কিশোর গ্যাংয়ের উত্থান

উৎসে নজর দিন, পৃষ্ঠপোষকদের ছাঁটুন

আপডেট : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২২ এএম

কৈশোর হলো সেই সময়, যখন উচ্চতর এবং আরও সম্পূর্ণ মানবীয় গুণাবলি জন্ম নেয়। কিশোরদের নিয়ে এমন উচ্চাশা বহুক্ষেত্রে বহুভাবে বহুবার উচ্চারিত হয়েছে, হচ্ছে। কিন্তু ভবিষ্যৎকেন্দ্রিক এই উচ্চাশা উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা আর বিবর্ণতার ছায়ায় ঢাকা পড়ছে আমাদের সমাজ। এ কি স্বপ্নের অপমৃত্য? কী কারণে, কীভাবে এই ক্ষয়ের স্রোত প্রবল থেকে প্রবলতর হয়ে উঠছে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ২৯ সেপ্টেম্বর উঠে এসেছে দেশ রূপান্তরের বিশেষ প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়েছে, কীভাবে প্রজন্মের একাংশের মাথা কাদের আশীর্বাদের হাত স্পর্শিত! ‘বিগ ব্রাদার’ কিংবা সর্বনাশের হোতা তথাকথিত নেতারা ‘বট বৃক্ষসম পিতা’র পরিচয়ে দুঃখজনক হলেও খণ্ডিতভাবে পরিচিত বৃহদাংশের কাছে। ওই প্রতিবেদনের শুরুতেই বলা হয়েছে, কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা এখন আর শুধু পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, মারামারির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। ছিনতাই, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, মাদক কারবারসহ স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাব বিস্তারেও কিশোরদের ব্যবহার করা হচ্ছে। তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করছেন শাসক দলের কতিপয় নেতা! আরও বলা হয়েছে, সম্প্রতি আলোচিত কিছু হামলা ও দখলবাজির ঘটনায় কিশোর গ্যাংয়েরও সম্পৃক্ততার তথ্য উঠে এসেছে গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে। রাজনৈতিক নেতাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে থাকার কারণে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে। এমনকি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও নেতাদের অপকর্ম এড়িয়ে যান বলে অভিযোগ রয়েছে। কী উদ্বেগজনক বার্তা!

প্রতিবেদনটির গর্ভে আরও যা রয়েছে তা জিজ্ঞাসার পরিসর ব্যাপ্ত তো করেছেই, পাশাপাশি জিজ্ঞাস্য হয়ে ওঠে, জাতিবিনাশী আত্মঘাতী এই কর্মকা-ে যারা যুক্ত তাদের সমীকরণ কতটা বহুমাত্রিক? উত্তর প্রীতিকর নয়। আমরা দেখেছি,  সাম্প্রতিক ঘটে যাওয়া খুনখারাবিসহ সমাজবিরোধী কর্মকা-ে সম্পৃক্ততা রয়েছে কিশোরদের। অতীতেও এমন নজির আছে বটে, কিন্তু দুর্ভাবনা হলো, এর পরিসর এত ব্যাপ্ত ছিল না। এই দুর্ভাবনাকে আরও গভীর করেছে দেশ রূপান্তরের বিশেষ প্রতিবেদনের বার্তা। বিশ্লেষণে দেখা যায়, পরিবর্তনের অঙ্গীকারে মাত্র দুবছর আগে যে প্রতিবাদ-প্রতিরোধের ঢেউ ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে রূপ নিয়ে সরকারের পতন ঘটিয়ে নতুন পথের সন্ধান দিয়েছিল, অশুভর গাঢ় ছায়া ফের প্রলম্বিত হলো অবক্ষয়িত এই সমাজে কতিপয়ের হীনস্বার্থের সমীকরণে! যারা দেশের-সমাজের ভবিষ্যৎ, তাদের একটা অংশকে দিয়ে কে বা কারা অপকর্ম করাচ্ছে এরও উল্লেখ রয়েছে ওই প্রতিবেদনেই। এদের প্রভাব এবং চাঁদাবাজি-দখলবাজির সঙ্গে কাদের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা রয়েছে, তাও বলা হয়েছে ওই প্রতিবেদনে। এই বার্তা দেশ-জাতির জন্য কী ভয়ংকর, এরও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ নতুন করে নিষ্প্রয়োজন।

যে সমাজ অবক্ষয়ের ঢেউয়ে উথাল-পাতাল, যে সমাজে অশিক্ষা-কুশিক্ষার প্রভাবে জীবনের একাংশ ক্ষয়ে ক্ষয়ে ধুঁকছে, নৈতিক ও সামাজিকভাবে চরম অবক্ষয়ের মুখোমুখি ও কর্মহীনতার অভিশাপে-কষাঘাতে দিগি¦দিক; তাদের কাছে জীবন মূল্যহীন। তারা অপশক্তির হাতিয়ার হয়ে একদিকে নিজেদের আরও ধ্বংসের গহ্বরে নিপতিত করছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জীবন বিপন্ন করার বিনাশীকাণ্ডে লিপ্ত হচ্ছে লোভের আগ্রাসনে! প্রজন্মের একাংশের জীবন বলবানদের বিপথে যাচ্ছে, বিকাশ ও মুক্তির দরজা রুদ্ধ করে। এ থেকে নিষ্কৃতির পথ বের করতেই হবে। আমরা মনে করি, সর্বাগ্রে এর উৎসে নজর দেওয়া জরুরি।

অনাচারী নেতাদের কদর্য হাতগুলো শনাক্ত করা চাই আগে। বিষবৃক্ষের মূলোৎপাটন না করে ডালপালা ছেঁটে কোনো সুফল মিলবে না। আমরা স্পষ্টতই মনে করি, রাজনীতির নীতিনির্ধারকদের ক্ষয়ের প্রতিরোধে মনোযোগ গভীর করা অতি জরুরি। আমরা বিশ্বাস করি, রাজনীতি যদি অনাচার-দুরাচার-কদাচারের ছায়ামুক্ত হয়ে প্রকৃতই জনকল্যাণের মাধ্যমরূপে ফিরে এবং অর্জন করে তার হৃতশ্রী, তাহলে অবক্ষয়ের পথ স্বাভাবিকভাবেই রুদ্ধ হবে। বন্ধ করতে হবে রাজনীতির নামে ‘সাপ লুডু’ খেলাও । রাজনৈতিক দুর্বৃত্তদের ধরার সরকারের নির্দেশ যদি যথাযথভাবে কার্যকর না হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে জবাবদিহির মুখোমুখি করতে হবে। শুধু ঢাকায় ১২৯টি কিশোর গ্যাং গ্রুপ ও  গ্রুপের সদস্য সংখ্যা ১ হাজার ২২৯ জনের অস্তিত্বের বার্তাটিও স্পষ্ট করে দেয়, কোন পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে পরিস্থিতি। আমরা মনে করি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো যূথবদ্ধভাবে মূলহোতাদের শিকড় উৎপাটনে নির্মোহ ও অর্গলমুক্ত পদক্ষেপ নিলে সুফল দৃশ্যমান হতে বাধ্য। দরকার শুধু রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সরকারের নির্মোহ অবস্থান ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলোর দায়বদ্ধতা-জবাবদিহি।   

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত