সন্ধ্যার পর সন্তান ঘরে না ফিরলে একটি পরিবারের সময় যেন হঠাৎ থেমে যায়। ফোনে পাওয়া যাচ্ছে না, বন্ধুরা কিছু বলতে পারছে না, পরিচিত জায়গাগুলোতে খুঁজেও সন্ধান মিলছে না। এরপর থানা, হাসপাতাল, আত্মীয়ের বাড়ি, ফেসবুকে ছবি ছড়িয়ে দেওয়া। রাত যত বাড়ে, মা-বাবার ভয়ও তত বাড়তে থাকে। একটি শিশু নিখোঁজ হওয়ার সংবাদ আসলে এমন অসংখ্য উৎকণ্ঠার গল্প। পুলিশ সদর দপ্তরের সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সারা দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশু নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় জিডি হয়েছে। তাদের বড় অংশকে পাওয়া গেছে, পরিবারের কাছেও ফিরেছে। তবু দুই হাজারের বেশি শিশুর এখনো সন্ধান মেলেনি। মোট সংখ্যার তুলনায় শতকরা হার কম মনে হতে পারে। সন্তানের অপেক্ষায় থাকা একটি পরিবারের কাছে শতাংশের হিসাবের কোনো সান্ত্বনা নেই। একজন শিশুর অনুপস্থিতিই সেই পরিবারের পুরো জীবনকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দিতে পারে।
নিখোঁজ শিশুদের বড় অংশের বয়স ১০ থেকে ১৭ বছর। পুলিশ তাদের ঘর ছাড়ার পেছনে অভিমান, পড়ালেখার চাপ, পারিবারিক অশান্তি, বন্ধুদের প্রভাব, স্বাধীনভাবে থাকার আকাক্সক্ষাসহ কয়েকটি কারণের কথা বলেছে। কারণগুলো গুরুত্বপূর্ণ। তবে শিশুর ঘর ছেড়ে চলে যাওয়ার দায় কেবল তার আচরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করলে সমস্যার গভীরে পৌঁছানো কঠিন। একজন কিশোর কেন মনে করে বাড়ির বাইরে অজানা পথে চলে যাওয়া তার জন্য বেশি গ্রহণযোগ্য? কেন সে মা-বাবা, শিক্ষক, আত্মীয় কিংবা পরিচিত কোনো প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের কাছে নিজের কষ্টের কথা বলতে পারে না? পরিবার ও বিদ্যালয়ে তার কথা শোনার জায়গা কতটা আছে? পরীক্ষার ফল, শাসন, তুলনা, অপমান, সম্পর্কের টানাপড়েন এবং কৈশোরের আবেগ সামলাতে সে কতটা সহায়তা পাচ্ছে? কৈশোরে নিজের পরিচয়, ব্যক্তিগত পরিসর ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার আকাক্সক্ষা দ্রুত বাড়ে। একই সময়ে আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা পুরোপুরি পরিণত হয় না। অপমান, ভয় কিংবা সম্পর্কের দ্বন্দ্ব তখন অনেক বড় হয়ে উঠতে পারে। পরিবারে কথোপকথনের জায়গা কম থাকলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়। শিশুকে শুধু নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা অনেক সময় তাকে আরও দূরে ঠেলে দেয়। তবে নিখোঁজ হওয়ার প্রতিটি ঘটনাকে স্বেচ্ছায় ঘর ছাড়ার ঘটনা ধরে নেওয়া বিপজ্জনক। শিশু পাচার, যৌন শোষণ, জোরপূর্বক কাজে নিয়োগ এবং সংঘবদ্ধ অপরাধের ঝুঁকিও অনুসন্ধানের শুরু থেকেই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় রাখা দরকার।
ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়া কিশোর-কিশোরীর অসহায় অবস্থাকে পাচারকারী চক্র কাজে লাগাতে পারে। বাসস্ট্যান্ড, রেলস্টেশন, লঞ্চঘাটসহ বিভিন্ন পরিবহনকেন্দ্র তখন ঝুঁকির জায়গা হয়ে উঠতে পারে। ডিজিটাল জগৎ এই ঝুঁকিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বন্ধুত্ব, প্রেমের সম্পর্ক, চাকরি, ভালো আয়ের কাজ কিংবা শহরে নিয়ে যাওয়ার প্রলোভনের মাধ্যমে শিশুর সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করা সম্ভব। ফলে কোনো শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর তার সাম্প্রতিক অনলাইন যোগাযোগ দ্রুত যাচাই করা দরকার। দীর্ঘ সময় সন্ধান না পাওয়া শিশু এক জেলা থেকে অন্য জেলায় গেছে কিনা, সীমান্তমুখী যাত্রার কোনো তথ্য রয়েছে কিনা, অপরিচিত কারও সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল কিনা, অনুসন্ধানের প্রথম পর্যায়েই এসব দিক দেখা প্রয়োজন। পাচারের সম্ভাবনা থাকলে স্থানীয় থানার অনুসন্ধানেই কাজ সীমিত রাখা যথেষ্ট হবে না। পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা, সীমান্তরক্ষী বাহিনী, পরিবহনকেন্দ্র এবং সংশ্লিষ্ট শিশু সুরক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দ্রুত তথ্য আদান-প্রদানের ব্যবস্থা থাকতে হবে। নিখোঁজ ও পাচারের তথ্য আলাদাভাবে সংরক্ষণের পাশাপাশি দুই ধরনের তথ্যের সংযোগও নিয়মিত বিশ্লেষণ দরকার। একই এলাকা থেকে বারবার শিশু হারিয়ে গেলে কিংবা একই ধরনের প্রলোভনের তথ্য পাওয়া গেলে সংঘবদ্ধ চক্রের উপস্থিতির সম্ভাবনাও অনুসন্ধানে আনতে হবে।
বিদ্যালয়ের দায়িত্বও বড়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমন একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি থাকা দরকার, যার কাছে শিক্ষার্থীরা নির্ভয়ে ব্যক্তিগত সমস্যার কথা বলতে পারে। মাধ্যমিক পর্যায়ে মনোসামাজিক সহায়তা চালু করা দরকার। শিক্ষক ও অভিভাবকদের কৈশোরের মানসিক পরিবর্তন, অনলাইন সম্পর্ক, নিপীড়ন, অপরিচিত মানুষের প্রলোভন এবং পাচারের কৌশল সম্পর্কে ধারণা দেওয়া প্রয়োজন। রাষ্ট্রের দায়িত্ব শিশু হারিয়ে যাওয়ার আগেই শুরু হওয়া দরকার। কোন বয়সের শিশুরা বেশি ঘর ছাড়ছে, কোন পরিস্থিতিতে এমন ঘটনা ঘটছে, কত সময়ের মধ্যে তাদের পাওয়া যাচ্ছে, ফিরে আসা শিশুর অভিজ্ঞতা কী, একই শিশু একাধিকবার নিখোঁজ হচ্ছে কিনা, এসব তথ্য নিয়মিত বিশ্লেষণ প্রয়োজন। শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর প্রথম কয়েক ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। থানায় জিডির সঙ্গে সঙ্গে তথ্য সংশ্লিষ্ট ইউনিটে পৌঁছানো, পরিবহনকেন্দ্র ও সীমান্ত এলাকার কর্র্তৃপক্ষকে সতর্ক করা, সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ, ডিজিটাল সূত্র যাচাই এবং আন্তঃজেলা অনুসন্ধান দ্রুত শুরু করা দরকার।
ফিরে আসা শিশুর ক্ষেত্রেও কাজ শেষ হয় না। বাইরে থাকার সময়ে সে সহিংসতা, শোষণ, পাচার কিংবা যৌন নিপীড়নের মুখে পড়েছিল কিনা, ঘরে ফিরে নিরাপদ বোধ করছে কিনা, তা জানতে প্রশিক্ষিত পেশাজীবীর সহায়তা প্রয়োজন। তাকে অপরাধীর মতো জেরা কিংবা অপমান করলে আবারও ঘর ছাড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। আর যারা এখনো ফেরেনি, তাদের সংখ্যার আড়ালে চলে যেতে দেওয়া যায় না। দুই হাজারের বেশি শিশু মানে দুই হাজারের বেশি পরিবার। সংবাদ বিজ্ঞপ্তির হিসাব একদিন পুরনো হয়ে যাবে। অপেক্ষারত পরিবারের কাছে সন্তানের ছবি পুরনো হয় না। প্রতিটি নিখোঁজ শিশুকে খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা চলমান রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। শিশুটি কোথায় গেল, কার সংস্পর্শে পড়ল, পাচার কিংবা শোষণের শিকার হলো কিনা, প্রতিটি দিক অনুসন্ধানে রাখতে হবে। একটি শিশুও নিখোঁজ থাকলে রাষ্ট্রের অনুসন্ধান থামার সুযোগ নেই।
লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক ও মানবাধিকারকর্মী