ভ্রমণপ্রিয় বাঙালির একটা প্রচলিত কথা হলো ‘উঠল বাই তো কটক যাই’। কথাটা শুনলেই মনে হয়, কোনো প্ল্যান নেই, হঠাৎ ব্যাগ কাঁধে, চলো বেরিয়ে পড়ি। একদম জেন-জি ভাইব। আজকের ভাষায় বললে, নো ওভারথিংক, জাস্ট গো। কিন্তু বাংলাদেশে এই হঠাৎ বেরিয়ে পড়ার সাহসটাই অনেক সময় আটকে যায়। রাস্তার চিন্তা। নিরাপত্তার চিন্তা। থাকার জায়গার চিন্তা। অথচ যে দেশে পাহাড়, সমুদ্র, হাওর, বন আর নদী একসঙ্গে আছে, সেখানে ভ্রমণ এত কঠিন লাগার কথা নয়। এখানেই আমাদের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। সম্ভাবনা আছে। কিন্তু সম্ভাবনার পথটা এখনো পুরোপুরি খুলে যায়নি। দার্শনিক ও ভ্রামণিক রাহুল সাংকৃত্যায়ন বলেছিলেন, পৃথিবীই মানুষের সবচেয়ে বড় পাঠশালা। পথেই জ্ঞান। পথেই মানুষকে চেনা যায়। সত্যজিৎ রায়ের আগন্তুক ছবির মামা বা ছোটদাদু চরিত্রে মনমোহন মিত্রও একই কথা বলেন। তিনি ঘর ছেড়েছিলেন পৃথিবীকে জানার জন্য। তার কাছে ভ্রমণ ছিল না বিলাসিতা। ছিল সভ্যতাকে বোঝার উপায়। এই দুই ভ্রমণদর্শনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের দিকে তাকালে এক ধরনের আক্ষেপ জাগে। প্রকৃতি আমাদের দিয়েছে অনেক কিছু। কিন্তু আমরা এখনো সেই সম্ভাবনাকে পুরোপুরি চিনতে পারিনি।
আমি ভ্রমণ ভালোবাসি। ছাত্রজীবনে ষোল বছর আগে পড়াশোনার সূত্রে সুইডেন গিয়েছিলাম। ভ্রমণ করেছি নরওয়ে আর ডেনমার্ক। পরে ভারতের এক ডজনেরও বেশি রাজ্য ঘুরেছি। মালয়েশিয়াও দেখেছি। প্রতিটি দেশ আমাকে একটি কথা শিখিয়েছে। পর্যটন শুধু পাহাড়, সমুদ্র বা বন নয়। পর্যটন আসলে মানুষের আচরণ। পরিকল্পনা। নিরাপত্তা। আর একটি দেশের আত্মপরিচয়। বাংলাদেশে পর্যটনের উপকরণ কম নয়। কক্সবাজার আছে। সুন্দরবন আছে। সিলেটের চা বাগান আছে। বান্দরবানের পাহাড় আছে। নেত্রকোনার হাওর আছে। সোনাদিয়া আছে। চর আছে। নদী আছে। ঐতিহ্য আছে। তবু আমরা বারবার পিছিয়ে পড়ি। সবচেয়ে বড় সমস্যা নিরাপত্তার ধারণা। একজন পর্যটক প্রথমেই জানতে চান, আমি কি নিশ্চিন্তে ঘুরতে পারব? অনেক জায়গায় এখনো হয়রানির ভয় থাকে। অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ থাকে। পরিচ্ছন্নতার সংকট থাকে। এসব ছোট সমস্যা নয়। এগুলোই একজন মানুষের দ্বিতীয়বার ফিরে আসার সিদ্ধান্ত বদলে দেয়। অবকাঠামোও বড় বাধা। অনেক দর্শনীয় স্থানে পৌঁছানোই কঠিন। ভালো সড়ক নেই। পর্যাপ্ত গণপরিবহন নেই। মানসম্মত শৌচাগার নেই। তথ্যকেন্দ্র নেই। ডিজিটাল গাইড নেই। বিশেষ করে নেত্রকোনার মতো জায়গায় প্রকৃতি আছে, কিন্তু পর্যটক ধরে রাখার ব্যবস্থা দুর্বল।
সুন্দরবন আমাদের গর্ব। এটি শুধু একটি বন নয়। এটি একটি জীবন্ত সভ্যতা। রয়েল বেঙ্গল টাইগারের দেশ। নদীর দেশ। কিন্তু সুন্দরবনের পর্যটনেও ভারসাম্য দরকার। অতিরিক্ত বাণিজ্যিকীকরণ নয়। আবার অযতœও নয়। সংরক্ষণ আর পর্যটনকে পাশাপাশি হাঁটতে হবে। আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো পর্যটন সংস্কৃতি। ‘অতিথি দেব ভব’ শুধু ভারতের একটি জনপ্রিয় ধারণা নয়। এটি দক্ষিণ এশিয়ার মানবিক ঐতিহ্য। বাংলাদেশেও সেই চর্চা দরকার। পর্যটন অর্থনীতির শক্তিশালী চালিকাশক্তি হতে পারে। একজন পর্যটক শুধু হোটেলে টাকা খরচ করেন না। তিনি স্থানীয় খাবার খান। হস্তশিল্প কেনেন। পরিবহন ব্যবহার করেন। গাইড নেন। ছোট দোকানে কেনাকাটা করেন। অর্থ এক হাত থেকে আরেক হাতে ছড়িয়ে পড়ে। কর্মসংস্থান বাড়ে। বিশ্বের অনেক দেশ এই শক্তিকে কাজে লাগিয়েছে। নরওয়ে তার ফিয়র্ডকে রক্ষা করেই পর্যটন গড়ে তুলেছে। সুইডেন প্রকৃতিকে নষ্ট না করেই মানুষের জন্য উন্মুক্ত রেখেছে। মালয়েশিয়া শহর আর প্রকৃতিকে একসঙ্গে বাজারজাত করেছে। আমাদেরও নিজের পথ খুঁজতে হবে। অন্ধ অনুকরণ নয়। বাংলাদেশি মডেল তৈরি করতে হবে। ভ্রমণ মানে শুধু এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাওয়া নয়। ভ্রমণ মানে সংসারবোধটাকেও ঘরের বাইরে নিয়ে যাওয়া। একটি ছোট ব্যাগই তখন সম্বল। কোনো এক রোদেলা দুপুরে পার্কের বেঞ্চেই যেন ছোট্ট সংসার পাতা। জীবন নতুন করে শ্বাস নেয়। প্রকৃতিকে ভালোবাসতে শেখায়। মানুষকে ভালোবাসতেও শেখায়। করোনা মহামারীর ঠিক আগে জানুয়ারির এক সফর আজও আমার জীবনের সেরা ভ্রমণগুলোর একটি। চট্টগ্রাম থেকে মাটিরাঙা। তারপর খাগড়াছড়ি। শেষে পানছড়ি। সেই বাইক ট্যুরের স্মৃতি আজও টাটকা। সত্যিকারের ভ্রমণ মানুষের জীবন বদলে দেওয়া গল্পের জন্ম দেয়। বাবার চাকরির সুবাদে ছোটবেলা থেকেই পাহাড়ের নানা মানুষের সঙ্গে মিশেছি। তাদের সরলতা আমাকে বারবার মুগ্ধ করেছে। সেই সফরে আমাদের গন্তব্য ছিল পানছড়ির মায়াবিনী হ্রদের পাশের ছোট্ট একটি ঘর। ঘরটির মালিক ঊষাতন ত্রিপুরা দাদা। তার সঙ্গে আলাপ না হলে হয়তো বুঝতেই পারতাম না, সমতলের মানুষ হিসেবে আমরা কত তুচ্ছ বিষয় নিয়ে জীবনকে জটিল করে তুলি। অথচ পাহাড়ের মানুষ অনেক কম নিয়ে অনেক বেশি বাঁচতে জানে।
ভ্রমণের আগে মনে হয়, প্রাণের টানে ছুটে যাই। ভ্রমণ শেষে মনে হয়, এবার আপন দেশে ফেরা যাক। এই দুই অনুভূতির মাঝখানেই জমে ওঠে স্মৃতি। আমাদের হাতে ছিল মাত্র তিন দিন। দুই দিনের ছুটির সঙ্গে যোগ হয়েছিল আরেক দিনের অর্জিত ছুটি। সেই অল্প সময়েই প্রায় সাড়ে চারশ কিলোমিটার বাইক চালিয়েছিলাম। আশ্চর্যের বিষয়, ক্লান্তি তেমন ছিল না। বরং ফেরার পথে একটাই চিন্তা ঘুরছিল, আবার কবে আসব? তিন দিনের সেই সফর আজও স্মৃতির পালকে ঝুলে আছে। কিছু ভ্রমণ শেষ হয়ে যায়। কিন্তু কিছু ভ্রমণ মানুষকে আজীবন বহন করে। পানছড়ির সেই পথ, মায়াবিনী হ্রদের জল আর ঊষাতন ত্রিপুরা দাদার হাসিমাখা মুখ আমার কাছে তেমনই এক অমূল্য সঞ্চয়। সাংবাদিকতায় একটি কথা প্রচলিত আছে, ‘ভোজনং যত্রতত্রং, শয়নং হট্টমন্দিরে।’ পথের মানুষ জানে, কখনো খাবার যেখানে পাওয়া যায় সেখানেই খেতে হয়। কখনো রাত কাটাতে হয় পথের আশ্রয়েই। ভ্রমণও আমাকে সেই সহজ সত্যটাই শিখিয়েছে। মানুষ যত কম নিয়ে পথ চলতে শেখে, পৃথিবী তত বেশি তার আপন হয়ে ওঠে। বিপ্লবী চে গুয়েভারাকে নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্র ঞযব গড়ঃড়ৎপুপষব উরধৎরবং-এ বারবার উঠে আসে যে ভ্রমণ শুধু পথ দেখা নয়, মানুষকে নতুন করে দেখা। বিশেষ করে আন্দিজ পার হওয়া, খনি শ্রমিকদের সঙ্গে দেখা আর পেরুর কুষ্ঠরোগীদের কলোনিতে কাটানো সময় তাকে গভীরভাবে বদলে দেয়। তিনি উপলব্ধি করেন, তিনি আর কেবল একজন মেডিকেল ছাত্র নন; বরং লাতিন আমেরিকার মানুষের দুঃখ, বৈষম্য ও সংগ্রাম তার নিজের জীবনদর্শনকেও পাল্টে দিচ্ছে। ভ্রমণ তাকে পর্যটক থেকে প্রত্যক্ষদর্শীতে, আর প্রত্যক্ষদর্শী থেকে পরিবর্তনের প্রশ্নে তাড়িত এক মানুষে রূপান্তরিত করে। তার অভিজ্ঞতার মূল বার্তা হলো, পথ কখনো শুধু গন্তব্যে পৌঁছায় না; অনেক সময় পথই মানুষকে নতুন মানুষ বানিয়ে দেয়।
সবশেষে আবার ফিরে আসি সেই রাহুল
সাংকৃত্যায়ন আর মনমোহন মিত্রের কাছে। তারা আমাদের শিখিয়েছেন, পৃথিবীকে জানতে হলে পথ ধরতে হয়। কিন্তু সেই পথ নিরাপদও হতে হয়। স্বাগতপূর্ণও হতে হয়। বাংলাদেশের সামনে সুযোগ এখনো আছে। কালো ছায়া কাটুক। ভ্রমণ হোক মানুষের অধিকার। পর্যটন হোক সংস্কৃতির সেতু। আর অর্থনীতিরও এক শক্তিশালী চালিকাশক্তি। সত্যজিৎ রায়ের আগন্তুক সিনেমার ভূ-পর্যটক মনোমোহন মিত্র শৈশবে ছুটন্ত বাইসনের আদিম গুহাচিত্র দেখে পৃথিবীকে জানার নেশায় ঘর ছেড়েছিলেন। তার ভ্রমণ ছিল কৌতূহলের, জ্ঞান অন্বেষণের। কিন্তু ফিরে এসে ভাগ্নি অনীলা ও স্বামী সুধীন এবং দর্শক হিসেবে আমাদের মধ্যবিত্ত সুবিধাবাদী, সংকীর্ণ মানসিকতার সামনে তিনি রেখে যান এক ঐতিহাসিক শিক্ষা- ভ্রমণপ্রিয় মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার মুক্তচিন্তা; কূপম-ূক হয়ে বেঁচে থাকা নয়। রুশ সিনেমা ‘ব্যালাড অব এ সোলজার’ দেখলে মনে হয়, ভ্রমণ কখনোই শুধু গন্তব্যে পৌঁছানোর গল্প নয়। যুদ্ধের ময়দান থেকে ছুটিতে বাড়ি ফেরার পথে তরুণ সৈনিক আলিওশা যেন এক অদ্ভুত রোড ট্রিপে বেরিয়ে পড়ে। ট্রেন মিস হয়, লিফট মেলে, আবার পথ আটকে যায়। পথে দেখা হয় নানা মানুষের সঙ্গে। কারও প্রেমের গল্প, কারও বিচ্ছেদের কষ্ট, কারও ঘরে ফেরার আকুলতা। এমনকি নিজের মায়ের কাছে পৌঁছানোর জন্য হাতে থাকা অল্প সময়টুকুও বারবার অন্যের প্রয়োজনে ভাগ করে দিতে হয় তাকে। মজার ব্যাপার হলো, আলিওশার আসল গন্তব্য ছিল বাড়ি। কিন্তু পথ তাকে যে মানুষগুলোর কাছে নিয়ে যায়, তারাই শেষ পর্যন্ত তার যাত্রার আসল গল্প হয়ে ওঠে। যেন সিনেমাটি খুব চুপচাপ বলে যায়, ভ্রমণে আমরা শুধু নতুন জায়গায় যাই না, পথে পথে নতুন মানুষ আর নতুন জীবন আবিষ্কার করি।
লেখক : শিক্ষক ও গবেষক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। ডক্টোরাল স্কলার, স্কুল অব জার্নালিজম অ্যান্ড ম্যাস কমিউনিকেশন, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়।