চাই দূরদর্শী পরিকল্পনা ও অগ্রাধিকার

আপডেট : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২৬ এএম

বিশে^র যেসব দেশ আজ উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে, তাদের প্রায় সবাই একসময় শিক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও জ্ঞানচর্চার ওপর ধারাবাহিকভাবে বিনিয়োগ করেছে। কিন্তু বাংলাদেশে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ এবং বাস্তব ব্যয়ের হিসাব বিশ্লেষণ করলে প্রায়ই এমন একটি চিত্র সামনে আসে, যা অনেক ক্ষেত্রে শুভঙ্করের ফাঁকির মতো মনে হয়। কাগজে-কলমে শিক্ষায় বিনিয়োগের যে পরিমাণ দেখানো হয়, বাস্তবে তার একটি বড় অংশ সরাসরি শিক্ষা কার্যক্রম, শিক্ষক বা শিক্ষার্থীর কল্যাণে ব্যয় হয় না। ফলে প্রশ্ন জাগে, শিক্ষার নামে বরাদ্দকৃত অর্থ আসলেই কতটুকু শিক্ষার জন্য ব্যয় হচ্ছে? বাংলাদেশে শিক্ষা বাজেট নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই একটি বিতর্ক বিদ্যমান। আন্তর্জাতিকভাবে শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ পরিমাপের ক্ষেত্রে সাধারণত জাতীয় আয়ের (জিডিপি) একটি নির্দিষ্ট অংশ এবং মোট বাজেটের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ শিক্ষায় ব্যয় করার কথা বলা হয়। কিন্তু বাংলাদেশে প্রায়ই এমন কিছু ব্যয় শিক্ষা খাতের আওতায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়, যা সরাসরি শিক্ষার উন্নয়নের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়।

বাজেটে ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’র এই প্রবণতা নতুন নয়। উন্নয়ন অর্থনীতিতে একে কখনো কখনো বাজেট-ভ্রম (বাজেটারি ইল্যুশন) বলা হয়। অর্থাৎ এমনভাবে হিসাব উপস্থাপন করা হয়, যাতে প্রকৃত চিত্রের তুলনায় বিনিয়োগের পরিমাণ বেশি বলে প্রতীয়মান হয়। এতে আন্তর্জাতিক মহল কিংবা জনসাধারণকে  একটি ইতিবাচক বার্তা দেওয়া সম্ভব হলেও শিক্ষাব্যবস্থার মূল সমস্যাগুলো অমীমাংসিত থেকে যায়। কারণ শিক্ষাব্যবস্থার প্রাণ হলো শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং পাঠদান-শিখন প্রক্রিয়া; ভবন, প্রকল্প বা প্রশাসনিক কাঠামো নয়। বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের শিক্ষা খাতে ব্যয়ের একটি বড় অংশ এমন সব প্রকল্পে ব্যয় করা হয়, যেখান থেকে দৃশ্যমান অবকাঠামো তৈরি করা সম্ভব এবং প্রকল্পভিত্তিক অর্থ ব্যয়ের সুযোগ বেশি থাকে। নতুন ভবন নির্মাণ, সীমানা প্রাচীর, প্রশাসনিক কমপ্লেক্স, নানা ধরনের যন্ত্রপাতি ক্রয় কিংবা স্বল্পমেয়াদি প্রকল্পভিত্তিক কর্মকাণ্ডে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়। অথচ শিক্ষক প্রশিক্ষণ, গবেষণা, শিক্ষার্থীদের পুষ্টি, মানসিক স্বাস্থ্য, শিক্ষা উপকরণ, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি কিংবা শিক্ষকদের জীবনমান উন্নয়নের মতো মৌলিক বিষয়গুলো প্রায়ই উপেক্ষিত থাকে।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচি সংস্কারের নামে বারবার বিপুল অর্থ ব্যয়ের প্রবণতা। একটি জাতির শিক্ষাব্যবস্থা সময়ের প্রয়োজনে পরিবর্তিত হবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু যখন পাঠ্যক্রম পরিবর্তন একটি ধারাবাহিক গবেষণাভিত্তিক প্রক্রিয়ার পরিবর্তে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রকল্পে পরিণত হয়, তখন তা জ্ঞান উন্নয়নের পরিবর্তে অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। নতুন পাঠ্যবই প্রণয়ন, প্রশিক্ষণ, কর্মশালা, সেমিনার, পরামর্শক নিয়োগ এবং সংশ্লিষ্ট আনুষঙ্গিক কর্মকাণ্ডে কোটি কোটি টাকা হরিলুটের মাধ্যমে ব্যয় করা হয়। কয়েক বছর পর আবার নতুন সংস্কারের নামে একই প্রক্রিয়া পুনরাবৃত্তি হয়। ফলে শিক্ষার গুণগত মানে কাক্সিক্ষত পরিবর্তন না এলেও প্রকল্পনির্ভর অর্থনীতির চাকা সচল থাকে। অতীতের দার্শনিক ও শিক্ষাতাত্ত্বিকদের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো, শিক্ষাব্যবস্থার সাফল্য নির্ভর করে শিক্ষকের পেশাগত দক্ষতার এবং শিক্ষার্থীর শেখার অভিজ্ঞতা ওপর; প্রশাসনিক ব্যয়ের ওপর নয়। একই কথা আধুনিক শিক্ষা গবেষণাও প্রমাণ করেছে। যেসব দেশে শিক্ষাব্যবস্থার মান উন্নত হয়েছে, সেখানে শিক্ষককে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শিক্ষককে কেবল কর্মচারী নয়, জ্ঞান উৎপাদন ও মানবসম্পদ উন্নয়নের কেন্দ্রীয় শক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের শেখার পরিবেশ, পুষ্টি, স্বাস্থ্যসেবা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে; বিশেষ করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে। বাংলাদেশেও যদি শিক্ষার প্রকৃত উন্নয়ন কাম্য হয়, তাহলে বরাদ্দের সিংহভাগ সরাসরি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ওপর ব্যয় করতে হবে। শিক্ষকদের জন্য প্রতিযোগিতামূলক বেতন, উচ্চমানের প্রশিক্ষণ, গবেষণা অনুদান, আবাসন সুবিধা এবং পেশাগত উন্নয়নের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা সরাসরি পৌঁছে দিতে হবে। কারণ শিক্ষার মূল অংশীজন শিক্ষক ও শিক্ষার্থী; তাদের বাদ দিয়ে শিক্ষার উন্নয়ন সম্ভব নয়।

ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থার যুগে এ ধরনের সহায়তা প্রদানে অতিরিক্ত আমলাতান্ত্রিক জটিলতার প্রয়োজন নেই। কিন্তু বাস্তবে প্রায়ই দেখা যায়, সরাসরি সহায়তার পরিবর্তে মধ্যস্বত্বভোগী-নির্ভর প্রকল্প কাঠামোকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। কারণ সরাসরি সহায়তা ব্যবস্থায় প্রকল্প ব্যয়ের সুযোগ সীমিত থাকে, কিন্তু জটিল প্রশাসনিক কাঠামো ও প্রকল্পভিত্তিক ব্যবস্থায় বিভিন্ন স্তরে অর্থ অপচয়, অদক্ষতা কিংবা দুর্নীতির ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। অর্থনীতিবিদদের ভাষায় একে ‘মধ্যস্বত্ব’ বা ‘হাতিয়ে নেওয়া’ (রেন্ট-সিকিং) বলা হয়, যেখানে জনকল্যাণের পরিবর্তে বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থ অগ্রাধিকার পায়। বাংলাদেশকে একসময় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলে অবজ্ঞা করা হয়েছিল। সেই অভিধা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য দেশটি দীর্ঘ পথ অতিক্রম করেছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে যদি স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং কার্যকারিতা নিশ্চিত না করা যায়, তাহলে সেই পুরনো উপমার নতুন সংস্করণ যেন আবারও ফিরে আসে। শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার কেবল নতুন প্রকল্প গ্রহণের মাধ্যমে সম্ভব নয়; প্রয়োজন রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, নৈতিক দায়বদ্ধতা এবং বাস্তবমুখী অগ্রাধিকার নির্ধারণ। সরকার যদি সত্যিই শিক্ষার উন্নয়ন চায়, তাহলে প্রথমেই শিক্ষা খাতের ব্যয়ের প্রকৃত হিসাব জনগণের সামনে স্বচ্ছভাবে উপস্থাপন করতে হবে। কোন অর্থ সরাসরি শিক্ষার জন্য ব্যয় হচ্ছে এবং কোন অর্থ অন্য খাতের ব্যয় হিসেবে শিক্ষা বাজেটে যুক্ত করা হচ্ছে, তা স্পষ্ট করতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অধিকতর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তারা নিজেদের প্রয়োজন ও অগ্রাধিকার নির্ধারণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন। শিক্ষার উন্নয়ন ভবন নির্মাণের প্রতিযোগিতায় নয়, বরং শ্রেণিকক্ষের ভেতরে ঘটে।

লেখক : ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য।

[email protected]

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত