শিক্ষাজীবন আর পেশাজীবন এক নয়। পেশাজীবনে সফল হতে হলে প্রয়োজন সঠিক কৌশল, ক্রমাগত দক্ষতা উন্নয়ন ও গ্রোথ মাইন্ডসেট। ক্যারিয়ারে ধারাবাহিক উন্নতির জন্য অনুসরণীয় কৌশলগুলো নিয়ে লিখেছেন মুহাম্মদ শফিকুর রহমান
সময় ব্যবস্থাপনা শিখুন
সব কাজ সমান গুরুত্বপূর্ণ নয়। কোন কাজটি আগে করতে হবে, কোনটি পরে করা যাবে এবং কোন কাজটি কোম্পানির জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ এটি বুঝতে হবে। দিনের শুরুতে কাজের অগ্রাধিকার ঠিক করুন। গুরুত্বপূর্ণ কাজ আগে শেষ করুন। ডেডলাইনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন না। ব্যস্ত থাকা আর উৎপাদনশীল হওয়া এক বিষয় নয়।
কাজ করার আগে কাজটি বুঝুন
কাজ হাতে পেয়েই শুরু করে দেবেন না। আগে বুঝুন, কাজটির উদ্দেশ্য কী? কার জন্য তৈরি হচ্ছে? এর ফলাফল কী হওয়া উচিত? সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ম্যানেজমেন্ট আসলে কী দেখতে চায় তা বোঝা। ধরুন, চেয়ারম্যান স্যার কোনো রিপোর্ট শতাংশের হিসেবে দেখতে পছন্দ করেন। তাহলে তাকে এমনভাবে রিপোর্ট দিন, যাতে প্রয়োজনীয় তথ্য শতাংশে পরিষ্কারভাবে বোঝা যায়। ম্যানেজমেন্ট মিটিংয়ে শুধু উপস্থিত থাকবেন না; তারা কীভাবে রিপোর্ট দেখছেন, কী ধরনের প্রশ্ন করছেন, কোন তথ্যকে গুরুত্ব দিচ্ছেন সেগুলো নোট করুন। ম্যানেজমেন্টের চিন্তার ধরন বুঝতে পারা একজন কর্মীর বড় দক্ষতা।
Commitment ভাঙবেন না কাউকে কোনো কাজ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলে চেষ্টা করুন সময়ের মধ্যেই দিতে। কাজে সমস্যা হলে আগেই জানান। শেষ মুহূর্তে নীরব থাকার চেয়ে সময়মতো সমস্যার কথা জানানো অনেক বেশি পেশাদার আচরণ। মনে রাখবেন, ম্যানেজমেন্ট শেষ পর্যন্ত আপনার কাছ থেকে ফলাফল চায়। আপনি সারা দিন কাজ করলেন, কিন্তু ফলাফল এলো না তাহলে সেই কাজের মূল্য অনেকটাই কমে যায়।
ব্যর্থতা থেকে শিখুন
কোনো কাজ ব্যর্থ হলে প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত নয় ‘দোষ কার?’
প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত ‘কেন ব্যর্থ হলো?’ কোথায় ভুল হয়েছে, কীভাবে ঠিক করা যেত এবং ভবিষ্যতে একই ভুল কীভাবে এড়ানো যায় সেটি বিশ্লেষণ করুন। ভুল থেকে শিক্ষা নিতে পারলে ব্যর্থতাও ক্যারিয়ারের সম্পদ হয়ে যায়।
নৈতিকতার সঙ্গে আপস করবেন না
দ্রুত উন্নতির জন্য ভুল তথ্য দেওয়া, হিসাব গোপন করা, অন্যের কাজ নিজের নামে চালিয়ে দেওয়া কিংবা ম্যানেজমেন্টকে ভুল তথ্য দেওয়া হয়তো সাময়িক সুবিধা দিতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি আপনার ক্যারিয়ারের ক্ষতি করবে। আপনার সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো বিশ্বাসযোগ্যতা।
কর্মপরিবেশ সুন্দর রাখায় গুরুত্ব দিন
অফিসের ডেস্ক পরিচ্ছন্ন রাখুন। অপ্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমিয়ে রাখবেন না। সম্ভব হলে একটি ছোট গাছ রাখতে পারেন।
ডেস্কে বসে নিয়মিত চা বা খাবার খাওয়ার অভ্যাস এড়িয়ে চলুন। সুন্দর ও গোছানো কর্মপরিবেশ মনকে সতেজ রাখতে সহায়ক হতে পারে। দীর্ঘ সময় বসে কাজ করলে মাঝেমধ্যে বিরতি নিন। কিছুক্ষণ হাঁটুন, দূরে তাকান এবং শরীরকে নড়াচড়া করার সুযোগ দিন। আপনি প্রতিদিন যে চেয়ারে দীর্ঘ সময় বসেন, সেটি আরামদায়ক ও কাজের উপযোগী কিনা, সেটিও খেয়াল করুন।
প্রতি মাসে নিজেকে মূল্যায়ন করুন
প্রতি মাস শেষে অন্তত একবার নিজের সঙ্গে বসুন। ভাবুন কী করেছেন? কী করতে পারেননি? কোথায় সময় নষ্ট হয়েছে? কোন কাজ আরও ভালো করা যেত? আগামী মাসে কী পরিবর্তন করবেন? নিজের জন্য একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য ঠিক করুন ছয় মাস বা এক বছর পর নিজেকে কোথায় দেখতে চান। তারপর সেই লক্ষ্য অনুযায়ী কাজ করুন।
সমালোচনা ও চাপকে স্বাভাবিকভাবে নিন
বস বকা দেবেন। কেউ আপনার বিরুদ্ধে অহেতুক সমালোচনা করবে। কখনো আপনার কাজের মূল্যায়ন প্রত্যাশামতো হবে না। করপোরেট জীবনে এসব অস্বাভাবিক নয়। সবকিছু মনে নিয়ে বসে থাকলে আপনারই ক্ষতি। বরং ভাবুন কীভাবে পরেরবার আরও ভালো করা যায়।
নিজের মূল্যায়ন না হলে সিদ্ধান্ত নিন
আপনি যদি মনে করেন ভালো কাজ করছেন, নিয়মিত নতুন দায়িত্ব নিচ্ছেন, ফলাফল দিচ্ছেন তারপরও দীর্ঘদিন ধরে আপনার কাজের সঠিক মূল্যায়ন হচ্ছে না, তাহলে পরিস্থিতি বাস্তবভাবে মূল্যায়ন করুন। প্রয়োজনে অন্য প্রতিষ্ঠানে সুযোগ খুঁজুন। ক্যারিয়ার থেমে থাকে না। বয়সও থেমে থাকে না। তাই নিজের সময়, দক্ষতা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে সময়মতো সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি। তবে চাকরি ছাড়ার আগে আবেগ নয়, তথ্য ও বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করুন।
ভেঙে পড়বেন না
পথ যত কঠিনই হোক, বাধা আসবেই। কিন্তু বাধা এলে থেমে গেলে চলবে না। প্রয়োজন হলে কৌশল পরিবর্তন করুন, নতুন পথ খুঁজুন এবং আবার শুরু করুন।
মনে রাখবেন, ক্যারিয়ারে বড় পরিবর্তন সাধারণত এক দিনে আসে না। প্রতিদিনের ছোট ছোট উন্নতিই একসময় বড় সাফল্যে পরিণত হয়।
শেষ কথা
সফল হওয়ার জন্য শুধু ভাগ্যের ওপর নির্ভর করলে হবে না। নিজের মধ্যে সফল হওয়ার ক্ষুধা তৈরি করতে হবে। প্রতিদিন নিজেকে একটু একটু করে উন্নত করতে হবে। নতুন কিছু শিখতে হবে। কাজের মালিকানা নিতে হবে। প্রযুক্তিকে কাজে লাগাতে হবে। ডেটা বুঝতে হবে। ম্যানেজমেন্টের চিন্তাধারা বুঝতে হবে। নিজের কাজের ফলাফল দৃশ্যমান করতে হবে।
আপনি আজ যেখানে আছেন, সেটিই আপনার শেষ ঠিকানা নয়। আপনি আগামী দিনে কোথায় পৌঁছাবেন, তার বড় একটি অংশ নির্ভর করছে আজ আপনি নিজেকে কতটা উন্নত করার চেষ্টা করছেন তার ওপর।
লেখক : ফিচার লেখক, অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার, সেলস অপারেশন, ফেয়ার ইলেকট্রনিক্স লিমিটেড