কুমিল্লায় কিশোর গ্যাং সন্দেহে এক রাতে আটক ৬২৪

অপ্রতিম হত্যার পর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন কর্মসূচিতে কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি ওঠে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে এই অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ। 

আপডেট : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:২৭ পিএম

কুমিল্লা জেলাজুড়ে কিশোর গ্যাং ও বখাটেদের অপতৎপরতা বন্ধে একযোগে বড় ধরনের অভিযান চালিয়েছে পুলিশ। জেলার ১৮টি থানা এলাকায় চালানো এ অভিযানে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য মোট ৬২৪ জনকে আটক করা হয়েছে।

কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নতুন নয়। তবে গত শুক্রবার রাতে ১৩ বছর বয়সী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যার পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। অপ্রতিম হত্যার পর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন কর্মসূচিতে কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি ওঠে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে এই অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ। 

গতকাল বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যার পর থেকে শুরু হয়ে রাত দেড়টা পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন পয়েন্টে এ অভিযান চালানো হয়। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে বেশ কিছু বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী রয়েছে। তাদের অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ততা যাচাই-বাছাই করে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

জেলা পুলিশের মিডিয়া কর্মকর্তা ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার লুৎফুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, সাম্প্রতিক সময়ে জেলাজুড়ে তরুণ ও উদীয়মান বয়সের কিশোরদের নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততা দেখা যাচ্ছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে জেলা পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামানের নির্দেশে এই বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হয়। যেসব এলাকায় বখাটেদের আড্ডা ও কিশোর গ্যাংয়ের প্রভাব রয়েছে, সেসব স্থানকে কেন্দ্র করেই অভিযান চলেছে।

তিনি আরও জানান, কিশোরদের অপরাধে জড়ানো থেকে বিরত রাখতে জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে এ ধরনের অভিযান নিয়মিত অব্যাহত থাকবে।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, আটক ব্যক্তিদের মধ্যে কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় ৭৫ জন, সদর দক্ষিণ মডেল থানায় ৪৬, বুড়িচং থানায় ৫০, মনোহরগঞ্জ থানায় ৪১, দাউদকান্দি থানায় ৫৯ এবং লাকসাম থানায় ৩৫ জন রয়েছেন। অন্যান্য থানাতেও আটক ব্যক্তিদের পরিচয় ও তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের কাজ চলছে।

এদিকে অভিযান শুরুর পর বুধবার রাত আটটার পর থেকেই কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল ও সদর দক্ষিণ মডেল থানাসহ বিভিন্ন থানার সামনে উদ্বেগে থাকা অভিভাবকদের ভিড় জমাতে দেখা যায়। খবর পেয়ে সন্তানদের খোঁজে গভীর রাত পর্যন্ত থানার বাইরে অপেক্ষা করেন অনেকে।

কোতোয়ালি মডেল থানায় আটক হওয়া নগরের একটি পরিচিত স্কুলের দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর মা জানান, তার ছেলে সন্ধ্যার পর প্রাইভেট পড়তে বের হয়েছিল। পরে রাত সাড়ে নয়টায় তিনি জানতে পারেন ছেলে আটক হয়েছে। তিনি বলেন, ছেলেকে ছাড়াতে স্কুলের পরিচয়পত্র নিয়ে এসেছি। পুলিশ জানিয়েছে কোনো অপরাধ না থাকলে যাচাই করে ছেড়ে দেবে। তারা কয়েকজন নাকি আড্ডা দিচ্ছিল। এখন থেকে ছেলের দিকে আরও বাড়তি নজর রাখব।

একইভাবে সদর দক্ষিণ মডেল থানার সামনে মধ্যরাতে অপেক্ষা করছিলেন আরেক অভিভাবক। তার ১৬ বছর বয়সী ছেলে এবার এসএসসি পাস করেছে। তিনি বলেন, পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সামনে বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলার সময় আমার ছেলেকে ধরা হয়। সে কোনো গ্যাংয়ের সাথে যুক্ত নয়। কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে অভিযান ভালো, তবে সাধারণ শিক্ষার্থী ও ভালো ছেলেদের ধরে নিয়ে গেলে তো সমস্যার সঠিক সমাধান হবে না।

সম্প্রতি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে কিশোর গ্যাং দমন ও অপরাধীদের গ্রেপ্তারের বিষয়টি জোরালো আলোচনার জন্ম দেয়। মূলত গত শুক্রবার রাতে ১৩ বছর বয়সী স্কুলছাত্র ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের পর জেলাজুড়ে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়। অপ্রতিম কুমিল্লা বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র এবং কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান ছিল।

গত ১৮ সেপ্টেম্বর কোটবাড়ির বাসা থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হওয়ার পরদিন লালমাই পাহাড়ের জঙ্গল থেকে অপ্রতিমের রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় ইতোমধ্যে মূল হোতা ১৯ বছর বয়সী সাইফুল ইসলাম তুহিনসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যার মধ্যে দুজনই কিশোর। এদের মধ্যে তিনজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছে।

স্থানীয় সূত্র ও পুলিশ নথির তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে কুমিল্লা নগরে কিং স্কোয়াড, স্কোয়াড (রতন গ্রুপ), ইগল, সিবিকে, ক্রাইম সেটআপসহ একাধিক গ্যাং বা চক্র সক্রিয় রয়েছে। এছাড়া অপু ও সাব্বির নামে ব্যক্তিভিত্তিক আরও দুটি দলের নাম এসেছে।

কুমিল্লায় ২০১৫ সাল থেকে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা প্রকাশ্যে এলেও ২০২২ সাল নাগাদ এর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে ২০টিতে পৌঁছায়।

তথ্যমতে, ২০১৭ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে কুমিল্লায় সংঘটিত অন্তত ১২টি হত্যাকাণ্ডে কিশোর গ্যাং সদস্যদের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ মিলেছে। তবে বর্তমানে পুলিশের কাছে গ্যাংগুলোর কোনো হালনাগাদ পূর্ণাঙ্গ তালিকা নেই।

এ বিষয়ে কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল আনোয়ার জানান, আটক ব্যক্তিদের অপরাধের বিবরণ ও শিক্ষার্থী পরিচয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অপরাধের প্রমাণ পাওয়া যাবে, তাদের বৃহস্পতিবার আদালতে পাঠানো হবে। আর অপরাধে জড়িত না থাকা অন্য কিশোরদের কঠোর সতর্কবার্তা দিয়ে অভিভাবকদের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হতে পারে।

কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান জানান, গত বছরের ৩০ নভেম্বর দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ২৫০ জনেরও বেশি কিশোর গ্যাং সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে তারা বয়সে কিশোর হওয়ায় দ্রুত জামিনে বেরিয়ে এসে আবারও একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এ কারণে অনেককে অভিভাবকদের ডেকে মুচলেকা নিয়ে সতর্কও করা হয়েছে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত