একুশ শতকের দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে তাল মেলাতে বাংলাদেশ তার আর্থিক খাতে একটি যুগান্তকারী রূপান্তরের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। দেশে প্রথমবারের মতো চারটি ডিজিটাল ব্যাংক প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্র্তৃক প্রাথমিক সম্মতিপত্র বা ‘লেটার অব ইনটেন্ট’ প্রদানের সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে দেশের ফাইন্যান্সিয়াল টেকনোলজি (ফিনটেক) এবং সার্বিক আর্থিক খাতের জন্য এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। বিকাশ ডিজিটাল ব্যাংক, বুস্ট-রবি ডিজিটাল ব্যাংক, ডিজিটাল ব্যাংক অব ভুটান-ডিকে এবং নোভা ডিজিটাল ব্যাংক (বাংলালিংক ও স্কয়ার) এই চার প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন দেশের প্রথাগত ব্যাংকিং কাঠামোর দীর্ঘদিনের স্থবিরতা ভেঙে একটি বিশ্বমানের, আধুনিক ও প্রযুক্তিভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তোলার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই রূপান্তর কেবল কাগজের নথি ও ভৌত শাখা বাতিলের বিষয় নয়; বরং এটি দেশের সর্বস্তরের মানুষকে আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির অংশ করে তোলার এক সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক অভিযাত্রা। কাঠামোগত পরিবর্তন ও নতুন ইকোসিস্টেম ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের মূল দর্শন হলো সম্পূর্ণ শাখাহীন ও কাগজবিহীন সেবা প্রদান। সাধারণ ব্যাংকের মতো এখানে কোনো ইট-পাথরের বিল্ডিং, কাউন্টার বা দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ানোর বাধ্যবাধকতা
থাকবে না। গ্রাহকের হাতের মুঠোয় থাকা স্মার্টফোন, অ্যাপ এবং সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মই হবে ব্যাংকের মূল কেন্দ্র। ই-কেওয়াইসি এবং জাতীয় পরিচয়পত্রের সহায়তায় মাত্র কয়েক মিনিটেই অ্যাকাউন্ট খোলা থেকে শুরু করে আমানত জমা, অর্থ স্থানান্তর এবং ঋণ আবেদন সবকিছুই সম্পন্ন করা যাবে চব্বিশ ঘণ্টা সপ্তাহের সাত দিন।
এই চার প্রতিষ্ঠানের গঠনশৈলী বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এখানে দেশের শীর্ষস্থানীয় মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস, টেলিকম অপারেটর, শক্তিশালী দেশীয় শিল্পগোষ্ঠী এবং আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং অভিজ্ঞতার একটি ভারসাম্যপূর্ণ মেলবন্ধন ঘটেছে। উদাহরণস্বরূপ, বিকাশ তার বহু বছরের বিশাল গ্রাহকভিত্তি ও ট্রাস্ট নেটওয়ার্ককে কাজে লাগাতে পারবে। অপরদিকে রবি ও বাংলালিংকের মতো বড় টেলিকম অপারেটররা তাদের বিস্তৃত সেলুলার অবকাঠামো, ডাটা নেটওয়ার্ক এবং বিগ ডাটা অ্যানালিটিক্স ব্যবহার করে প্রত্যন্ত অঞ্চলেও নিরবচ্ছিন্ন সেবা পৌঁছে দিতে পারবে। স্কয়ারের মতো বিশ্বস্ত শিল্পগোষ্ঠী এবং ভুটানের ডিজিটাল ব্যাংকিং কনসোর্টিয়ামের বৈশ্বিক অভিজ্ঞতার অন্তর্ভুক্তি আমাদের অভ্যন্তরীণ আর্থিক ইকোসিস্টেমকে আরও পরিপক্ব ও বৈচিত্র্যময় করবে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি ও বিকাশ বাংলাদেশের প্রথাগত ব্যাংকিং ব্যবস্থার একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো গ্রামীণ অর্থনীতি এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের পর্যাপ্ত সেবা না দেওয়া। সনাতনী ব্যাংকগুলোর জটিল কাগজপত্র, জামানতের শর্ত এবং দীর্ঘ অনুসন্ধানী প্রক্রিয়ার কারণে দেশের বিপুলসংখ্যক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কৃষক, দিনমজুর ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের কর্মীরা ব্যাংক ঋণের বাইরে থেকে যান। বাধ্য হয়ে তারা চড়া সুদে এনজিও বা স্থানীয় মহাজনদের শরণাপন্ন হন। ডিজিটাল ব্যাংকিং এই সংকট নিরসনে গেম-চেঞ্জার হিসেবে কাজ করতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মেশিন লার্নিং এবং অল্টারনেটিভ ক্রেডিট স্কোরিং অ্যালগরিদম ব্যবহার করে ডিজিটাল ব্যাংকগুলো একজন গ্রাহকের মোবাইলের লেনদেন, বিল পরিশোধের ধরন ও ডিজিটাল আচরণের ভিত্তিতে মাত্র কয়েক সেকেন্ডে তার ঋণযোগ্যতা বিচার করতে পারে। প্রথাগত ব্যাংকের তুলনায় ডিজিটাল ব্যাংকগুলো কম সুদে ঋণ দিতে এবং আমানতের ওপর বেশি মুনাফা বা সুদের হার অফার করতে সক্ষম হবে। নিরাপত্তা, ডিজিটাল স্বাক্ষরতা ও অবকাঠামো সম্ভাবনার উজ্জ্বল আলো থাকলেও, ডিজিটাল ব্যাংকিং সফল করার পথে বেশ কিছু গভীর চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান, যা অনুধাবন ও সমাধান করা অত্যন্ত জরুরি।
সম্পূর্ণ প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংক হওয়ায় এগুলো হ্যাকার ও আন্তর্জাতিক সাইবার অপরাধীদের প্রধান লক্ষ্যে পরিণত হতে পারে। ডাটা ব্রিচ, ফিশিং বা সিস্টেমে অনাকাক্সিক্ষত অনুপ্রবেশ ঘটলে কোটি কোটি টাকা ও ব্যক্তিগত তথ্য ঝুঁকিতে পড়তে পারে। দেশে স্মার্টফোনের ব্যবহার বাড়লেও বড় একটি জনগোষ্ঠীর মধ্যে আর্থিক সচেতনতা ও ডিজিটাল মাধ্যমের নিরাপদ ব্যবহার সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান নেই। পিন বা ওটিপি শেয়ারের মাধ্যমে ডিজিটাল প্রতারণার শিকার হওয়ার শঙ্কা থেকেই যায়। দেশের গ্রামীণ ও দুর্গম অঞ্চলগুলোতে এখনো উচ্চগতির নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সংযোগ বড় চ্যালেঞ্জ। দুর্বল নেটওয়ার্কের কারণে লেনদেন আটকে গেলে গ্রাহকের আস্থায় বড় ধরনের আঘাত আসতে পারে। আমাদের করণীয় ও নীতি-কৌশল ডিজিটাল ব্যাংকিংকে টেকসই ও নিরাপদ করতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংককে সর্বোচ্চ সতর্কতা ও আধুনিক তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।
আন্তর্জাতিক মানের সাইবার নিরাপত্তা ফ্রেমওয়ার্ক বাধ্যবাধকতামূলক করতে হবে। প্রতি বছর ডিজিটাল ব্যাংকগুলোর সিকিউরিটি অডিট পরিচালনা করা জরুরি। নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং অনুমোদিত ব্যাংকগুলোর যৌথ উদ্যোগে দেশব্যাপী ব্যাপক ডিজিটাল ফিন্যান্সিয়াল লিটারেসি বা আর্থিক সচেতনতামূলক প্রচারণা চালাতে হবে।
টেলিকম রেগুলেটরি অথরিটিকে দূরবর্তী অঞ্চলগুলোতে উচ্চগতির মোবাইল ডাটা ও নিরবচ্ছিন্ন সার্ভিস নিশ্চিত করতে মোবাইল অপারেটরদের বাধ্য করতে হবে। বিকাশ, রবি, বাংলালিংক-স্কয়ার এবং ভুটান-ডিকে কনসোর্টিয়ামকে প্রাথমিক অনুমোদন প্রদান আধুনিক, বৈষম্যহীন এবং প্রযুক্তিনির্ভর ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়ে তোলার পথে একটি বড় পদক্ষেপ। তবে শুধু লাইসেন্স প্রদানই শেষ কথা নয়; উদ্ভাবন, সাইবার নিরাপত্তা ও নিখুঁত তদারকির সমন্বয় ঘটানো না গেলে এই উদ্যোগের পূর্ণ সুফল অর্জন কঠিন হবে। প্রথাগত ব্যাংকিং খাতের বিদ্যমান খেলাপি ঋণের
সংস্কৃতি ও দুর্নীতির বিপরীতে এই ডিজিটাল ব্যাংকগুলো যদি স্বচ্ছতা, দ্রুততা ও নিরাপত্তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে, তবে তা দেশের আর্থিক খাতের সামগ্রিক চরিত্রকেই বদলে দেবে।
লেখক : ব্যাংকার ও সহযোগী অধ্যাপক (খন্ডকালীন), সাউথ ইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা