সুতোয় গাঁথা গল্প, দেশীয় উদ্যোগের মেলবন্ধন

আপডেট : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৪০ এএম

দেশীয় ঐতিহ্য, সৃজনশীলতা আর উদ্যোক্তাদের গল্পকে একই সুতোয় গাঁথতে ধানম-ির মাইডাস সেন্টারে বসেছিল ‘সুতোর গল্প’ মেলা। দেশের সুপ্রতিষ্ঠিত ও নতুন উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণে আয়োজিত এ মেলায় তুলে ধরা হয় দেশীয়  পোশাক, গহনা, ব্যাগ, কারুশিল্প, সৌন্দর্য্য চর্চার পণ্য। যার মধ্যে উঠে এসেছে একজন উদ্যোক্তার সৃষ্টিশীলতার বৈচিত্র্য। ক্রেতা-দর্শনার্থীদের উপস্থিতিতে মেলাটি হয়ে ওঠে দেশীয় উদ্যোগ ও পণ্যের এক প্রাণবন্ত মিলনমেলা। লিখেছেন মোহসীনা লাইজু

দেশের প্রতিষ্ঠিত ও নতুন উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণে ‘সুতোর গল্প’ মেলা বসেছিল ধানম-ির মাইডাস সেন্টারে। মেলাতে অংশগ্রহণ করেছিল ৪৫ জন উদ্যোক্তা তাদের প্রতিষ্ঠানের পণ্য নিয়ে। শারদীয় উৎসব সামনে রেখে তিন দিনব্যাপী এই মেলার শিরোনাম ছিলো ‘সুতোর গল্প : নিজস্বতায় বোনা শারদীয় উৎসব’। ফ্যাশন উদ্যোগ, ফ্যাশন এন্টারপ্রেনার্স  অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে এই মেলা অনুষ্ঠিত হয়।

একই ছাদের নিচে জায়গা পেয়েছে দেশীয় কারুশিল্প, নতুন নকশা, ছোট উদ্যোগ এবং নিজের একটি পরিচয় তৈরির স্বপ্ন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব ও এসএমই ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান আবদুর নাসের খান। তিনি বলেন, ‘আমাদের ইতিহাস ও সংস্কৃতিগুলো তুলে ধরতে আমরা একটি ডিসপ্লে সেন্টার করার চিন্তাভাবনা করছি। এখানে আগত উদ্যোক্তাদের পণ্যগুলোর প্রচার বাড়াতে আমরা বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে যেসব উপহার কেনা হয় তা যেন এখান থেকে কিনতে পারি। আমরা যখনই আমাদের পণ্য কোনো রাষ্ট্রপতি অথবা বিদেশি প্রতিনিধিকে উপহার হিসেবে দিয়েছি, তারা উপহারের প্রশংসা করেছেন।’মেলায় অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরী, নৃত্যশিল্পী মুনমুন আহমেদ ও কোরিওগ্রাফার আজরা মাহমুদ।

ফ্যাশন উদ্যোগ, ফ্যাশন এন্টারপ্রেনিউরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এফইএবি) সভাপতি  সাদাকালোর কর্নধার আজহারুল হক আজাদ বলেন, ‘সুতোর গল্প শুধু একটি মেলা নয়; এটি আমাদের ঐতিহ্য, সৃজনশীলতা এবং আমাদের উদ্যোক্তাদের স্বপ্নকে একই সুতোয় গাঁথার একটি প্রচেষ্টা। এর আগেও আমরা’

মেলায় অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে শিল্পলোক, পোশাক বাই তাননাস, মিথ আর্টস অ্যান্ড ক্রাফটস, কইন্যা, কালিন্দী, সিগনেট, সুতলি, আটকুঠুরি নয় দরজা, বুনো, দয়ীতা, তেরো পার্বণ, পরিণীতা ফ্যাশন, তানিস বাংলাদেশ, ঋতি, মিতার গল্প, নকশা মিন্ত্রী, গুটিপা, বক্স অব অর্নামেন্টস, মুনমুন’স, সরলা, অয়ন ক্রাফটস, পৌরাণিক, বেনে বৌ, নিপুণ ক্রাফটস, ট্রেন্ডজ, ট্যান, ক্রাফট পান্ডা, দীঘল, শিশু পরিবহন, খুঁত, যথাশিল্প, আজুরা বাই শান্তা কবির, রিংকিস অ্যাটায়ার, আর্টজেনিক্স বাই আনিকা, সীবনী, কল্পতরু, ফারহানা ফ্যাশন, কনক দ্য জুয়েলারি প্যালেস, দেশাল, রঙ বাংলাদেশ, অঞ্জন’স, কে ক্রাফট, সাদাকালো, কাপড়-ই-বাংলা ও অন্যরকম।

২৫ থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর এই তিন দিন মেলা অনুষ্ঠিত হয়। দেশের প্রতিষ্ঠিত ও নতুন উদ্যোক্তা এবং বিভিন্ন ব্র্যান্ড অংশ নিয়েছে এ আয়োজনে। মেলায় দেশীয় সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, নতুনত্ব ও স্বকীয়তার সমন্বয় তুলে ধরা হয়েছে। মেলায় অংশ নেওয়া উদ্যোক্তারা নতুন নকশার পোশাক, গয়না ও বিভিন্ন সৃষ্টিশীল পণ্য নিয়ে আসেন। মেলায় ৪৫টি প্রতিষ্ঠানের শারদীয় সংগ্রহ ও প্রদর্শিত হয়েছে। একই জায়গায় একই সঙ্গে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের পণ্য কেনার সুযোগ ছিল দর্শনার্থীদের জন্য। অনেকই নানা পণ্যের সমারোহ থেকে পুজোর কেনাকাটাও সেরে নিয়েছেন।

শাড়ির জমিনে কখনো চেনা বাংলার নকশা, কখনো ঐতিহ্যবাহী মোটিফে আধুনিকতার ছোঁয়া। পাশেই হাতে তৈরি গয়না, ব্যাগ, ঘর সাজানোর নানা অনুষঙ্গ কিংবা সৌন্দর্য্য চর্চার নানা ভেষজ পণ্য। প্রতিটি পণ্যের নকশা আলাদা, উপকরণ আলাদা, তৈরির গল্পও আলাদা।  মেলায় না আসলে বোঝাই যেত না। তবে সবকিছুকে এক সুতোয় বেঁধেছে একটি বিষয় দেশীয় পণ্য ও নিজস্বতা।

‘সুতোর গল্প’ নামটির মধ্যেই যেন লুকিয়ে আছে আয়োজনের মূল ভাবনা। কিছু সুতো যেমন একা একটি পোশাক নয়, তেমনি একটি পণ্যের পেছনেও শুধু একজন উদ্যোক্তার শ্রম থাকে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে নকশাকার, কারিগর, দেশীয় উপকরণ আর দীর্ঘ সময়ের শ্রম। মেলার স্টলগুলোতে ঘুরে সেই বৈচিত্র্যও চোখে পড়ে। শাড়ি, পাঞ্জাবি, কুর্তিসহ বিভিন্ন পোশাকের পাশাপাশি হাতে তৈরি গয়না, ব্যাগ, জুতা, হস্তশিল্প ও নানা লাইফস্টাইল পণ্য। শারদীয় উৎসব মাথায় রেখে রং, নকশা ও উপকরণ বাছাইয়েও উদ্যোক্তারা আনেন ভিন্নতা। কেউ ঐতিহ্যবাহী নকশাকে সমসাময়িক পোশাকে নতুনভাবে তুলে ধরছেন, কেউ আবার পরিচিত দেশীয় উপকরণ ব্যবহার করে তৈরি করেছেন আধুনিক লাইফস্টাইল পণ্য।

 মেলায় অংশ নেওয়া সীবানীর উদ্যোক্তা আবেদা খাতুন মিতুল জানান, শারদীয় সংগ্রহ তৈরির সময় দেশীয় মোটিফ ও প্রাকৃতিক রঙের ব্যবহার ধরে রেখেছেন, তবে পোশাকের কাট ও নকশায় এনেছেন সমসাময়িক ধারা। নতুন প্রজন্ম দেশীয় পোশাক পরতে চান কিন্তু একই সঙ্গে তারা আরামদায়ক ও আধুনিক নকশাও খোঁজেন। ফলে ঐতিহ্যকে হুবহু পুনরাবৃত্তি না করে নতুনভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছেন তিনি। তার স্টলে থাকা পোশাকগুলোর দিকে তাকালেও সেই চেষ্টার ছাপ মেলে। দেশীয় মোটিফ আর প্রাকৃতিক রং তার নকশার মূল অনুপ্রেরণা। অর্গানিক রং ব্যবহার করে পোশাকে উৎসবের উজ্জ্বলতাকে তুলে ধরেছেন।

সুতোর গল্প মেলা শুধু কাপড়ের নয়। পাশের কোনো স্টলে হয়তো সাজানো হাতে তৈরি গয়না, অন্যটিতে ব্যাগ কিংবা ঘর সাজানোর পণ্য। পরিচিত উপকরণকেই নতুন নকশায় হাজির করছেন উদ্যোক্তারা। হস্তশিল্প ও লাইফস্টাইল পণ্য নিয়ে অংশ নেওয়া উদ্যোক্তা পৃথিলা শাহনেওয়াজ বলেন, দেশীয় পণ্যের প্রতি মানুষের আগ্রহ আছে তবে ক্রেতারা এখন নকশা ও ফিনিশিংয়েও নতুনত্ব চান। তাই দেশীয় উপকরণ ও কারিগরদের কাজ ধরে রেখেই পণ্যকে আধুনিক জীবনযাপনের উপযোগী করে তোলার চেষ্টা করেছেন তারা। একটি হাতে তৈরি পণ্যের সঙ্গে একজন কারিগরের শ্রম ও দক্ষতার গল্পও জড়িয়ে থাকে। ক্রেতার কাছে সেই গল্পটি পৌঁছে দেওয়া গেলে পণ্যটির প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিও বদলায়। আর দেশীয় পণ্যকে আর্ন্তজাতিক মান দেয়ারও চেষ্টা ছিলো তাদের।

 মেলায় অংশ নেওয়া অনেক উদ্যোক্তার যাত্রাই শুরু হয়েছে ছোট পরিসরে। কারও শুরু সামাজিক মাধ্যমে, কেউ আবার অল্প কয়েকটি পণ্য নিয়ে পরিচিতজনদের মধ্যেই শুরু করেছিলেন বিক্রি। ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছে নিজস্ব ক্রেতা ও ব্র্যান্ডের পরিচিতি।

এমনই একজন উদীয়মান উদ্যোক্তা সাফা জানান, অনলাইনে ব্যবসা করার কারণে ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ থাকলেও সরাসরি তাদের প্রতিক্রিয়া জানার সুযোগ তুলনামূলক কম পাওয়া যায়। মেলায় এসে একজন ক্রেতা যখন পণ্য হাতে নিয়ে দেখেন, নকশা নিয়ে কথা বলেন কিংবা নিজের পছন্দের কথা জানান, সেটি উদ্যোক্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে। নতুন করে তার কাজের আগ্রহ তৈরি হয়। তিনি মনে করেন, নতুন একটি ব্র্যান্ডের জন্য বিক্রির পাশাপাশি পরিচিতি তৈরি করাটাও বড় চ্যালেঞ্জ। এ ধরনের আয়োজনে একই জায়গায় অনেক মানুষের সামনে নিজের কাজ তুলে ধরার সুযোগ সেই চ্যালেঞ্জ কিছুটা সহজ করে।

একজন উদ্যোক্তা যখন নিজের তৈরি পণ্য নিয়ে সরাসরি ক্রেতার সামনে দাঁড়ান, তখন সম্পর্কটি শুধু বিক্রেতা ও ক্রেতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। কোন রং বেশি পছন্দ হচ্ছে, কোন নকশা নজর কাড়ছে কিংবা একটি পণ্যে কী পরিবর্তন চান এসব তথ্যও সরাসরি পাওয়া যায়। দুর্গাপূজাকে ঘিরে নতুন পোশাক ও সাজসজ্জার নানা অনুষঙ্গ কেনার দীর্ঘদিনের

সংস্কৃতি রয়েছে। সেই উৎসবের বাজারে দেশীয় উদ্যোক্তাদের পণ্যকে আরও দৃশ্যমান করে তোলার সুযোগ তৈরি করেছে ‘সুতোর গল্প’। এখানে ক্রেতা শুধু একটি তৈরি পণ্য কিনছেন না। অনেক ক্ষেত্রে তিনি সরাসরি জানতে পারছেন পণ্যটি কে তৈরি করেছেন, কোথা থেকে এসেছে এর নকশার ভাবনা, কোন উপকরণ ব্যবহার হয়েছে কিংবা একটি পণ্য তৈরিতে কতটা শ্রম জড়িয়ে আছে।

আয়োজকদের ভাবনাতেও রয়েছে এই যোগাযোগের জায়গাটি। তাদের মতে, দেশীয় উদ্যোক্তাদের এগিয়ে নিতে শুধু পণ্য তৈরির সুযোগ যথেষ্ট নয়; সেই পণ্য ক্রেতার কাছে পৌঁছানোর প্ল্যাটফর্মও প্রয়োজন। আর নিয়মিত এমন আয়োজন হলে নতুন ও ছোট ব্র্যান্ডগুলোর জন্য নিজেদের বাজার তৈরির সুযোগ বাড়াতে পারবে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত