারম্যান আয়ুব চৌধুরী, মো. আনোয়ার ও মো. রফিকের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি করাতকল বর্তমানে অন্য ব্যক্তিরা পরিচালনা করছেন বলে জানা গেছে।
উজানীপাড়া এলাকার বাসিন্দা শৈসিংনু মার্মা বলেন, ‘উজানীপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দেয়াল ঘেঁষেই একটি করাতকল চলছে। দিনরাত শব্দ দূষণ হচ্ছে। কোমলমতি শিশুদের যাতায়াতের পথ দিয়েই ভারী ট্রাক চলাচল করে। এতে শিক্ষার্থীসহ স্থানীয়দের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।’ বালাঘাটার বাসিন্দা হুমায়ুন কবির বলেন, ‘প্রতিদিন করাতলে গাছ লোড-আনলোড হচ্ছে। স্কুলগামী সন্তানদের নিয়ে সবসময় চিন্তায় থাকি। করাতকলের শব্দ এবং ভারী ট্রাক চলাচলের কারণে স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হচ্ছে।’
পার্বত্য চট্টগ্রাম বন ও ভূমি অধিকার সংরক্ষণের বান্দরবান চ্যাপ্টারের চেয়ারপারসন জুয়ামলিয়ান আমলাই বলেন, ‘জেলায় যে হারে বৈধ-অবৈধ করাতকল বাড়ছে, তাতে সংরক্ষিত বনাঞ্চলও উজাড় হতে বেশি দিন লাগবে না। মাতৃগাছসহ বনাঞ্চল উজাড় হয়ে যাওয়ার পেছনে বন বিভাগই দায়ী।’
এদিকে বন বিভাগ ও পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, নিয়ম মেনে লাইসেন্স নবায়ন এবং পরিবেশগত ছাড়পত্র নেওয়ার জন্য করাতকল মালিকদের বারবার তাগিদ দেওয়া হলেও অনেকে তা মানছেন না।
তবে করাতকল মালিক সমিতির সভাপতি মো. রফিক বলেন, ‘আমরা বন বিভাগ থেকে লাইসেন্স নিয়েছি এবং এ বছরও নবায়ন করেছি। তবে পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে ছাড়পত্র নেওয়া হয়নি।’ আর অবৈধভাবে যারা করাতকল চালাচ্ছেন তাদের বিষয়ে কিছু জানেন না বলে জানান তিনি।
জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক নুর হাসান সজীব বলেন, জেলায় ৪৫টি করাতকলের পরিবেশগত ছাড়পত্র রয়েছে। এর মধ্যে ৩৫টি নবায়ন করা হয়েছে। বাকি ১০টি নবায়ন করা হয়নি। লাইসেন্স নবায়নের জন্য তাদের নোটিস দেওয়া হবে।
লামা বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, যারা বনাঞ্চল ধ্বংসের সঙ্গে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে নিয়মিত বন আইনে মামলা করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, বারবার বলার পরও আলীকদম ও নাইক্ষ্যংছড়ির অনেক করাতকলের মালিক লাইসেন্স নেননি। খুব শিগগিরই তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হবে।