বিশ্ব জলাতঙ্ক দিবস

১১ বছরে ৬১৬ জনের মৃত্যু, সবাই পথের কুকুরে আক্রান্ত

আপডেট : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:০৮ এএম

কাঁঠালবাগান এলাকার নিজের বাসার সামনে ঘুরছিলেন এক শিশু ও এক তরুণী। তরুণীর নাম আফসানা মিমি (২৩) এবং শিশুটির নাম আরিফা (৪)। আকস্মিক তারা শিকার হন বাড়িওয়ালার কুকুরের কামড়ে। তরুণীর গলা থেকে হাতের কনুই পর্যন্ত বিভিন্ন অংশের মাংস কামড়ে ছিঁড়ে ফেলে কুকুরটি। আর শিশুটির মাথার তালু থেকে গোল করে মাথার অন্তত ৫০ শতাংশ চামড়া কামড়ে তুলে ফেলে। গত ১ জুন বিকেল সাড়ে ৩টার দিকের ঘটনা। পরে তাদের উদ্ধার করে রাজধানীর মহাখালীতে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে টিকা এবং প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর তাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে পাঠানো হয়।

প্রতিদিন কুকুর, বিড়াল বা অন্য প্রাণী দ্বারা আক্রান্ত হয়ে বহু মানুষ চিকিৎসা ও টিকা নিতে আসেন মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে। কেউ আসেন বাসার কুকুর-বিড়ালে আক্রান্ত হয়ে, আবার কেউ আসেন পথ কুকুরের কামড়ে আক্রান্ত হয়ে। চলতি বছর ১৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন ১ লাখ ৭ হাজার ৫৫৮ জন। জলাতঙ্কের টিকা দেওয়া হয়েছে ৬৩ হাজার ৮৯৬ জনকে। এ বছর জলাতঙ্ক নিয়ে ভর্তি হন ৩৫ জন। এরা সবাই কুকুরের কামড়ে-হিচড়ে আক্রান্ত হয়েছেন। গত বছর বিড়ালের দ্বারা আক্রান্ত দুইজনের মৃত্যু হয়েছে এই হাসপাতালে।

এই রোগটি সম্পর্কে সচেতন করতে প্রতি বছর ২৮ সেপ্টেম্বর বিশ্ব জলাতঙ্ক দিবস পালিত হয়। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য, ‘একসঙ্গে আমরা আরও শক্তিশালী’। একটি সহজ সত্যকে তুলে ধরে, আমরা একসঙ্গে কাজ করলেই কেবল জলাতঙ্ক নির্মূল করা সম্ভব। দিবসটি উপলক্ষে সচেতনতামূলক আলোচনা সভার আয়োজন করেছে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, জলাতঙ্ক প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগ, যা টিকায় সেরে যায়। প্রাণী থেকে প্রাণীতে সংক্রমিত হয়। এটি সাধারণত লালার মাধ্যমে কামড় বা আঁচড়ের দ্বারা মানুষ ও প্রাণীর মধ্যে ছড়ায়। জলাতঙ্কের প্রাথমিক লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে জ্বর, ব্যথা এবং ক্ষতস্থানে অস্বাভাবিক বা ব্যাখ্যাতীত খোঁচা বা জ্বালাপোড়া। ভাইরাসটি কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মস্তিষ্ক এবং মেরুদ-ে প্রদাহ বাড়ে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ১৫০টিরও বেশি দেশে জলাতঙ্কের কারণে প্রতি বছর আনুমানিক ৫৯ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়, যার ৯৫ শতাংশই আফ্রিকা ও এশিয়ার। তবে, প্রকৃত ঘটনার সঠিক তথ্য না দেওয়া এবং হিসাবের অনিশ্চয়তার কারণে এ সংখ্যাটি সম্ভবত প্রকৃত সংখ্যার চেয়ে অনেক কম। এ রোগের বোঝা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ওপর পড়ে এবং প্রায় অর্ধেক রোগীই শিশু; যাদের বয়স ১৫ বছরের কম। ৯৯ শতাংশ ক্ষেত্রে কুকুরই মানুষের দেহে জলাতঙ্ক ভাইরাস সংক্রমণের জন্য দায়ী। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের জলাতঙ্কপ্রবণ ৯টি দেশের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ, ভুটান, উত্তর কোরিয়া, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, মিয়ানমার, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও থাইল্যান্ড।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে দেশে জলাতঙ্কে ৮৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। ২০১৬ সালে ৬৬, ২০১৭ সালে ৮০, ২০১৮ সালে ৫৭, ২০১৯ সালে ৫৭, ২০২০ সালে ২৬, ২০২১ সালে ৪০, ২০২২ সালে ৪৫, ২০২৩ সালে ৪৭, ২০২৪ সালে ৫৬ এবং ২০২৫ সালে ৫৯ জনের মৃত্যু হয়। গত ১১ বছরে মৃত্যু হয়েছে ৬১৬ জনের। চলতি বছর এখন পর্যন্ত কতজনের মৃত্যু হয়েছে, তা নিশ্চিত করে জানা যায়নি। এই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় অন্তত ২৮ জনের মৃত্যু হয়েছে।

রাজধানীর মহাখালীতে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এখন একজন জলাতঙ্কের রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। কয়েক দিন আগে একজনকে সিআরপিতে পাঠানো হয়েছে থেরাপি নেওয়ার জন্য। এক মাসের মতো তিনি চিকিৎসাধীন ছিলেন। এক চিকিৎসক বলেন, ‘কিছু রোগী বেঁচে যাচ্ছেন। তবে এই বেঁচে থাকা মিনিংলেস। মরে যাচ্ছে না। কিন্তু অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে বেঁচে থাকতে হচ্ছে।’

সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক এফএ আসমা খান বলেন, ‘বিড়ালের কামড়ে এ বছর ভর্তি হওয়ার রেকর্ড নেই। তারা চিকিৎসা এবং ভ্যাকসিন নিয়ে চলে গেছে। কারও কোনো অসুবিধা হয়নি। যারা মারা গেছেন, সবাই কুকুরের দ্বারা আক্রান্ত। আমি অল্প কিছু দিন হলো দায়িত্ব পেয়েছি। একজন চিকিৎসাধীন আছেন। এ সময়ে চার থেকে পাঁচ শিশু মারা গেছে। আর একজনের এনসেফালোপ্যাথি ডেভেলপ করেছে। কিছু দিন আগে সিআরপিতে এক শিশুকে পাঠানো হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘জলাতঙ্কে শতভাগ মৃত্যু বলা হলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখা গেছে মুখের কাছে, মাথার কাছে যদি কামড় দেয়, তাহলে অনেক সময় রোগী বেঁচে যায়, কিন্তু এনসেফালোপ্যাথি, ডেভেলপ করে, তাহলে হাত পা অবস হয়ে যায়, অজ্ঞান থাকে। অনেক দিন থাকে। তখন তাকে আমরা সিআরপিতে পাঠাই, সিআরপিতে একটু থেরাপি নিলে বেঁচে থাকে, কিন্তু প্রাণ তার ভিতরে থাকে না।’

মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের সিনিয়র কনসালটেন্ট (মেডিসিন) ডা. আরিফুল বাসার বলেন, ‘জলাতঙ্ক প্রাণঘাতী। কেউ বেঁচে থাকলেও তাকে বেঁচে থাকা বলা যায় না। সেজন্য সবচেয়ে ভালো হলো মানুষ যাতে আক্রান্ত না হয়, সে চেষ্টা করা। যদি কুকুর-বিড়ালে কামড় বা আঁচড় দেয়, তাহলে যত তাড়াতাড়ি টিকা দেওয়া যায়, তত ভালো। তা না পারলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে টিকা নেওয়ার চেষ্টা করতে হবে।’

কুকুরের টিকাদান ও জন্মনিয়ন্ত্রণ, কুকুরের কামড় প্রতিরোধ এবং সংস্পর্শে আসার পর সর্বজনীন টিকাদান নিশ্চিত করার মাধ্যমে জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে কুকুরবাহিত জলাতঙ্ক নির্মূল করা সম্ভব। মানুষের জলাতঙ্ক প্রতিরোধের জন্য কার্যকরি টিকা এবং ইমিউনোগ্লোবুলিন রয়েছে। সন্দেহভাজন প্রাণীর সংস্পর্শে আসার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ক্ষতস্থান অবিলম্বে পরিষ্কার করা এবং টিকা গ্রহণ করলে জলাতঙ্কের প্রাদুর্ভাব ও মৃত্যু প্রতিরোধ করা যায়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কুকুর-বিড়ালের কামড়ে বা আঁচড়ে যদি ছিলে-ফেটে-কেটে যায়, রক্ত বের হয় তাহলে সঙ্গে সঙ্গে খারজাতীয় সাবান দিয়ে চলমান পানিতে আধাঘণ্টা ধরে ঘঁষে ঘঁষে স্থানটি ধুয়ে ফেলতে হবে। কোনো সেলাই দেওয়া যাবে না। সবচেয়ে বেশি জরুরি হচ্ছে, মুখ-ঘাড়-মাথার যত কাছে কামড় বা আঁচড় লাগবে, তত তাড়াতাড়ি ভ্যাকসিন দিতে হবে। কারণ খুব তাড়াতাড়ি এই জীবাণু ছড়িয়ে যায়। দ্রুত হাসপাতালে গিয়ে টিকা দিতে হবে।

বিশ্বব্যাপী দেখা গেছে যে, টিকা প্রদানের হার ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বজায় রাখলে জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। ২০১০ সাল থেকে দেশে বেওয়ারিশ কুকুরকে টিকা দেওয়ার কার্যক্রম শুরু হয়। কিন্তু ২০২২ সালের পর থেকে বেওয়ারিশ কুকুরকে টিকা দেওয়ার কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। সম্প্রতি আবার শুরু হয়েছে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিকল্পনা ও মূল্যায়ন কোষ শাখার প্রধান ডা. মো. হাবিবুর রহমান বলেন, ঢাকা শহরে পথ কুকুরের বংশ বৃদ্ধি রোধে ও জলাতঙ্ক প্রতিরোধে টিকা কার্যক্রম শুরু হয়েছে। পর্যায়ক্রমে সারা দেশে এ কার্যক্রম সম্প্রসারিত হবে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত