চীন থেকে বাংলাদেশে ৬০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছে ইনভেস্ট বাংলাদেশ। গত ১৬ মার্চ ঘোষিত ১৮০ দিনের বিনিয়োগ পরিকল্পনার অগ্রগতি প্রতিবেদনে সংস্থাটি জানিয়েছে, বিভিন্ন দেশ থেকে মোট ১৩০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ পাইপলাইনে রয়েছে। এর মধ্যে চীন থেকে ৬০ কোটি, মধ্যপ্রাচ্য থেকে ৩০ কোটি, যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২০ কোটি এবং দক্ষিণ কোরিয়া থেকে ১০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব রয়েছে।
মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানিয়েছে ইনভেস্ট বাংলাদেশ।
পরিকল্পনার অগ্রগতি নিয়ে ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেন, সরকারের বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দেশীয় সক্ষমতা গড়ে তোলার লক্ষ্য বাস্তবায়নে আমরা এই রোডম্যাপ প্রয়োগ করছি। আমাদের অগ্রাধিকার ছিল তিনটি-উন্নত অবকাঠামো, দ্রুত সেবা এবং একটি শক্তিশালী বিনিয়োগ পাইপলাইন। বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে কিছুটা সময় লাগলেও পরিবর্তন ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। আমরা ১৮০ দিন পর অগ্রগতি জানানোর অঙ্গীকার করেছিলাম, এই প্রতিবেদনে অর্জিত অগ্রগতি ও সামনের কাজ তুলে ধরা হয়েছে।
ইনভেস্ট বাংলাদেশ তাদের অর্জিত সাফল্য তিনটি স্তম্ভে তুলে ধরে। প্রথম স্তম্ভে বন্দর আধুনিকায়ন, অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়ন, বিকল্প জ্বালানি সরবরাহ এবং সরকারি সম্পদের উৎপাদনশীল ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর আওতায় লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন সম্পন্ন হয়েছে। ৫৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের এ প্রকল্পটি ২০৩০ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্য রয়েছে। কার্যক্রম শুরু হলে টার্মিনালটিতে ৭০০টির বেশি সরাসরি কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বন্দরের সক্ষমতা ৪৪ শতাংশ বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
নিউ মুরিং কনটেইনার টার্মিনালের ১৫ বছরের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য একটি আন্তর্জাতিক টার্মিনাল অপারেটরের সঙ্গে চূড়ান্ত পর্যায়ের আলোচনা চলছে। চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন সম্পন্ন হয়েছে। চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশন ২০২৮ সালের মধ্যে এর কাজ শেষ করার লক্ষ্য নিয়েছে। এ অঞ্চলের প্রত্যাশিত বিনিয়োগ পাইপলাইন ১.৩ বিলিয়ন ডলার, যার মধ্যে ৫০০ মিলিয়ন ডলারের সক্রিয় বিনিয়োগ পাইপলাইন রয়েছে। প্রকল্পটি এক লাখের বেশি সরাসরি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মোংলা বন্দরের পাশে ১১০ একর জমিতে মোংলা অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়নের জন্য চায়না সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন করপোরেশনের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। এখানে প্রস্তাবিত ৬৫০ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগে কৃষিভিত্তিক শিল্প ও হালকা প্রকৌশল খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম বন্দরে ২৪ ঘণ্টা বন্দর কার্যক্রম, কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স এবং ব্যাংকিং সেবা চালু করা হয়েছে।
ঢাকা বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের কার্যক্রম ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ শুরু করার লক্ষ্য রয়েছে। টার্মিনালটির মাধ্যমে বার্ষিক কার্গো পরিবহন সক্ষমতা দুই লাখ টন থেকে পাঁচ লাখ টনে উন্নীত হবে, যা ১৫০ শতাংশ বৃদ্ধি। এর মাধ্যমে ছয় হাজারের বেশি সরাসরি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এ ছাড়া চট্টগ্রামে ৬০০ একরের বেশি জমিতে প্রস্তাবিত মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চলের নীতিগত কাঠামো চূড়ান্ত করার কাজ চলছে।
ফেনীর সোনাগাজীতে জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের ৪১২ একর জমিতে প্রথম সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তুতি চলছে। মহেশখালীর কুতুবজোমে তৃতীয় ভাসমান এলএনজি সংরক্ষণ ও পুনঃগ্যাসীকরণ ইউনিট ২০২৮ সালে সরবরাহ শুরুর লক্ষ্য রয়েছে।
দ্বিতীয় স্তম্ভে বিনিয়োগসেবা একীভূত করা, ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানো এবং বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সংযোগ শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিডা, বেজা এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব কর্তৃপক্ষকে একীভূত করে বিনিয়োগ উন্নয়ন, অর্থনৈতিক অঞ্চল ও সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের কার্যক্রম একটি প্রতিষ্ঠানের অধীনে আনা হয়েছে।
বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (সিইপিএ) সম্পন্ন হয়েছে। এর আওতায় বাংলাদেশের ৯৭ শতাংশ পণ্য অগ্রাধিকারমূলক বাজারসুবিধা পাবে, যার মধ্যে ৮ হাজার ৪২৮টি পণ্য শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে।
তৃতীয় স্তম্ভে একটি পরিকল্পিত বিনিয়োগ পাইপলাইন তৈরি, বিনিয়োগযোগ্য সুযোগ প্রস্তুত এবং খাত ও অঞ্চলভিত্তিক সম্ভাবনা চিহ্নিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিদেশি ইকুইটি আনার ক্ষেত্রে যোগ্য ব্যক্তিকে সংশ্লিষ্ট ইকুইটির ১.২৫ শতাংশ প্রণোদনা দেওয়ার নির্দেশিকা অনুমোদিত হয়েছে।
বর্তমানে মোট বিনিয়োগ পাইপলাইনের পরিমাণ ১.৩ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে ৪০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত বা বাস্তবায়ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। খাতভিত্তিকভাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও তথ্যপ্রযুক্তিতে ৩০০ মিলিয়ন ডলার করে এবং স্বাস্থ্যসেবা ও বস্ত্র খাতে ২০০ মিলিয়ন ডলার করে সম্ভাব্য বিনিয়োগ বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে।
সরকারি পর্যটন স্থাপনায় বেসরকারি বিনিয়োগের প্রথম পাইলট প্রকল্প হিসেবে হোটেল শৈবালকে নির্ধারণ করা হয়েছে। ১৩২ একরের এ প্রকল্পের লেনদেন পরামর্শক নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে এবং সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে। পাইলট প্রকল্পটি সফল হলে ৫০টির বেশি পর্যটন স্থাপনা সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের পাইপলাইনে যুক্ত হবে।
নীল অর্থনীতি উন্নয়নের অংশ হিসেবে গভীর সমুদ্রে তিন মাস পর্যন্ত মাছ ধরার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। বিনিয়োগকারীরা সাতটির বেশি গভীর সমুদ্রে চলাচলকারী মাছ ধরার জাহাজ কেনার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছেন। এ ছাড়া মহেশখালী সমন্বিত উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অধীনে একটি জলজ চাষ অঞ্চল গঠনের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ শুরু হয়েছে।
দেশের প্রথম সমন্বিত বিনিয়োগ মানচিত্র তৈরিতে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ও সানেমের সঙ্গে অংশীদারত্বে কাজ করছে ইনভেস্ট বাংলাদেশ। এ কার্যক্রমে দেশের আটটি বিভাগ ও প্রধান খাতগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। ইনভেস্ট বাংলাদেশ জানিয়েছে, বিনিয়োগ পরিবেশ ও সামগ্রিক বিনিয়োগ ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলে—এমন উদ্যোগগুলোর অগ্রগতি নিয়মিতভাবে জনসাধারণকে জানানো হবে।