অপ্রতিম-আজমুল দুঃসহ স্মারক

দায় এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই

আপডেট : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৫১ এএম

এ কোন উন্মত্ততা? নিরাপত্তাহীনতার ছায়া আর কত প্রলম্বিত হবে? আর কত প্রাণপ্রদীপ নিভে যাবে শ^াপদদের নখরাঘাতে? সরকার-আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী-প্রশাসনের দায়িত্বশীল কারোরই অবকাশ নেই নৃশংসতার দায় এড়ানোর। কুমিল্লা বিশ^বিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগম ও কেএম ফিরোজ শাহরিয়ারের সন্তান অপ্রতিম আর খুলনায় ছাত্রাবাসে ‘ভাত চুরি করে খাওয়ার’ অভিযোগ তুলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আজমুল হোসেনের বাবা-মায়ের আর্তি সমান্তরালে যে প্রশ্ন দাঁড় করিয়েছে শুধু এর জবাব দেওয়ার দায়ের মধ্য দিয়েই রাষ্ট্রশক্তির দায়িত্ব ফুরিয়ে যায় না। ২০ সেপ্টেম্বর দেশ রূপান্তরে মর্মস্পশী এই দুটি ঘটনার অন্তরালের যে চিত্র উঠে এসেছে তা সমাজের গভীর অসুখ আর জননিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের দায়িত্ব যাদের, তাদের ব্যর্থতার দায়ভারের দীর্ঘ খতিয়ানের আরেক প্রশ্নবোধক উপাখ্যান।

শোক হৃদয়কে গভীরভাবে বেদনাকাতর আর তীব্র কষ্টের গহ্বরে নিমজিত করে। কিন্তু বাবা-মায়ের কাঁধে সন্তানের লাশের যে ভারবাহিতা কোনো সংজ্ঞায়ই তা সংজ্ঞায়িত করা সম্ভব নয়। এ ভার সবচেয়ে ভারী। এ ভার বইবার ক্ষমতা কোনো বাবা-মায়েরই নেই। নৃশংসতার বলি অপ্রতিমের ‘নেই’ হয়ে যাওয়ার যে রোমহর্ষক বর্ণনা দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদনের উঠে এসেছে, তা রূপ কথাকেও যেন হার মানায়। ‘এটা কোন দেশ? আমি বাঁচব কীভাবে? আমার তো একটাই ছেলে। কীভাবে আমার জীবন কাটাব? আপনারা সবাই বলেন, ওকে ছাড়া আমি কীভাবে থাকব’ অপ্রতিমের মায়ের এই আর্তি-জিজ্ঞাসার উত্তর আমাদের জানা নেই। ১৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে মায়ের আইফোনটি হাতে নিয়েছিল অপ্রতিম। বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলবে এই ছিল বায়না। কিন্তু সেই ফোন হাতে ঘর থেকে বের হওয়া কিশোরটি আর ঘরে ফেরেনি। একটি আইফোন তার জীবনে কাল হয়ে দাঁড়াল! ২৪ ঘণ্টা বাবা-মা আর স্বজনদের চরম উৎকণ্ঠার ঢেউ ভেঙে ১৯ সেপ্টেম্বর দুপুরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার জঙ্গল থেকে উদ্ধার হয় তার ক্ষতবিক্ষত নিথর দেহ। অপ্রতিম স্থানীয় বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। ধিক্কার উঠেছে এই নৃশংসতার বিরুদ্ধে। অপ্রতিমকে রক্ষা করতে না পারার জন্য তার মা-বাবার কাছে, সমাজের কাছেও ক্ষমা চেয়েছেন অনেকে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, অসুখে অসুখে সমাজটা বসবাসের আর কত অনুপযুক্ত হবে?

অন্যদিকে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় একটি মেসে গভীর রাতে নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র মো. আজমুল হোসেনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয় ‘ভাত চুরি’র অভিযোগে! চুয়াডাঙ্গা জেলার শলুয়ার আজমুল খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদের সঙ্গে একটি মেসে থাকত। অপ্রতিম-আজমুল শুধু দুঃসহ স্মারক হয়েই আমাদের সামনে নতুন করে আরও কিছু প্রশ্ন দাঁড় করিয়ে যায়নি। আমরাও সমস্বরে প্রশ্ন উত্থাপন করছি, আর কত অপ্রতিম-আজমুলের প্রাণপ্রদীপ দুর্বৃত্তের থাবায় নিভে গেলে দায়িত্বশীলদের সম্বিৎ ফিরবে? জবাবদিহি-দায়বদ্ধতার পাঠ নিশ্চিত হবে? ২০ সেপ্টেম্বর দেশ রূপান্তরসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে নিরাপত্তাহীনতার আরও অনেক বার্তা উঠে এসেছে। রাষ্ট্রশক্তির মনে রাখা বাঞ্ছনীয়, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেকোনো গণতান্ত্রিক ও কল্যাণকামী রাষ্ট্রের মৌলিক ও অপরিহার্য দায়িত্ব-শর্ত। একটি সুস্থ ও স্থিতিশীল সমাজের প্রধান শর্ত, নাগরিকদের জানমালের নিরাপত্তা।

জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর বিশেষ করে পুলিশের পেশাদারত্ব, নিরপেক্ষতা, কার্যকারিতা বৃদ্ধি সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবি। আমরা এই সম্পাদকীয় স্তম্ভেই বহুবার বলেছি, নিরাপত্তাহীনতার বলি যেন আর কেউ না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু এই বলা তো শেষ হচ্ছে না! আজ আমরা অপ্রতিম-আজমুলের নৃশংস ঘটনায় স্পষ্টভাবে বলতে চাই, দায়িত্বশীল কারোরই জননিরাপত্তা নিয়ে আত্মতৃপ্তির কিংবা আত্মতুষ্টির কোনো অবকাশ নেই। আমরা চাই, দৃষ্টান্তযোগ্য দ্রুত প্রতিবিধান এবং একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সব পক্ষের জবাবদিহি। আমরা আরও পরিষ্কার করে বলতে চাই, রাজনৈতিক-সামাজিক প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে সম্পূর্ণ স্বাধীন-নিরপেক্ষভাবে অপরাধীদের মূলোৎপাটনে চালাতে হবে সাঁড়াশি অভিযান। দ্রুত বিচার তো বটেই, একই সঙ্গে নজর দিতে হবে উৎসে। প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক নজরদারির বিকল্প নেই। জননিরাপত্তার বিদ্যমান সংকটকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। জননিরাপত্তার নিশ্চয়তা বিধান বিদ্যমান বাস্তবতায় বড় চ্যালেঞ্জ এই সত্য আমলে রাখুন।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত