রাবি শিক্ষককে হুমকি

শ্বাপদদের চারণভূমি যেন না হয়

আপডেট : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:১৭ এএম

জননিরাপত্তার বিষয়ে যখন উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার পারদ ঊর্ধ্বমুখী তখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের অধ্যাপক ড. শাহরিয়ার হোসেনের (শাবিন শাহরিয়ার) কাছে ফোন করে জেলে থাকা কর্মীদের জামিনের খরচ চেয়ে চাপ সৃষ্টির অভিযোগ উৎকণ্ঠা আরও বাড়িয়েছে। ২৮ সেপ্টেম্বর দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এর আগে একাধিক শিক্ষকের কাছে ‘সর্বহারা’ পরিচয়ে টেলিফোন করে প্রাণনাশের হুমকি ও বিপুল অঙ্কের চাঁদা দাবি করা হয়। আমরা জানি, কয়েকদিন আগে দিনাজপুরের হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক  ড. মো. আবু সাঈদকেও একই পরিচয়ে ফোনে চাঁদা দাবি করে হুমকি দেওয়া হয়। ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ড. শাহরিয়ার পুলিশ সাইবার ক্রাইম বিভাগের সহায়তা নিলে কলটি মাদারীপুর থেকে করা হয়েছে বলে শনাক্ত হয়। ৫ মিনিট ৪২ সেকেন্ড দৈর্ঘ্যরে ফোনকল রেকর্ডটি দেশ রূপান্তরের হাতে এসেছে। এতে সর্বহারা নামধারী হুমকিদাতাদের যে ভাষ্য মিলেছে তা আমাদের উদ্বিগ্ন না করে পারে না। 

হুমকিদাতার বক্তব্য ও পুলিশের ভাষ্য সংগতই কিছু প্রশ্ন সামনে এনেছে। ড. শাহরিয়ারকে উদ্ধৃত করে সামাজিক মাধ্যমে অনেকেই পোস্ট দিয়ে যা জানিয়েছেন তা প্রীতিকর নয় বলেই আমরা মনে করি। পুলিশের ভাষ্য, এরা আসলে ‘সর্বহারা’ না। ‘সর্বহারা’ নাম ভাঙিয়ে এরা ‘চাঁদাবাজি’ করে। পুলিশ ড. শাহরিয়ারকে নাকি বলেছে, এদের ধরলেও ‘শাস্তির বিধান’ ‘লঘু’র কারণে অল্পদিনের মধ্যেই ওরা বের হয়ে এসে আবারও একই কাজ শুরু করে। আমরা জানি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর দায়িত্বশীল অনেকেরই বহু ক্ষেত্রে গুরুতর বিষয়ও ‘লঘু’ করে দেখার অপপ্রবণতা রয়েছে। আবার অনেকে এই দৃষ্টিকোণ থেকেই গুরুতর অভিযোগও নানা কায়দা-কৌশলে ‘লঘু’ করে প্রতিবেদন দাখিল করেন এমন অভিযোগও আছে বিস্তর। আমাদের  প্রশ্ন পুলিশ আগেই কী করে নিশ্চিত হলো, হুমকিদাতা ‘সর্বহারা’ নয়, ‘চাঁদাবাজ’? যদি পুলিশের ভাষ্য আমরা মেনেও নিই তাহলে পাল্টা প্রশ্ন দাঁড়ায়, চাঁদাবাজদের বাড়বাড়ন্ত ঠেকাবার দায়দায়িত্ব কার? চাঁদাবাজ-তোলাবাজদের আস্ফালনও তো নতুন কিছু নয়। এসব ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের পরও অনেক ভোক্তভুগিই কোনো প্রতিবিধান পাননি, এমন নজিরও তো কম নেই।

কোনো প্রভাবশালী, ক্ষমতাশালী বা যার সঙ্গে পেরে ওঠা কঠিন এমনদের এলাকায় থেকে তাদের সঙ্গে বিরোধিতা করা বোকামির নামান্তর, এমন মন্তব্য আমাদের সমাজে প্রচলিত হয়ে পড়ার প্রেক্ষাপটও অনেক বিস্তৃত। সাধারণ কিংবা শান্তিপ্রিয়দের তিক্ত অভিজ্ঞতায় তা খুব পুষ্ট যে, কথিত প্রতাপশালীদের আবার ‘বিগ ব্রাদার’ কিংবা ‘বটবৃক্ষসম পিতা’ থাকে এবং প্রশাসনের অসাধুদের সঙ্গে বিরাজ করে ওদের অদৃশ্য সখ্য। উভয়ের আশীর্বাদে কিংবা অনুকম্পায় দুর্বৃত্তরা হয়ে ওঠে বেপরোয়া। অস্বীকার করার অবকাশ নেই, দেশের বিভিন্ন স্থানে নিরাপত্তাব্যবস্থা নাজুক হয়ে পড়েছে। বিদ্যমান পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে শান্তিপ্রিয়দের সামনে এর সমান্তরালে দাঁড়িয়েছে ‘জলে কুমির ডাঙায় বাঘ’ প্রবাদটিও। দেশের বিদ্যমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সরকারের জন্যও অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠেছে এবং এই নিরিখে আমাদের আরও প্রশ্ন, দুর্বৃত্তদের শেকড় সন্ধানের বিষয়টি যদি অগ্রগণ্য হয়ে থাকে তাহলে ওদের এত আস্ফালন চলে কীভাবে? বিদ্যমান পরিস্থিতিতে জনমনে স্বস্তি বোধের কাক্সিক্ষত দৃশ্যমান প্রতিবিধানের ঘাটতিতে আমরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলোর, বিশেষ করে পুলিশের জবাবদিহি-দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার জোর তাগিদ দিই।

রাজধানীসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ শহরের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে হামলা-ভাঙচুরসহ অপহরণ, খুনখারাবি ও ছিনতাইয়ের মতো ঘটনা সাধারণ মানুষের মধ্যে যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করেছে এর নিরসনে আমরা ত্বরিত যথাযথ ব্যবস্থার প্রতিফলন দেখতে চাই। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুলিশের চেইন অব কমান্ডে শিথিলতা দেখা যাচ্ছে, আইনি ব্যবস্থা গ্রহণে এক ধরনের দ্বিধাবোধ বা বিলম্বের কারণে অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে, যা জনমনে উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে এই অভিযোগগুলো তুড়ি মেরে উড়িয়ে না দিয়ে গভীর অনুসন্ধানের ওপরও আমরা গুরুত্বারোপ করি। রাবির অধ্যাপক ড. শাহরিয়ার হোসেনের ঘটনাসহ প্রতিটি ঘটনার দৃষ্টান্তযোগ্য আইনানুগ ব্যবস্থার পাশাপাশি দুর্বৃত্তরা আস্কারা পায় এমন যেকোনো বক্তব্য প্রদানে দায়িত্বশীলদের অধিকতর সতর্ক-সজাগ থাকার বিষয়টিও সমগুরুত্বে আমলে নেওয়া জরুরি বলে মনে করি। এই জনপদ যেন দুর্বৃত্তদের চারণভূমি না হয়, তা নিশ্চিত করার দায় সরকারেরই।  

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত