একটি ছুরি বা একটি রক্তমাখা পোশাক বা একটি মোবাইল ফোন; কখনো মোটরসাইকেল কিংবা একটি গাড়ি; কখনো ছোট্ট একটি প্যাকেট, যার ভেতরের বস্তু মামলার ভাগ্য বদলে দিতে পারে। অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর এগুলো পুলিশের হাতে আসে ‘আলামত’ হিসেবে। তদন্তে কথা বলে না, কিন্তু আদালতে প্রায়ই এগুলো হয়ে ওঠে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী।
মামলা তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে গেলেও পুলিশের মালখানায় পড়ে থাকে আলামতের বড় অংশই। বর্তমানে ডিএমপির মালখানায় পড়ে আছে ২ লাখ ৩৯ হাজার ২৩৪টি আলামত। সংরক্ষণের জায়গা না থাকায় এগুলো নিয়ে বিপাকে পড়েছে পুলিশ। যথাযথ সংরক্ষণ না হওয়ায় এগুলো নষ্টও হচ্ছে।
রাজধানীর বিভিন্ন থানায় অসংখ্য আলামত বছরের পর বছর ধরে সংরক্ষিত আছে। কোনোটি পড়ে আছে তদন্ত শেষ হওয়ার পরও, কোনোটি বিচার চলাকালের, আবার কোনোটি আদালতের নির্দেশের পরও নিষ্পত্তি না হওয়ায়। নতুন মামলার আলামত আসতে থাকায় পুরনোগুলো জমে তৈরি হচ্ছে জায়গার সংকট। কোনো কোনো আলামত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে সংরক্ষিত থাকার অভিযোগ রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে আদালতের নির্দেশের পরও আলামত মালখানায় পড়ে থাকছে।
ডিএমপির ক্রিমিনাল ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড প্রসিকিউশন বিভাগের মালখানার আলামত সংরক্ষণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডিএমপিতে বর্তমানে ২ লাখ ৩৯ হাজার ২৩৪টি আলামত রয়েছে। তার মধ্যে ৮ হাজার ২৬৪টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং ৩৫টি যানবাহন। আলামতগুলোর অধিকাংশই হত্যা, ধর্ষণ, মোবাইল ও মাদকসংক্রান্ত।
এক থেকে তিন বছরের ঊর্ধ্বে আলামতের সংখ্যা ২ লাখ ১৬ হাজার ৮৬৩। এক বছরের কম সময়ের আলামতের সংখ্যা ২২ হাজার ৩৭১।
২০২৪ সালে হাইকোর্ট আদালতের মালখানায় পড়ে থাকা বিভিন্ন মামলার আলামতের সর্বশেষ অবস্থা জানতে চান। ডিএমপি একটি প্রতিবেদনে হাইকোর্টকে জানায়, দীর্ঘদিন মামলার আলামতের ফয়সালার বিষয়টি বন্ধ রয়েছে। মামলার নিষ্পত্তি হলেও আদালতের আদেশনামা মালখানায় না পৌঁছানোয় এ জটিলতা তৈরি হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ডিএমপির মালখানায় ১৯৭২ সাল থেকে এখন পর্যন্ত গুলিসহ অস্ত্র, গাড়ি ও অন্য আলামত সংরক্ষিত আছে। ২০১০ সালের আগের কোনো আলামত নিষ্পত্তির বিষয়ে আদালতের আদেশনামা পাওয়া যায়নি। ওই বছর পর্যন্ত মালখানায় ২ লাখ ৬০ হাজার মামলা ও জিডির বিপরীতে পুলিশের মালখানায় অন্তত ৫ লাখ আলামত সংরক্ষিত রয়েছে বলে জানানো হয়।
পুলিশসূত্রে জানা গেছে, ডিএমপির শাহবাগ, বছিলা, কাঁচপুর ও মিরপুর পুলিশ লাইন্সে আলামত সংরক্ষিত রাখা হয়। বর্তমানে শাহবাগ ডাম্পিংয়ে মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ ও সিটিটিসিসহ রমনা ও লালবাগ ট্রাফিক বিভাগ গাড়ি রাখে। ডিবির মালখানার হিসাব বলছে, শাহবাগ ডাম্পিংয়ে তাদের ১০ বিভাগের ৩৩৩টি মামলা ও জিডির ৩৯০টি গাড়ি রয়েছে। অনেক মামলার নিষ্পত্তি হয়ে গেলেও আলামত বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি আদালত।
ডিএমপির ক্রাইম, গোয়েন্দা ও ট্রাফিক বিভাগ প্রতিদিন বিভিন্ন মামলা ও জিডিতে অভিযুক্তসহ আলামত জব্দ করছে। এসব আলামতের অধিকাংশ পড়ে থাকে পুলিশের ডাম্পিংয়ে। এভাবে পড়ে থেকে গুরুত্বপূর্ণ আলামত নষ্ট হলে তা মামলার ভবিষ্যৎ কার্যক্রমে প্রভাব ফেলতে পারে।
সম্প্রতি শাহবাগ ডাম্পিংয়ে গিয়ে দেখা গেছে, রিকশা, স্পিডবোট, মোটরসাইকেল, বাস, ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে মামলার গুরুত্বপূর্ণ আলামত। সেখানে অনেক গাড়ির ধ্বংসাবশেষ ছাড়া কিছুই নেই। অনেক গাড়ির চাকা ও মূল্যবান জিনিসপত্র নেই। আলামতের নিরাপত্তার জন্য ডিবির দুজন ও আনসার সদস্য রয়েছেন। তারপরও কীভাবে যন্ত্রাংশ খোয়া গেছে, তার উত্তর নেই। জায়গা সংকটের কারণে একটির ওপর আরেকটি রেখে থরে থরে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। কোনোটি আবার মাটির সঙ্গে মিশে যাওয়ার পর্যায়ে।
ডিএমপির মালখানার তথ্যে ৩৫টি যানবাহন দেখানো হলেও শাহবাগ ডাম্পিং স্টেশন, শাহবাগ থানা, গুলশান, বনানী, রমনা, মোহাম্মদপুর, আদাবর, পল্টন ও মতিঝিল থানার সামনে গিয়েও দেখা গেছে জব্দ গাড়ির স্তূপ। এসব গাড়ি কি নিষ্পতির পরও নেয়নি মালিকরা? সংশ্লিষ্টরা কোনো তথ্য জানাতে পারেনি।
ডিএমপির এক ঊধ্বর্তন কর্মকর্তা বলেন, ‘পুরনো মামলার আলামত চিহ্নিত করা, আদালতের আদেশ সংগ্রহ, সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী কর্মকর্তা বা মামলার নথি খুঁজে বের করা এবং আইনিপ্রক্রিয়া অনুসরণ করে আলামত-নিষ্পত্তি একটি দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। মামলার আলামত জব্দ করার পর তদন্তকারী কর্মকর্তা নির্দিষ্ট নিয়মে মালখানায় আলামত জমা দেন। প্রয়োজনে আদালতে উপস্থাপন ও ফরেনসিক পরীক্ষাগারে পাঠানো কিংবা তদন্তের কাজে ব্যবহারের পর আলামত আবারও পুলিশের হেফাজতে ফিরে আসে। মামলার বিচার শেষ হওয়ার পর আলামত নিয়ে আদালতের নির্দেশনা থাকে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আলামত প্রকৃত মালিককে ফেরত দেওয়া, কোনোটি ধ্বংস করার কিংবা অন্যভাবে নিষ্পত্তির নির্দেশ দেওয়া হয়। বাস্তবে এসব প্রক্রিয়া শেষ করতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়।
রাজধানীর থানাগুলোতে প্রতিদিন বিপুল মামলা ও জব্দের ঘটনা ঘটে। বিভিন্ন আকারের আলামত থাকে। পুরনো আলামত সরানো না গেলে সংকট বাড়তেই থাকে।
প্রতিটি আলামতের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে একটি মামলা, একটি জব্দ তালিকা, একটি মামলা নম্বর এবং অনেক ক্ষেত্রে আদালতের নির্দেশনা। একটি পুরনো আলামত খুঁজে বের করতে তাই শুধু মালখানার তাক নয়, খুঁজতে হয় সংশ্লিষ্ট নথি এবং মামলার ইতিহাসও। প্রতিটি আলামতের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি মামলার গল্প। কখনো একজন নিহত মানুষের শেষ প্রমাণ, কখনো একজন ভুক্তভোগীর ন্যায়বিচারের আশা, কখনো আবার একজন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে কিংবা পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। তাই মালখানার তাকের ওপর পড়ে থাকা প্রতিটি পুরনো প্যাকেট, মরিচা ধরা অস্ত্র কিংবা ধুলোমাখা নথি এলে নিছক পুরনো জিনিস নয়। আলামত কখন, কোথায় এবং কার হেফাজতে ছিল তার ধারাবাহিকতা বলা হয় চেইন অব কাস্টডিতে। এ ধারাবাহিকতায় সামান্য অসংগতিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে ডিজিটাল ডিভাইস, জৈবিক নমুনা, রক্ত, পোশাক বা অন্য ফরেনসিক আলামত দীর্ঘদিনের ভুল সংরক্ষণে প্রমাণের মান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আলামতের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শুধু মালখানার জায়গা কমে না; বাড়ে প্রমাণ নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও।
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন : মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ উমর ফারুক দেশ রূপান্তরকে বলেন, মামলার ক্ষেত্রে আলামত বড় ধরনের সাক্ষ্য/প্রামাণিক বিষয়। মামলার ক্ষেত্রে বিশেষ করে বৈজ্ঞানিক তদন্তের ক্ষেত্রে এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আলামতের অভাবে অনেক সময় আসামিরা ছাড়া পেয়ে যান। এ ছাড়া পুলিশি তদন্তও দুর্বল হয়ে যায়। আলামত সংরক্ষণ এবং আলামত রক্ষণাবেক্ষণ একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রকৃত আসামিকে শনাক্ত এবং তার শাস্তি প্রদান করার ক্ষেত্রে একটা বড় বাধা হচ্ছে আলামত সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণের অভাব থাকে, তদন্ত দুর্বল হয়, বিচার বিঘিœত হয়।
তিনি বলেন, ফরেনসিক আলামতের ক্ষেত্রে যেটা দেখি গুলির খোসা, ভাঙা কাচ ও অস্ত্র এগুলো রাখা যায়। কিন্তু জৈবিক আলামত বেশি দিন ল্যাব ছাড়া কোথাও সংরক্ষণে রাখার সুযোগ নেই। থানা পর্যায়ে সেই ব্যবস্থা নেই। থানার মালখানায় যদি ঢালাওভাবে ফেলে রাখা হয়, তবে সেটার কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তার মতে, মালখানা যেটা আছে সেটাকে আধুনিকায়ন করা উচিত।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞ অ্যাডভোকেট এহসানুল হক সমাজী দেশ রূপান্তরকে বলেন, কোনো ঘটনার পর আলামত জব্দ করা হয় এবং যেটা অফেন্সের কাজে ব্যবহৃত হয়। এর মধ্যে মাদক ও আগ্নেয়াস্ত্র যখন জব্দ করা হয়, তখন অবশ্যই এই আলামতগুলো মামলা প্রমাণের জন্য সহায়ক। যদি এটা কোর্টে প্রডিউস না করা হয়, তাহলে সেই ক্ষেত্রে প্রসিকিউশন কেসে প্রভাব পড়ে আলামতের অভাবের কারণে। আর কিছু আলামত আছে, যে আলামতগুলো প্রমাণের সঙ্গে সম্পৃক্ত, কিন্তু সেটা যদি কোর্টে না আনা হয় অথবা কোনো কারণে যদি না থাকে, তাহলে সেটা মামলায় প্রভাব ফেলবে।
তিনি বলেন, যেই আলামতগুলো প্রসিকিউশন প্রমাণের সপক্ষে তদন্তকালের একজন পুলিশ অফিসার অথবা অন্য কোনো কর্মকর্তা জব্দ করে থাকেন, সেই আলামতগুলো বিচারকালীন আদালতে উপস্থাপন করা অত্যন্ত জরুরি। যদি কোনো কারণে সেটা উপস্থাপিত না হয়, সেই ক্ষেত্রে প্রসিকিউশন কেসের মেরিটে প্রভাব পড়ে এবং সেই ক্ষেত্রে প্রসিকিউশন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ইলেট্রনিক ডিভাইস, আগ্নেয়াস্ত্র ও মাদকসহ কিছু আলামত কোর্টের মালখানায় প্যাকেটে ভরে নাম্বারিং করে রাখা হয়। আর পচনশীল আলামত সাধারণত সিআইডিসহ অন্যান্য সংস্থার ল্যাবে সংরক্ষণ করা হয়। আলামত ছাড়া তো মামলা প্রমাণ করা মুশকিল। আলামত ছাড়া মামলা ফাইনালের দিকে যাওয়াও সম্ভব নয়। ফলে আলামতগুলোর যথাযথ সংরক্ষণ জরুরি। মাদকের মামলা ও অস্ত্র মামলার আলামত না থাকলে, মামলারই গুরুত্ব থাকবে না।
ডিজিটাল ব্যবস্থাপনাই সমাধান : অপরাধ-তদন্ত ব্যবস্থাকে আধুনিক করতে মামলার আলামত ব্যবস্থাপনাকে ডিজিটাল করার বিকল্প নেই। বিশ্বের আধুনিক পুলিশিং ব্যবস্থায় আলামত ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। প্রতিটি আলামতের জন্য ইউনিক আইডি বা বারকোড থাকতে পারে। স্ক্যান করলেই জানা যাবে আলামতটি কোন মামলার, কবে জব্দ হয়েছে, কোথায় রাখা আছে, সর্বশেষ কখন আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে এবং এর বর্তমান অবস্থা কী। ফরেনসিক পরীক্ষায় পাঠানোর তথ্যও একটি কেন্দ্রীয় ব্যবস্থায় রাখা সম্ভব। মামলা নিষ্পত্তি হলে সংশ্লিষ্ট আদালতের আদেশও ওই ডেটাবেজে যুক্ত করা যেতে পারে। এতে দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা আলামত স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হবে। এতে বহু পুরনো আলামত শনাক্ত ও নিষ্পত্তির কাজ সহজ হতে পারে।
পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি) ফরেনসিক ডিএনএ ল্যাবরেটরি (২৩ জানুয়ারি ২০১৭) প্রতিষ্ঠার পর ধর্ষণ, অজ্ঞাত-পরিচয়ের মৃতদেহ শনাক্তকরণ, পিতৃত্ব বিরোধের নিষ্পত্তি, ডাকাতি ও হত্যাসহ প্রায় ৬ হাজার মামলার বিপরীতে ১৬ হাজারের অধিক আলামতের ২০ হাজার ডিএনএ প্রোফাইলিং করা হয়েছে। ডিএনএ ব্যাংকে সংরক্ষিত অপরাধীদের প্রোফাইল পরে অপরাধী শনাক্তকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ পর্যন্ত বিভিন্ন মামলার সঙ্গে সম্পর্কিত প্রায় ১৫ হাজার প্রোফাইল ডিএনএ ব্যাংকে সংরক্ষিত আছে।
পুলিশ বলছে, মামলার বিচারকাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তারা আলামতের নিরাপত্তা দেয়। তবে ডিএমপির একাধিক ওসির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আলামতের জব্দ-তালিকা আদালতে জমা দেওয়ার পর আদালতের নির্দেশ ছাড়া কিছুই করা যায় না। তবে মামলা নিষ্পত্তি হওয়ার পর আদালত আর আলামত-নিষ্পত্তিতে উদ্যোগ নেয় না। এতে আলামতের বোঝা বাড়তেই থাকে। অযতেœ পড়ে থেকে নষ্ট হয়ে যাওয়ায় আলামতের জিনিস নিতে অনাগ্রহ দেখায় মালিকরা।
এ বিষয়ে ডিএমপির প্রসিকিউশন বিভাগের উপ-কমিশনার মহিউদ্দিন মাহমুদ সোহেল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মাদক সম্পর্কিত আলামতগুলো প্রতিনিয়ত ধ্বংস করা হয়। আবার নতুন করে যুক্তও হচ্ছে। এতে সংখ্যা কমে না। যানবাহন বিষয়ক সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ কোর্টের। যতক্ষণ পর্যন্ত কোর্টের আদেশ না হয়, ততক্ষণ পুলিশ কিছুই করতে পারে না।’
তিনি বলেন, আলামত দুই ধরনের। একটা হচ্ছে মামলা সম্পূর্ণ নিষ্পত্তি হয়ে গেছে, আরেকটা হচ্ছে চলমান রয়েছে। চলমানগুলোর হিসাব আলাদা।
যা বলছেন গাড়ির মালিকরা : মতিঝিল থানার সামনে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে খোঁজ করা হয় গাড়ির প্রকৃত মালিক কে। প্রাইভেট কারটি রেজিস্ট্রেশন করা মইনুদ্দিন শাহ নামে এক ব্যক্তির নামে। কাগজপত্রে থাকা ফোন নম্বরে কল করলে নাজমুল হাসান নামে এক যুবক কথা বলেন। তিনি মইনুদ্দিনের ভাতিজা বলে পরিচয় দেন। এরপর গাড়িটি সম্পর্কে জানতে চাইলে নাজমুল হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কয়েক বছর আগে মাদকের চালানসহ পারিবারিক গাড়ি নিয়ে মতিঝিল থানা পুলিশের হাতে আটক হই। পরে আর গাড়িটি পুলিশ হেফাজত থেকে নেওয়া হয়নি। পরিবার জামিনে বের করে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেয়।’
নাজমুল হাসান বলেন, ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে গাড়িতে মাদক নিয়ে ঢাকায় প্রবেশের সময় বন্ধু মামুনসহ পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়ে কিছু দিন কারাগারে ছিলাম। এরপর জামিনে বের হয়ে সৌদি আরবে চলে যাই। এখন দেশে বেড়াতে এসেছি। সৌদিতে পারিবারিক ব্যবসা দেখাশোনা করি। বন্ধু মামুনও এখন বিদেশে। মাদকসহ গাড়ি ধরা পড়ে গেলে অনেকে নেয়, অনেকে নেয় না, নেয় কারা জানেন যারা আবার মাদক কারবার করবে তারা। আমার তো এখন দেশে গাড়ি চালানোর লোকই নেই। পুরো পরিবার বিদেশে থাকে, গাড়ির প্রয়োজন কী!’
কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে দেখা গেছে, গাড়িটি ২০০৫ সালে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষে (বিআরটিএ) রেজিস্ট্রেশনভুক্ত হয়। ২০২২ সালে গাড়ির ফিটনেস লাইসেন্স মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে যায়। এরপর গাড়ির কাগজপত্র আপডেট করেনি মালিক।
সরেজমিনে শাহবাগ ডাম্পিং স্টেশনে গিয়ে দেখা গেছে, ঢাকা মেট্রো-ঘ ৫১-২৪৬৮ নম্বরের একটি গাড়ি পড়ে আছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বনশ্রী থেকে বেইলি রোডে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে শিক্ষার্থীদের বহনকারী একটি গাড়ির মালিক শামীম হোসেন। তার বাবা-দাদাও একই সার্ভিস দিতেন বলে জানান তিনি। তার নিয়ন্ত্রণাধীন তিনটি মাইক্রোবাসের একটির ফিটনেসের মেয়াদ শেষ হয়েছে ১৩ বছর আগে। তার দাবি, তিন বছর আগে গাড়িটি কিনেছেন শামীম।
শামীম হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ১৫-২০ দিন আগে মগবাজার থেকে গাড়িটি ডাম্পিং করে ট্রাফিক পুলিশ। এরপর থেকে স্কুলে শিক্ষার্থীদের নিয়ে যাওয়া-আসায় বেশ ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। এতদিন গাড়ি চালানোর কারণে পুলিশের সঙ্গে মাসিক চুক্তি ছিল, এ জন্য ধরত না।
গাড়ির কাগজপত্র যাচাই করে দেখা গেছে, মাইক্রোবাসটি (ঢাকা মেট্রো-ঘ ৫১ -২৪৬৮) ২০০১ সালে আর্কাইভ ও গ্রন্থাগার অধিদপ্তরের নামে নিবন্ধিত হয়। ২০১২ সালের মার্চে সর্বশেষ গাড়িটির ফিটনেস ইস্যু করা হয়। ২০১৩ সালে গাড়িটির ফিটনেস মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে যায়। এরপর আর গাড়িটি বিআরটিএ চত্বরে যায়নি।