অর্থনীতি দুষ্টচক্রের বৃত্তে

আপডেট : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৫২ এএম

গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে প্রখ্যাত ব্যাংকার, লুৎফর রহমান সরকার, যিনি আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সরাসরি শিক্ষক ছিলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর থাকাকালীন সময়ে এক অনুষ্ঠানে বক্তৃতা  দিতে গিয়ে বলেছিলেন, বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। একটি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধানের এমন বক্তব্য তখন সবাই গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছিল এবং অনেক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম তার এই বক্তব্য ফলাও করে প্রচার করেছিল। জানি না লুৎফর রহমান সরকার স্যার আজ বেঁচে থাকলে দেশের এ নিয়ে কি মন্তব্য করতেন।  খেলাপি ঋণ সমস্যা এমন এক পর্যায় এসে দাঁড়িয়েছে, যাকে আর কোনো মানদণ্ডেই বিচার করার অবস্থায় আছে কিনা, সেটাই এখন একটি বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে। এটা সত্য, দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তন এসেছে, কিন্তু অন্যদিকে খেলাপি ঋণ অন্যতম উপসর্গ হয়ে অর্থনীতির জন্য বিপদ হয়ে দাঁড়িয়েছে।  

সম্প্রতি দেশের একটি পত্রিকায় খেলাপি ঋণ সমস্যা নিয়ে যে সংবাদ প্রকাশ করেছে তা এক কথায় ভয়াবহ। প্রকাশিত সংবাদের তথ্য অনুযায়ী দেশের মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ এখন ৬ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকার বেশি। অথচ এক বছর আগে, অর্থাৎ ২০২৫ সালের গোরার দিকে এর পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ২১ হাজার কোটি টাকা, যা আরও এক বছর আগে, অর্থাৎ ২০২৪ সালের শুরুর দিকে ছিল ২ লাখ কোটি টাকার কিছু বেশি। মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে অর্থাৎ ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের মাঝামাঝি এসে খেলাপি ঋণের পরিমাণ এক লাফে ২ লাখ কোটি টাকা থেকে বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা, অর্থাৎ ২২৫% বা দ্বিগুণের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। শুধু তাই নয়, একই প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্ধৃতি দিয়ে উল্লেখ করা হয়েছে যে, দেশের ব্যাংকিং খাতের সংকটে থাকা মোট ঋণের (ডিসস্ট্রেসড লোন) পরিমাণ হচ্ছে ১০ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা, যা মূলত মোট ঋণের ৬০%।

ডিসস্ট্রেসড লোনের অন্তর্ভুক্ত আছে খেলাপি ঋণ, পুনঃতফসিল হওয়া ঋণের অনাদায়ী অংশ এবং অবলোপন (রাইট-অফ) করা ঋণের অনাদায়ী অংশ। এর বাইরে যদি ছদ্মবেশী (ডিজগাইজড) খেলাপি ঋণ বিবেচনায় নেওয়া হয়, তাহলে দেশের আর্থিক খাতে আদায়যোগ্য নয়, এমন ঋণের পরিমাণ ৭০%-এর বেশি ছাড়া কম হবে না। উল্লেখ্য, ডিজগাইজড খেলাপি ঋণ হচ্ছে সেসব ঋণ, যা আপাতদৃষ্টিতে ভালো আছে বা আইনের নানারকম ফাঁকফোকর কাজে লাগিয়ে ভালো ঋণ হিসেবে দেখানো হলেও এসব ঋণ মূলত অনাদায়ীর পর্যায়ে আছে এবং যেকোনো সময় খেলাপি ঋণে পরিণত হতে পারে। এই বিশাল অঙ্কের খেলাপি ঋণ নিয়ে কোনো দেশের টিকে থাকাটাই একটি নজিরবিহীন ঘটনা।

দেশের খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির পাশাপাশি খেলাপি ঋণ আদায়ের উদ্দেশ্যে আদালতে দায়ের করা মামলার পরিমাণও আশঙ্কাজনক বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৪২ হাজার, যা এক বছর আগে ছিল ২ লাখ ২০ হাজার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানের খেলাপি ঋণ আদায়ে দায়ের করা মামলার সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে ২২ হাজার। মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ এবং এর বিপরীতে দায়ের করা মোট মামলার সংখ্যা বিবেচনায় নিলে দেখা যায় যে, প্রতি আড়াই কোটি টাকার খেলাপি ঋণ আদায়ের জন্য একটি করে মামলা দায়ের করা হয়েছে। এক কথায় যতগুলো ঋণ খেলাপি, ততগুলো মামলা। এই পরিমাণ মামলা দেখে মনে হওয়া স্বাভাবিক যে, খেলাপি ঋণ আদায়ে মামলা ছাড়া আর কোনো পদ্ধতি দেশের জানা নেই। বন্ধকী সম্পত্তি নিয়ে ঋণ প্রদান করলে যদি খেলাপি ঋণ এড়ানো সম্ভব হতো এবং সেই সঙ্গে মামলা করে যদি খেলাপি ঋণ আদায় করা যেত, তাহলে বাংলাদেশের এ খাতে বিশ্বের সবচেয়ে কম পরিমাণ খেলাপি ঋণ থাকার কথা ছিল। কেননা পৃথিবীর কোনো দেশে, বিশেষ করে যেসব দেশে ন্যূনতম মানসম্পন্ন আর্থিক ব্যবস্থা চালু আছে, সেখানে এত পরিমাণ বন্ধকী সম্পত্তি নিয়ে বাণিজ্যিক ঋণ দেওয়া হয় না এবং খেলাপি ঋণ আদায়ে এত পরিমাণ মামলাও দায়ের করা হয় না।

খেলাপি ঋণের জন্য এ খাতের সমস্যাকে দায়ী করা হয়, যা খুবই স্বাভাবিক। ঋণ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে নানানভাবে প্রভাবিত হয়ে ঋণ মঞ্জুর করা এবং ঋণ পরিচালনায় শিথিলতার কারণে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে যায়। কিন্তু তা সত্ত্বেও একটি ঋণ যেভাবে খেলাপি হয়, তাতে কোনো অবস্থাতেই সমগ্র আর্থিক খাতের খেলাপি ঋণ মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে বৃদ্ধি পেয়ে তিনগুণ হতে পারে না। এ ধরনের খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি যত না এ খাতের সমস্যার কারণে, তার চেয়ে অনেক বেশি অর্থনৈতিক মন্দার কারণে হয়ে থাকে। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে দেশের অর্থনীতি ক্রমান্বয়ে খারাপের দিকে গেছে। দেশের ব্যবসাবাণিজ্যে চরম মন্দা বিরাজ করছে। অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আক্রান্ত হয়েছে। অসংখ্য কলকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক রপ্তানি আদেশ অন্যত্র চলে গেছে। নতুন বিনিয়োগ তো একেবারেই নেই, উল্টো চলমান ব্যবসার ক্ষেত্রেও বিনিয়োগ হ্রাস পেয়েছে। ফলে শিল্প খাতে বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক হয়ে গেছে, আর দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ২.২%-এ। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়নি, উল্টো অসংখ্য মানুষ চাকরি হারিয়ে বেকার হয়ে গেছে। এর সার্বিক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে ব্যাংকিং খাতের ঋণ ব্যবস্থাপনার ওপর।

অর্থনীতির এমন নেতিবাচক প্রভাবের কারণে দেশে সামষ্টিক চাহিদা হ্রাস পেয়েছে, যার কারণে দেশের উৎপাদন এবং ব্যবসাবাণিজ্যে মন্দা নেমে এসেছে। ব্যবসায়ীদের বিক্রয়ের পরিমাণ বা টার্নওভার হ্রাস পেয়েছে। এর ফলে ব্যবসায়ী সম্প্রদায় যারা অতীতে নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করে আসছিলেন, তাদের অনেকেই এখন আর নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করতে পারছেন না। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, এক সময়ের নিয়মিত এবং ভালো ঋণগ্রহীতারও এখন ঋণখেলাপিতে পরিণত হচ্ছেন, যা দেশে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। মাত্রাতিরিক্ত খেলাপি ঋণের চাপে অনেক ব্যাংক তাদের গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দিতে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে, যা সাধারণ আমানতকারীদের মাঝে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। ফলে সাধারণ মানুষ অর্থ ব্যয় করার ক্ষেত্রে অতি সতর্কতা অবলম্বন করেছে এবং অধিকাংশ মানুষ যথেষ্ট ব্যয়সংকোচনের পথ অবলম্বন করেছে। ব্যবসায়ীদের নতুন ঋণ মঞ্জুর করতে পারছে না, এমনকি আগের অনুমোদন হওয়া ঋণও অনেক ব্যাংক বিতরণ করতে পারছে না।

বিগত এক বছরে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি হ্রাস পেয়ে ৪.৪৭%-এ নেমে এসেছে। এই তথ্য যদি সঠিক হয় তাহলে তো বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক। কেননা নতুন ঋণ বিতরণ না হওয়া সত্ত্বেও বেসরকারি খাতের ব্যাংকঋণের প্রবৃদ্ধি হবে ৮% থেকে ১০%-এর মধ্যে শুধু ঋণের ওপর অর্জিত সুদ যোগ হওয়ার কারণে। আমাদের দেশে সাধারণত ঋণের ওপর অর্জিত সুদ নগদে আদায় করা হয় না। সুদ ঋণের সঙ্গে যোগ করে ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান তার মুনাফা হিসেবে নিয়ে নেয়। পদ্ধতিটি ত্রুটিপূর্ণ হলেও এটাই অনুসৃত হয়ে আসছে দেশের এ খাতে। নতুন ঋণের অভাবে বা অনুমোদিত ঋণ সময়মতো বিতরণ না করায় দেশের ব্যবসায়ীরা একদিকে যেমন বিনিয়োগ করতে পারছেন না, অন্যদিকে তেমনি চলতি বা কার্যকরী মূলধন সংকটে পড়ে উৎপাদন বা টার্নওভার কমিয়ে আনতে বাধ্য হয়েছেন, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে এই ঋণ পরিশোধের ওপর। সবকিছু মিলে দেশের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড এমন এক জটিল অবস্থার মধ্যে পড়েছে, তাতে মনে হওয়া স্বাভাবিক যে, দেশের অর্থনীতি মাত্রাতিরিক্ত খেলাপি ঋণের দুষ্টচক্রে আটকে যেতে বসেছে। এ ব্যাপারে জরুরি নির্মোহ অবস্থান।

প্রশ্ন হচ্ছে, এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণের উপায় কী। প্রশ্নটা সহজ, কিন্তু উত্তরটা এতই কঠিন যে, কারও জানা আছে কিনা সন্দেহ। আমি নিজে কর্মজীবনের শুরু থেকে খেলাপি ঋণ নিয়ে কাজ করেছি। খেলাপি ঋণের বিষয়ে জানা আমার বিশেষ এক আগ্রহের জায়গা। বিশে^র বিভিন্ন দেশে কীভাবে খেলাপি ঋণ হয়েছে, কীভাবে এর সমাধান করেছে এবং কীভাবে ঋণ খেলাপি হওয়ার পথ বন্ধ করা হয়েছে; এর সবকিছুই বেশ আগ্রহ নিয়ে জানার চেষ্টা করি। বাংলাদেশের খেলাপি ঋণ সমস্যা এবং সমাধানের বিষয় নিয়ে অসংখ্য কলাম বিভিন্ন পত্রিকায় লিখেছি, যেখানে এ সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে সুস্পষ্ট সুপারিশ করেছি। কেননা খেলাপি ঋণ সমস্যাটা এখন আর শুধু আর্থিক খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি এখন অর্থনীতির সমস্যা। আর এই অবস্থার উন্নতি ঘটাতে হলে অর্থনৈতিক সমস্যা এবং এ খাতের সমস্যা সমাধানের কাজ যুগপৎ শুরু করা ছাড়া গত্যন্তর নেই। সেটি যত দ্রুত সম্ভব জরুরি ভিত্তিতে করা প্রয়োজন। তা না হলে শুধু এই খাত নয়, পুরো অর্থনীতিতে এমন ক্ষতি সাধিত হবে, যা আর পূরণ করা সম্ভব হবে না।

লেখক : সার্টিফাইড অ্যান্টি-মানিলন্ডারিং স্পেশালিস্ট, ব্যাংকার ও অর্থনীতির বিশ্লেষক। টরন্টো, কানাডা

[email protected]

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত