নদ-নদীর প্রাণ ওষ্ঠাগত

প্রবহমানতায় ঘুচুক বিপন্নতা

আপডেট : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৩২ এএম

১৯১৫ সালে বোলপুর থেকে কলকাতা যাওয়ার পথে ট্রেনে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘ওগো নদী, আপন বেগে পাগল-পারা,/আমি স্তব্ধ চাঁপার তরু গন্ধভরে তন্দ্রাহারা/আমি সদা অচল থাকি, গভীর চলা গোপন রাখি,/আমার চলা নবীন পাতায়, আমার চলা ফুলের ধারা/ওগো নদী, চলার বেগে পাগল-পারা...’। সার্বিকভাবে বাংলার চিরন্তন রূপ মানসপটে ধারণ করেই তিনি নদী নিয়ে তার অনুভূতির এই অসাধারণ অভিব্যক্তির প্রকাশ ঘটিয়েছিলেন। আমাদের জনজীবনের স্বার্থে ও প্রাকৃতিক ভারসাম্যর সুরক্ষায় নদনদীর গুরুত্ব পরিমাপহীন। কিন্তু নদীমাতৃক এই বাংলাদেশে নদ-নদীর প্রাণ কতটা ওষ্ঠাগত ফের এরই চিত্র উঠে এসেছে ২৭ সেপ্টেম্বর দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে নদীর সীমানা দখল করে গড়ে উঠছে স্থাপনা। কোথাও নদী ভরাট করে বদলে দেওয়া হচ্ছে গতিপথ। শিল্পবর্জ্য, পয়ঃনিষ্কাশন ও কঠিন বর্জ্যে দূষিত হচ্ছে পানি। কোথাও আবার নাব্য হারিয়ে সরু হচ্ছে নদী। ফলে একদিকে কমছে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও জল ধারণক্ষমতা, অন্যদিকে সংকুচিত হচ্ছে মাছসহ জলজ প্রাণীর আবাসস্থল।

এমন প্রেক্ষাপটেই ২৭ সেপ্টেম্বর বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও  পালিত হয়েছে বিশ্ব নদী দিবস। আমরা জানি, দখলে-দূষণে তো বটেই, সরকারের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল মহলের নদীশাসন কিংবা নদীরক্ষায় ক্রমাগত ব্যর্থতার ফলে দেশের নদ-নদীর বিপন্নতা আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবো) ও জাতীয় নদীরক্ষা কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত তথ্যে জানা যায়, দেশে বর্তমানে মোট নদ-নদীর সংখ্যা ১ হাজার ৪১৫টি। এই সংকটের প্রতিবিধানের বিষয়গুলো আলোচনা-পর্যালোচনা আর সিদ্ধান্ত গ্রহণের মধ্যেই বৃত্তবন্দি হয়ে আছে। নাব্য হারানোর চিত্রও উদ্বেগজনক পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে। ওই প্রতিবেদনেই বলা হয়েছে, গত ২৫ বছরে দেশের নদ-নদী থেকে অন্তত ২৮ হাজার ৩২৫টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে ১ হাজার ২৪৪ দশমিক ২২ একর তীরভূমি উদ্ধার করেছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্র্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। গত বছর ডিসেম্বরে প্রকাশিত তালিকায় সারা দেশে ২১ হাজার ৯৮৮ জন অবৈধ নদী দখলদার শনাক্ত করেছে জাতীয় নদীরক্ষা কমিশন। এর বিপরীতে উদ্ধার করা তীরভূমির বৃহদাংশ ফের বলবানদের মুঠোয় চলে যাওয়ার খবরও উঠে এসেছে সংবাদমাধ্যমেই। দখল ঠেকানোই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জীবন-জীবিকা, কৃষ্টি-সংস্কৃতি, ইতিহাস-ঐতিহ্য তথা অস্তিত্বের ওপরও আঘাত হানা হচ্ছে। দখল-দূষণের শিকার হয়নি দেশে এমন নদী খুঁজে পাওয়া ভার। দেশের নদনদীগুলোর অবস্থা এতটাই উৎকণ্ঠার, বিশেষ কোনো একটি দিবসে সেমিনার-সিম্পোজিয়াম বা আলোচনায় কোনো ফল আসবে না। ‘তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা মেঘনা যমুনা’ সেøাগানে মুখরিত ১৯৭১ ছিল মুক্তিযুদ্ধের সাহস-প্রেরণা। জালের মতো ছড়িয়ে থাকা নদ-নদীর প্রাকৃতিক ব্যূহ ১৯৭১-এ আমাদের বিজয়ে ভূমিকা রাখলেও স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে এর প্রতি আমরা সুবিচার করিনি। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাচ্ছে। নদীগুলোর নাব্য সংকটে পানির ধারণক্ষমতাও কমছে, বন্যার অভিঘাতে জনজীবন ও আর্থিক ক্ষতি স্ফীত হচ্ছে। বাংলাদেশকে ভৌগোলিকভাবে ভাটির দেশ বলা হয়। নদীবাহিত পলি-বালি দ্বারা গঠিত বাংলাদেশ মূলত প্লাবনভূমির দেশ। দেশে নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে অসংখ্য হাটবাজার ও নদীবন্দর। কৃষিজমির পানির প্রধান উৎসও নদী, খাল ও

প্রাকৃতিক জলাশয়। তিস্তা সেচ, গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ ও মাতামুহুরী সেচের মতো বড় বড় প্রকল্পের প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে জমিতে পানি সরবরাহ ঠিক রেখে ফসল উৎপাদন নিশ্চিত করা।

নদনদীকে বাংলাদেশের প্রকৃতির দানও বলা যায়। কিন্তু এর যে দুরবস্থা দেখা দিয়েছে এবং এর পরিণতি আর কতটা বহুমুখী নেতিবাচক হতে পারে তা অনুধাবন করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সহ দায়িত্বশীল সব পক্ষকে দ্রুত প্রতিবিধানের জোর তাগিদ আমরা দিই। দূষণ-দখল ঠেকানোসহ নদ-নদীর নাব্য রক্ষায় করণীয় নির্ধারণ করে তা বাস্তবায়ন করতে হবে দেশ জাতির বৃহৎ স্বার্থে। দখল-দূষণ তো বটেই, মনুষ্যসৃষ্ট নানা কর্মকাণ্ডে দেশের সিংহভাগ নদ-নদী অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। নদ-নদী শুধু আমাদের কাছেই নয়, সমগ্র পৃথিবীর ধমনির মতো। এর প্রবহমানতায় জীবনরক্ষার পথ মসৃণ হয়। কিন্তু যেভাবে পরিবেশ-প্রতিবেশ হুমকির মুখে ঠেলে দেওয়ার উন্মত্ততা পরিলক্ষিত হচ্ছে তাতে প্রশ্ন জাগে, মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কযুক্ত পরিবেশের ধ্বংসলীলা প্রত্যক্ষ করে হা-হুতাশ করাই কি নিয়তি?

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত