না আছে দৈহিক নিরাপত্তা, না অর্থনৈতিক

আপডেট : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৩৫ এএম

দেশের বিদ্যমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নানা মহল থেকে প্রশ্নের কাতার দীর্ঘ হচ্ছে। খুন, ধর্ষণ, ছিনতাইসহ নানাবিধ সমাজবিরোধী কর্মকা- বাড়ছে পাল্লা দিয়ে। সম্প্রতি কুমিল্লার শিশু শিক্ষার্থী অপ্রতিম আর খুলনায় একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আজমুল কীভাবে সময়ের দুঃসহ স্মারক হয়ে দাঁড়াল এর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ নতুন করে নিষ্প্রয়োজন। সংবাদমাধ্যম আর সামাজিক মাধ্যমের কল্যাণে সচেতন মানুষ মাত্রেরই তা জানা। নিরাপত্তাহীনতার ছায়া আর কত প্রলম্বিত হবে এই প্রশ্নটি নানা মহল থেকে সংগত কারণেই বড় হয়ে সামনে এসেছে। প্রায় নিত্য সংবাদমাধ্যমে নিরাপত্তাহীনতার চিত্র উঠে আসছে আর এ জন্যই এমন প্রশ্ন বারবার উঠছে। ‘এটা কোন দেশ? আমি বাঁচব কীভাবে? আমার তো একটাই ছেলে। কীভাবে আমার জীবন কাটাব? আপনারা সবাই বলেন, ওকে ছাড়া আমি কীভাবে থাকব’ অপ্রতিমের মায়ের এই জিজ্ঞাসার উত্তর আমাদের জানা নেই। রাষ্ট্রশক্তি কী উত্তর দেবে, তাও জানি না। কিš‘ নাগরিক সমাজের এমন জিজ্ঞাসা নিশ্চয় প্রীতিকর যে নয় এ নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। 

আজমুল ‘ভাত চুরি’র অভিযোগে প্রাণ হারাল যাদের হাতে তারা পেশাদার সন্ত্রাসী নয়। অর্থাৎ অপরাধীর তালিকায় কে কখন নাম লেখাচ্ছে তা বলা মুশকিল। তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঘটিয়ে ফেলছে অচিন্তনীয় ঘটনা। এই প্রেক্ষাপটে অপরাধীর সংজ্ঞা নির্ণয় করা ক্রমেই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। যারা অপ্রতিমকে হত্যা করেছে তারা কিশোর। তাকে কি শুধু একটি আইফোনের জন্য হত্যা করল ওরা! প্রতিটি খুনই আমাদের সামনে অনেক প্রশ্নের জন্ম দেয়। সমাজে অপরাধের গাঢ় ছায়া যেভাবে প্রলম্বিত হচ্ছে তাতে আরও প্রশ্ন জাগে, এই অবক্ষয়ের পেছনে দায় কার? প্রশাসন-সরকার-সমাজ-পরিবারের  কমবেশি ভূমিকা রয়েছে স্থিতিশীল সমাজ গঠনের ক্ষেত্রে। স্থিতিশীল সমাজ গঠনে রাজনীতির ভূমিকা অনেক। কিন্তু জানমালের নিরাপত্তাসহ সমাজে শান্তিপূর্ণভাবে মানুষের বসবাস নিশ্চিত করার সবচেয়ে বড় দায় রাষ্ট্র ও সরকারের। এ ক্ষেত্রে সরকারের কোনো অজুহাত দাঁড় করানোর অবকাশ নেই। সরকারের মুখ্য দায়িত্ব জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। 

দেশের বর্তমান পরিস্থিতি বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যে মোটেই ভালো নয়, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এটাও অবশ্য সত্য যে, অবস্থা কখনোই ভালো ছিল না। তবে এখনকার পরিস্থিতি বিশেষভাবে মন্দ মনে হচ্ছে কয়েকটি অতিরিক্ত কারণে। প্রথমত, মানুষ আশা করেছিল ব্যবস্থার ও অবস্থার পরিবর্তন হবে। কেবল আশা করেনি, পরিবর্তনের জন্য আত্মত্যাগ করেছে, শ্রম দিয়েছে, আন্দোলন করেছে, অংশ নিয়েছে সরকার পরিবর্তনের সংগ্রামে। কিন্তু মানুষের সেই প্রত্যাশা কি পূরণ হয়েছে? না, হয়নি। কেন হয়নি? এর উত্তর দীর্ঘ, কিন্তু সংক্ষিপ্ত উত্তর হলো ব্যবস্থার পরিবর্তন সত্যিকার অর্থে শাসকরা চাননি, এখনো চান না। দ্বিতীয়ত, সমাজে নির্লজ্জতা আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। গণঅভ্যুত্থানের ভেতর দিয়ে এক স্বৈরশাসনের পতন ঘটেছিল, আমরা তার নাম দিয়েছিলাম ফ্যাসিস্ট স্বৈরাচার। এর পরেও কিন্তু স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিস্ট আচরণ মোটেই কমেনি, আমরা এও সহ্য করেছি, করছি। বোঝা যাচ্ছে, স্বৈরাচারী কর্মকা-কে ধিক্কার দেওয়ার, ধমক দেওয়ার শক্তি সমাজে এখন আর নেই। যা শোনা যায় সবই রাজনৈতিক আওয়াজ। এ-ও এক করুণ নিম্নগমন বটে। তৃতীয়ত, সমাজের সর্বত্র নৃশংসতা ভয়ংকরভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। হত্যাকা- আগেও ঘটত, কিন্তু হত্যা করে মৃতদেহকে টুকরা টুকরা করে ফেলার ঘটনা সহিংসতার ক্ষেত্রে নতুন মাত্রার সংযোজন বটে। এমন ঘটনা তো কম ঘটেনি। শিশু-নারী ধর্ষণের ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি ধর্ষকদের ভেতরের ঘৃণ্য মানসিকতারই বাইরের প্রকাশ। তাছাড়া বহুক্ষেত্রে এই দুর্বৃত্তদের মাথার ওপর দৃশ্য-অদৃশ্যভাবে বলবানদের হাত ছুঁয়ে আছে। এই অবস্থায় ওরা তো শক্তিশালী হবেই। 

আগে আমরা জানতাম শত্রু হচ্ছে বিদেশি; সেই শত্রু রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে রেখে আমাদের শোষণ করছে। ওই শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে আমরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছি, আমাদের মধ্যে দেশপ্রেম শক্তিশালী হয়েছে। এখন রাষ্ট্রক্ষমতা দেশি মানুষের হাতে। কিন্তু ক্ষমতা যাদের হাতে, তারা দেশপ্রেমের কোনো দৃষ্টান্ত তো তুলে ধরেনই না, উপরন্তু জনগণকে শোষণ করার কাজ আগের শাসকদের মতোই অব্যাহত রেখেছেন। জনগণের তারা আর যা-ই হোন, মিত্র নন। যেহেতু তারা দেশি এবং নিজেদের ক্ষমতা অক্ষুণœ রাখার তাগিদে জনগণকে বিভক্ত করতে অত্যুৎসাহী ও সক্ষম, তাই তাদের বিরুদ্ধে লড়াইটা জমে ওঠে না, এবং আবার লড়াইয়ের পেছনে যে দেশপ্রেম ছিল, তাও আর বিকশিত হয় না। অন্যদিকে ব্যক্তিগত মুনাফা লাভের যে আদর্শ দেশের শাসকরা দেশবাসীর সামনে তুলে ধরেন, তার প্রভাবে সাধারণ মানুষও দেশের কথা না ভেবে কেবলই নিজের স্বার্থের কথা ভাবেন। উভয় কারণেই সমষ্টিগত মুক্তির যে স্বপ্ন অতীতে আমাদের পরিচালিত করত এবং কঠিন দুঃসময়েও আশাবাদী করে রেখেছিল, সে স্বপ্নটি এখন আর কার্যকর নেই। বস্তুত, সেটি ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। প্রায় প্রত্যেকটি মানুষের জন্যই একটি করে দুঃস্বপ্নের জন্ম দিয়েছে। দেশপ্রেম হারিয়ে আমরা ভীষণভাবে আত্মপ্রেমিক হয়ে পড়েছি। দেশে জ্ঞানী, গুণী আর দক্ষ লোকের কোনো অভাব নেই। আমাদের লোকেরা বিদেশে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছেন। কিন্তু দেশপ্রেমের অভাবের দরুন জ্ঞান, গুণ ও দক্ষতাকে সৃষ্টিশীলতার কাজে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। বন্ধ্যত্বের আসল কারণটা রয়েছে এখানেই।

মানুষ সমাজে বাস করে, সেখানে আজ বড় অভাব নিরাপত্তার। এই নিরাপত্তাহীনতা নানামাত্রিক। না আছে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, না দৈহিক। রাষ্ট্র তার কর্তব্য পালন করতে পারছে না। তার পুলিশ, আমলাতন্ত্র, বিচার বিভাগ কেউ নিরাপত্তা দেয় না, বরং মানুষের জন্য ভীতির কারণ হয়। অন্যদিকে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীগত সন্ত্রাস ঘটছে রাষ্ট্রের ঔদাসীন্যে, আনুকূল্যে ও পৃষ্ঠপোষকতায়। সন্ত্রাসীদের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ আছে বলে মনে হয় না। দেখতে পাচ্ছি অরাজকতা-নৈরাজ্য বাড়ছে । এই অরাজক পরিস্থিতির অভ্যন্তরে সমাজে যা ঘটছে, তা হলো শ্রেণি কর্তৃত্বের আধিপত্য বৃদ্ধি। এই বিশেষ শ্রেণিকে আগে আমরা মধ্যবিত্ত বলতাম, এখন তাকে বিত্তবান বলাই সংগত। কেননা মধ্যবিত্ত এখন আর অবিচ্ছিন্ন নেই, তার একাংশ নেমে গেছে নিচে অন্য অংশ হয়ে উঠেছে উঁচুতে। বিত্তবান এই শ্রেণিটিই আগাগোড়া দেশের সর্বময় কর্তা। এরাই আমলা, এরাই ব্যবসায়ী; রাজনীতিও এরাই করে, শিল্প-সংস্কৃতিও রয়েছে এদেরই নিয়ন্ত্রণে; যদিও এদের সংখ্যা জনগণের তুলনায় ৫ শতাংশের বেশি হবে না। এই শ্রেণির মধ্যে দেশপ্রেম নেই, এর সদস্যরা গণতন্ত্রেও বিশ্বাস করে না। রাষ্ট্রের উত্থান-পতন, সরকারের রদবদল সবকিছুর ভেতরে অব্যর্থ রয়েছে এই শ্রেণির শক্তি সঞ্চয়। সব সরকারই  জননিরাপত্তার ব্যাপারে জোর দেয় বটে, কিন্তু এর বাস্তবায়ন আমরা কতটা দেখি, এই প্রশ্নটির উত্তর প্রীতিকর নয়। 

পুলিশ একটি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা কিন্তু এই পুলিশকে রাজনৈতিকভাবে প্রতিটি রাজনৈতিক সরকার নিজেদের স্বার্থে কমবেশি ব্যবহার করেছে, তা পুরনো অভিযোগ। জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর বিশেষ করে পুলিশের পেশাদারিত্ব, নিরপেক্ষতা, কার্যকারিতা নিশ্চয় জরুরি। একেকটি ঘটনা ঘটছে আর নানা মহল থেকে দাবি ওঠে, নিরাপত্তাহীনতার বলি যেন আর কেউ না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু এই বলা তো শেষ হচ্ছে না! অপ্রতিম-আজমুলের নৃশংস ঘটনায় আবারও একই দাবি। এটা তো সত্য, দায়িত্বশীল কারোরই জননিরাপত্তা নিয়ে আত্মতুষ্টির কোনো অবকাশ নেই। আমরা চাই, দৃষ্টান্তযোগ্য দ্রুত প্রতিবিধান এবং একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সব পক্ষের জবাবদিহি। আরও পরিষ্কার করে বলতে চাই, রাজনৈতিক-সামাজিক প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে সম্পূর্ণ স্বাধীন-নিরপেক্ষভাবে অপরাধীদের মূলোৎপাটনে চালাতে হবে সাঁড়াশি অভিযান। দ্রুত বিচার তো বটেই, একই সঙ্গে নজর দিতে হবে উৎসে। প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক নজরদারির বিকল্প নেই, এই কথাটি নানা মহল থেকে বলা হচ্ছে কিন্তু এরও আগে জরুরি, নির্মোহ রাজনৈতিক সদিচ্ছা। রাজনৈতিক স্বচ্ছতা যে পর্যন্ত নিশ্চিত না হবে সেই পর্যন্ত সমাজ অন্ধকারমুক্ত হবে না। জননিরাপত্তার বিদ্যমান সংকটকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। জননিরাপত্তার নিশ্চয়তা বিধান বিদ্যমান বাস্তবতায় বড় চ্যালেঞ্জ এই সত্য আমলে নিয়ে অঙ্গীকার-প্রতিশ্রুতির কথা আর না শুনিয়ে প্রকৃত কাজ করতে হবে।

বাজারে যান সেখানে মূল সন্ত্রাসীরা ওঁৎ পেতে বসে মানুষের পকেট কীভাবে কাটবে।

খাদ্যপণ্য নিয়ে চলছে আরেক তুঘলকি কান্ড। দুর্বৃত্তরা মানুষকে তাদের খাদ্যপণ্যের বদলে বহুক্ষেত্রে বিষ খাওয়াচ্ছে। এসব দেখভালের সরকারের সুনির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান আছে, আছে আইনানুগ প্রতিবিধানের ব্যবস্থা কিন্তু কার্যত সবাই অসাড়। দেশ রূপান্তরে সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাবনা-সিরাজগঞ্জ অঞ্চলে কেমিক্যাল দিয়ে দুধ বানাচ্ছে ব্যবসায়ী নামের দুর্বৃত্তরা আর সরকারি প্রতিষ্ঠান মিল্কভিটাসহ অন্যান্য কোম্পানি তাদের কাছ থেকে দুধ কিনে বাজারজাত করছে। মানুষ বহুমাত্রিকভাবে আক্রান্ত। এই সমাজকে মানবিক বলার কোনো অবকাশ আছে কি? মানুষের জীবন নিয়ে আর কোনো হেলাফেলা নয়। দুর্বৃত্তদের মূলোৎপাটন করা চাই। বিদ্যমান ব্যবস্থাধীনে সম্ভব হবে বলে ভরসা রাখতে পারা দুষ্কর। চাই ব্যবস্থার বদল। প্রত্যাশা করছি, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র ও সরকার সাফল্য অর্জন করবে। 

লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত