বিশ্ববিদ্যালয় পড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময়। আর সপ্তম শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষার সময় ধরা পড়ে প্রাণঘাতী ক্যানসার। এক সময় নিয়মিত ক্লাস করাই অসম্ভব হয়ে উঠেছিল। তবে থেমে যাননি মশিউর। ক্যানসারের সঙ্গে লড়াইয়ের পথটা মোটেই সহজ ছিল না। মশিউরের সেই বন্ধুর পথযাত্রার কথা লিখেছেন নিয়ামুর রশিদ শিহাব
শিকড়ের গল্প
পটুয়াখালী জেলার গলাচিপা উপজেলার রতনদী তালতলী ইউনিয়নের সন্তান মশিউর রহমান। বাবা মো. শাহ আলম খলিফা একজন সাধারণ ব্যবসায়ী, মা মরিয়ম বেগম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন সহকারী শিক্ষিকা। দুই বোন এক ভাইয়ের মধ্যে মশিউর সবার ছোট। পরিবারের নেই অঢেল সম্পদ কিংবা বিত্ত-বৈভব। সেই সাধারণ পরিবার থেকেই মশিউর নিজের মেধা, অধ্যবসায় ও অদম্য মানসিক শক্তিকে পুঁজি করে এগিয়ে গেছেন স্বপ্ন পূরণের পথে।
শৈশব থমকে গেল কঠিন বার্তায়
মশিউর রহমান জানান, আমি যখন ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হই, তখন থেকেই আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ার স্বপ্নটা শুরু হয়। আমার চিকিৎসক বা প্রকৌশলী হওয়া কখনোই ইচ্ছা ছিল না, সে কারণে আমার প্রশাসনিক ক্ষেত্রে যাওয়ার একটা প্রবল আগ্রহ ছিল। সেখান থেকেই আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার ইচ্ছাটা জাগ্রত হয়। ২০১৯ সালের শেষের দিকে যখন আমার সপ্তম শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষা চলছিল, তখন হঠাৎ ঠা-া-কাশি শুরু হয়। তবে কাশিটা যখন কমছিল না, তখন ঢাকাতে আসি এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা করি। বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে চিকিৎসক বলেন, তোমার ক্যানসার হয়েছে। বাংলাদেশে চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর পুরোপুরি তখন ভরসা পাই না। কালক্ষেপণ না করে বাবাকে সঙ্গে নিয়ে ভারতের চেন্নাইয়ে অ্যাপোলো হাসপাতালে চলে যাই। সেখানে আবার নতুন করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পরে সেখানেও একই ফলাফলে ক্যানসার ধরা পড়ে। আমাকে জানানো হয় যে, তোমাকে কেমোথেরাপি নিতে হবে।
মাসের পর মাস কেমো
মশিউর বলেন, ২০২০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি চেন্নাইয়ের অ্যাপোলো হাসপাতালে আমার প্রথম কেমো থেরাপি শুরু হয়। সেখানে থেকেই দীর্ঘ ১১ মাস আমার কেমো চলে। একই বছরের ২৮ ডিসেম্বর কেমো শেষ করে আমি বাংলাদেশে ফিরে আসি। বাংলাদেশে ফেরার সময় একটা সিডিউল তৈরি করে দেয়, সেই অনুযায়ী আমার চলতে হতো। পরবর্তী ৩২ মাস ঢাকাতে প্রতি মাসে একটা করে কেমো নিতে হয়। মূল চিকিৎসা চলছিল ঢাকার বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে ক্যানসার বিশেষজ্ঞ ডা. মো. তাওফিকের তত্ত্বাবধানে। আমার বাসা পটুয়াখালীতে হওয়ায়, সেখান থেকে প্রতি মাসে আমার ঢাকা যেতে হতো।
কেমো থেকে পরীক্ষার হল
মশিউর বলেন, পঞ্চম শ্রেণি বৃত্তি পরীক্ষায় আমি জিপিএ-৫ পেয়েছিলাম। ভারতে
থাকার কারণে আমি অষ্টম শ্রেণিতে নিয়মিত না হতে পেরে নবম শ্রেণিতে মানবিক বিভাগেই ভর্তি হই। তবে নবম শ্রেণির প্রথম দিক থেকে নিয়মিত ক্লাস করতে পারতাম না। কেমো নিতে নিয়মিত ঢাকাতে আসা-যাওয়া করা লাগত। এই যাত্রাটা আমার একারই ছিল। এভাবে দীর্ঘ আড়াই বছর কেমো চলাকালীনই আমার এসএসসি পরীক্ষা চলে আসে। ২৮ মে একটা কেমো ছিল, ৩০ মে আমার এসএসসি পরীক্ষা শুরু হয়। পরিবারে
সবার কথা এ বছর এসএসসি পরীক্ষা দেওয়া যাবে না। পরিবারের সবার অবাধ্য হয়েই এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করি এবং পরীক্ষা শেষ করে আবার চেন্নাইয়ে যেতে হয়েছে।
স্বপ্নের পথে অদম্য মশিউর
মশিউর জানান, কেমোর দীর্ঘমেয়াদি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। কেমোথেরাপির সময় হাতের ভেইনগুলো পুড়ে যেত। প্রতিবার কেমোর পর মুখে ঘা হয়ে প্রচ- কষ্ট হতো। ঘায়ের কারণে খাওয়া-দাওয়া প্রায় বন্ধ হয়ে যেত। শরীরজুড়ে অসহ্য ব্যথা ও দুর্বলতা দেখা দিত। একপর্যায়ে হাঁটুর একটি হাড় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চিকিৎসকের পরামর্শে ক্ষতিগ্রস্ত হাড়টি অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে অপসারণ করা হয়। কেমোর সঙ্গে হাঁটুর অস্ত্রোপচারের মতো কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হয়।
থামাননি পড়াশোনা
চেন্নাইতে থাকাকালীন এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল জানতে পান মশিউর। আমি ৪.৩৯ পাই। তখন থেকেই আমার এই জার্নিটাকে একটা পরীক্ষা হিসেবে গ্রহণ করি। দেশে আসার পরে বরিশাল অমৃত লাল দে মহাবিদ্যালয় একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হই। কেমো শেষে হাঁটুর সার্জারি হলো। ডাক্তারের নির্দেশ ছিল, কোনোভাবেই অনিয়ম করা যাবে না। তুমি রাত জাগতে পারবে না, একটানা অনেকক্ষণ বসে পড়াশোনাও করবে না। এসব ধরাবাঁধা নিয়মের বেড়াজালে আটকা থাকায়, একাদশ শ্রেণির প্রথম থেকেই একটু একটু করে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে থাকি। তবে নিজের শারীরিক অবস্থার কারণে দীর্ঘদিন এটা চলমান রাখতে পারি না। তারপরও হাজারো বাধা সত্ত্বেও এইচএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করি এবং আল্লাহ আমাকে উত্তম ফল দান করেন। আমি জিপিএ-৫ অর্জন করি।
সংশয় পেরিয়ে সাফল্য
মশিউর জানান, ভর্তি পরীক্ষার সময় অনেকটাই হতাশা কাজ করত, এত শিক্ষার্থীর ভিড়ে আমার পড়াশোনার এত এত গ্যাপ থাকার পরও আমি আদৌ কোথাও চান্স পাব কিনা? আল্লাহর ওপর অগাধ বিশ্বাস রেখে আমি পরিশ্রম চালিয়ে যাই এবং আল্লাহ আমাকে উত্তম ফল দান করেন। আমি একসঙ্গে বাংলাদেশের চারটা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় জাহাঙ্গীরনগর, জগন্নাথ, রাজশাহী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির সুযোগ পাই। প্রথমে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সমাজকর্মে ভর্তি হয়েছিলাম, পরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় নৃবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়েছি।
ত্যাগ, সাহস আর স্বপ্নজয়ের গল্প
মশিউরের এই সাফল্যে আবেগ আল্পুত তার বাবা-মা। দীর্ঘ চিকিৎসার অর্থ জোগানো এবং মানসিকভাবে ছেলেকে আগলে রাখার যে ত্যাগ তারা স্বীকার করেছেন, ছেলের এই সাফল্যে তা সার্থক হয়েছে বলে মনে করেন তারা। মশিউরের চিকিৎসক ডা. তাওফিক মশিউরের এই মানসিক দৃঢ়তার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।
ভবিষ্যৎ স্বপ্ন
উচ্চশিক্ষা শেষ করে মশিউর সামাজিক বা আর্থিক সংকটে থাকা অসুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়াতে চান বলে নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানান। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে দেখা স্বপ্ন আজ বাস্তবে রূপ নেওয়ার মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেছেন, ইচ্ছাশক্তি ও পরিবারের সমর্থন থাকলে যেকোনো পাহাড়সম বাধাই জয় করা সম্ভব।