কথার প্রভাব অনেক গভীর। সুন্দর ও প্রেরণামূলক কথা মানুষকে আনন্দ দেয়, দুঃখ ভুলায় এবং নতুন করে বাঁচার সাহস জোগায়। আবার কটু কথা দীর্ঘদিনের কষ্টের কারণ হয়। তাই কথা বলার ক্ষেত্রে সতর্কতা ও সংযম জরুরি। ইসলাম সত্য, সুন্দর, প্রয়োজনীয় ও কল্যাণকর কথাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। এমন কথা বলা ইবাদত হিসেবে গণ্য।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘উত্তম কথা সদকা’। সুতরাং মানুষের প্রতি আন্তরিকতা, সহমর্মিতা ও সুন্দর আচরণের মাধ্যমেও মানুষ সওয়াবের অধিকারী হতে পারে।
কথার প্রভাব : কোনো শিক্ষার্থী পরীক্ষায় আশানুরূপ ফল করতে পারেনি। চারপাশ থেকে যখন সে শুনছে, ‘তুমি পারবে না।’ তখন একজন শিক্ষক যদি বলেন, ‘এবার ফল ভালো হয়নি, কিন্তু তুমি চেষ্টা করলে অবশ্যই আরও ভালো করতে পারবে।’ এই কথাটি তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।
কেউ ব্যবসায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে হতাশ হয়ে পড়ল। তাকে যদি বলা হয়, ‘ক্ষতি হয়েছে, কিন্তু জীবন থেমে যায়নি। আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন, আবার চেষ্টা করুন।’ এই সামান্য কথাটিই তার মনে নতুন সাহস জাগাতে পারে।
কেউ আপনজন হারিয়ে শোকে ভেঙে পড়েছে। সেখানে দীর্ঘ বক্তব্যের প্রয়োজন নেই। তখন শুধু বলা, ‘আমি আপনার পাশে আছি, আল্লাহ আপনাকে ধৈর্য ধারণের তৌফিক দিন।’ এটুকুই তার জন্য অনেক বড় সান্ত্বনা হতে পারে।
অপমান নয়, সংশোধন : ভালো কথা বলতে শুধু মিষ্টি বা প্রশংসার কথা বোঝায় না। কখনো কঠিন সত্যও বলতে হয়। তবে সত্য বলার ধরনটিও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো সন্তান ভুল করেছে। তাকে বলা হলো, ‘তুমি একটা অকর্মা।’ এতে ভুল সংশোধন হয় না, বরং তার আত্মমর্যাদায় আঘাত লাগে। অথচ বলা যায়, ‘তোমার এই কাজটি সঠিক হয়নি এবং আমি জানি, তুমি এর চেয়ে ভালো করতে পারো।’
দুটি কথার উদ্দেশ্য একই, ভুল সংশোধন করা। কিন্তু দ্বিতীয় কথাটিতে সংশোধনের পাশাপাশি ভালোবাসা ও আশাও রয়েছে। তাই সত্য বলব, কিন্তু সত্যকে কষ্টের অস্ত্র বানাব না। উপদেশ দেব, কিন্তু অপমানের ভাষায় নয়। সংশোধন করব, কিন্তু মর্যাদা নষ্ট করে নয়।
পরিবারে সুন্দর কথা : বাইরের মানুষের সঙ্গে আমরা অনেক সময় অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে কথা বলি। কিন্তু ঘরে ফিরলে সেই সৌজন্য যেন হারিয়ে যায়। অথচ আমাদের সবচেয়ে কাছের মানুষগুলোরই সুন্দর কথা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
একজন মা সারা দিন সংসারের কাজ করেছেন। কেউ যদি শুধু বলে, ‘আজ অনেক পরিশ্রম করেছ, আল্লাহ তোমাকে উত্তম প্রতিদান দিন।’ শুধু এতটুকু কথায় তার ক্লান্ত হৃদয়ে প্রশান্তি নেমে আসতে পারে।
একজন বাবা সারা দিন পরিশ্রম করে ঘরে ফিরেছেন। সন্তান যদি দৌড়ে এসে বলে, ‘আব্বু! আপনি এসেছেন!’ এই ছোট্ট বাক্যটিও তার সারা দিনের ক্লান্তি ভুলিয়ে দিতে পারে।
স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কেও সুন্দর কথার গুরুত্ব অপরিসীম। ‘তুমি কষ্ট করছ’, ‘তোমাকে ধন্যবাদ’, ‘আল্লাহ তোমাকে ভালো রাখুন।’ এসব ছোট্ট বাক্য সম্পর্কের ভেতর ভালোবাসাকে নতুন করে জাগিয়ে তুলতে পারে।
আমরা মনে করি, আপনজন তো আপনজনই। তাদের আবার প্রশংসা করতে হবে কেন? অথচ সত্য হলো, আপনজনের কাছ থেকেই মানুষ সবচেয়ে বেশি ভালোবাসার ভাষা শুনতে চায়।
শিশুর মনে কথার ছাপ : শিশুর হৃদয় নরম মাটির মতো। সেখানে বাবা-মা ও শিক্ষকের বলা প্রতিটি কথা কোনো না কোনোভাবে দাগ কাটে। ‘তুমি কিছুই পারো না, তোমাকে দিয়ে কিছু হবে না, তুমি সব সময় এমনই’, এ ধরনের কথা শিশুর মনে নিজের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে ‘তুমি চেষ্টা করলে পারবে, ভুল হয়েছে, আবার চেষ্টা করো, আমি তোমার ওপর বিশ্বাস করি।’ এই কথাগুলো তার আত্মবিশ্বাসের ভিত শক্ত করতে পারে।
দাওয়াতে কোমল কথা : মানুষকে ভালো পথে আহ্বান করার ক্ষেত্রে ভাষার সৌন্দর্যের বিকল্প নেই। মহান আল্লাহ মুসা ও হারুন (আ.)-কে ফেরাউনের কাছে পাঠানোর সময় কোমল কথা বলার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
এখানে আমাদের জন্য বড় শিক্ষা রয়েছে। যার সঙ্গে আমাদের মতের অমিল, তাকেও সম্মান দিয়ে কথা বলতে হয়। ভুল ধরিয়ে দিয়েও মানুষকে ছোট না করে সংশোধন করা যায়।
কথায় ভাঙে-গড়ে সম্পর্ক : কথার ওপর অনেক সম্পর্কের টিকে থাকা নির্ভর করে। একটি কটু কথা বছরের পর বছর গড়ে ওঠা সম্পর্কেও দূরত্ব তৈরি করতে পারে। আবার একটি আন্তরিক বাক্য ভুল বোঝাবুঝি দূর করে মানুষকে কাছে টানতে পারে। অনেক সময় অভিমান ও অহংকারের কারণে সম্পর্কের দূরত্ব বাড়তে থাকে। দুজনই অপেক্ষা করে, অন্যজন আগে কথা বলুক। অথচ একটু নরম হওয়া, একটি আন্তরিক কথা কিংবা একটু ক্ষমা চাওয়াই পারে ভেঙে যেতে বসা সম্পর্ককে নতুন করে বাঁচিয়ে তুলতে।
নীরবতাও ইবাদত : সব সময় কথা বলাই বুদ্ধিমানের কাজ নয়। কখনো নীরব থাকাও উত্তম। রাগের সময় চুপ থাকা, গালি দেওয়ার সুযোগ পেয়েও নিজেকে সংযত রাখা, কারও গোপন বিষয় প্রকাশ না করা, অপ্রয়োজনীয় বিতর্কে না জড়ানো, এসবও সুন্দর চরিত্রের অংশ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ইমান রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা নীরব থাকে।’
ভালো কথা সদকা : আমরা অনেকেই ভাবি, ইবাদত মানেই নির্দিষ্ট কিছু আমল। অথচ ইসলাম আমাদের জীবনের সাধারণ কাজগুলোকেও সওয়াবের পথে পরিণত করার সুযোগ দিয়েছে। একটু হাসি, একটি সালাম, একজন বিপদগ্রস্তকে সান্ত্বনা, একজন হতাশ মানুষকে আশাবাদী করা, কাউকে সুন্দর পরামর্শ দেওয়া এসবই হতে পারে নেক আমলের মাধ্যম।
লেখক : শিক্ষক, মাদ্রাসাতুদ দাওয়াহ
আশ-শরইয়্যাহ, নারায়ণগঞ্জ