ত্রাণের লোভে নাগরিকত্ব সংকটে স্থানীয়রা

আপডেট : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:১২ এএম

মিয়ানমার থেকে বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে গিয়ে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের স্থানীয় বাসিন্দারা যে মানবিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন, তা এখন অনেকের জীবনেই চরম অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা ঢলের পর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও এনজিওর দেওয়া ত্রাণের প্রলোভনে পড়ে স্থানীয় বহু দরিদ্র বাসিন্দা অসতর্কতাবশত রোহিঙ্গা ক্যাম্পে গিয়ে বায়োমেট্রিক নিবন্ধন করেছিলেন। অভাবের সংসারে সাময়িক স্বস্তির জন্য নেওয়া সেই সিদ্ধান্ত এখন তাদের জাতীয় পরিচয় ও নাগরিকত্ব সংকটের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

বর্তমানে এসব বাসিন্দা জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধন, ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তি, পাসপোর্ট তৈরি কিংবা সরকারি কোনো সুবিধা নিতে গিয়ে নানা বিড়ম্বনায় পড়ছেন। আঙুলের ছাপ দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নির্বাচন কমিশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের কেন্দ্রীয় সার্ভারে তাদের নাম ও তথ্য ‘রোহিঙ্গা ডেটাবেজে’ প্রদর্শিত হচ্ছে। শিক্ষা, চাকরি, বিবাহ কিংবা বিদেশ গমনাগমন সব ক্ষেত্রেই তারা অসুবিধায় পড়েছেন।

সন্তানের বিয়ে ভাঙার উপক্রম : টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের ভুক্তভোগী সুফিয়া খাতুন অশ্রুসিক্ত চোখে বলেন, ‘বড় মেয়ের বিয়ে ঠিক হয়েছে। বরের বাড়ি থেকে কাবিননামার জন্য মেয়ের ভোটার আইডি কার্ড চেয়েছে। মেয়েকে নিয়ে নির্বাচন অফিসে গিয়ে জানলাম, ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা তালিকায় নাম লেখার কারণে আমার মেয়ের তথ্যও রোহিঙ্গা ডেটাবেজে অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে। এখন বরের পরিবার সন্দেহ করছে আমরা আসলেই বাংলাদেশি কি না। আমাদের ঘরবাড়ি, জমিজমা সব এখানেই, অথচ একটা ভুলের জন্য আজকে মেয়ের বিয়েটা ভেঙে যাওয়ার উপক্রম।’

চাকরি ও ক্যারিয়ার অনিশ্চিত : উখিয়ার রাজাপালং এলাকার শিক্ষার্থী জাবেদ হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘রোহিঙ্গা ঢলের সময় আমি হাইস্কুলে পড়তাম। পাড়ার বন্ধুদের দেখাদেখি ত্রাণের কিছু মালামালের লোভে ক্যাম্পে গিয়ে নাম লিখিয়েছিলাম। পড়াশোনা শেষ করে এখন একটা সরকারি চাকরির ভাইভা দেওয়ার কথা, কিন্তু পুলিশ ভেরিফিকেশনে গিয়ে আটকে গেছি। সার্ভারে আমাকে রোহিঙ্গা দেখাচ্ছে! ভুল তো মানুষই করে, কিন্তু একটা ভুলের মাশুল এভাবে দিতে হবে!

টেকনাফ উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের শীলখালী গ্রামের বাসিন্দা শামসুল আলম গত ১৬ জানুয়ারি জেলা প্রশাসকের কাছে নিজের পরিবারের চার সদস্যের নাম রোহিঙ্গা তালিকা থেকে বাদ দিতে আবেদন করেন। শামসুল আলম বলেন, ‘আমি ত্রাণের লোভে পড়ে রোহিঙ্গা তালিকায় নাম লিখিয়ে এখন বিপাকে পড়েছি। আমি প্রকৃত বাংলাদেশি হয়েও আজ ‘রোহিঙ্গা’ হয়ে গেছি। আমার সঙ্গে স্ত্রী, ছেলেমেয়েও রোহিঙ্গা তালিকাভুক্ত হয়ে গেছে।’

বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন অধরা : উখিয়ার পালংখালী এলাকার দিনমজুর মোহাম্মদ ইসমাইল বলেন, ‘কিছু রোহিঙ্গা দালাল আমাদের বুঝিয়েছিল, ক্যাম্পে গিয়ে ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিলে নিয়মিত ত্রাণ পাওয়া যাবে। অভাবের সংসারে একটু সাহায্যের আশায় লাইনে দাঁড়িয়েছিলাম। এখন বিদেশে যাওয়ার জন্য পাসপোর্ট অফিসে আঙুলের ছাপ দিতে গিয়ে জানলাম, আমি রোহিঙ্গা! অথচ আমি বাংলাদেশি। ত্রাণের লোভে পড়ে আজকে নিজের দেশেই পরিচয়হীন।’

টেকনাফের বাহারছড়া ইউপি চেয়ারম্যান আমজাদ হোসেন খোকন বিষয়টি উদ্বেগজনক উল্লেখ করে বলেন, ‘একজন প্রকৃত বাংলাদেশি হয়েও ত্রাণের লোভে ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিয়ে ‘রোহিঙ্গা’ বনে গেছে এ রকম ঘটনায় অনেকেই বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখে পড়ছেন। বাহারছড়া ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের একজন স্থানীয় নারী পাসপোর্ট অফিসে গিয়ে রোহিঙ্গা হিসেবে শনাক্ত হয়ে পুলিশে সোপর্দ হন। এমনকি ওই নারীকে বাংলাদেশি হিসেবে মিথ্যা সনদ দেওয়ার অভিযোগে কক্সবাজার সদর মডেল থানায় ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে মামলার প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছিল। খবর পেয়ে চেয়ারম্যান তৎক্ষণাৎ পুলিশের কাছে গিয়ে প্রমাণাদি দাখিল করে মামলা থেকে রেহাই পান।’ উখিয়া উপজেলার রাজাপালং ইউপি সদস্য হেলাল উদ্দিন জানান, তার এলাকায় প্রায় ৪০ থেকে ৫০টি পরিবারের এমন তথ্য পাওয়া গেছে। তারা আবেদন করে রোহিঙ্গা ডেটাবেজ থেকে নিজেদের তথ্য বাদ দেওয়ার আবেদন করছেন।

এ ব্যাপারে কক্সবাজার জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবদুল আজিজ বলেন, ‘জেলা প্রশাসন এরই মধ্যে শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) অফিসে অন্তত কয়েক শতাধিক লোকের আবেদন ও নামের তালিকা পাঠিয়ে রোহিঙ্গা তালিকা থেকে তাদের বাদ দিতে অনুরোধ জানিয়েছে। ওই তালিকা আমার অফিসেও পাঠানো হয়েছে। জাতীয় সার্ভারে যাচাই-বাছাই করে এ পর্যন্ত ওই তালিকার অর্ধশতাধিকের বাংলাদেশি নাগরিকত্ব নিশ্চিত হওয়া গেছে। বিভিন্ন উপজেলায় নাগরিকত্ব যাচাই-বাছাইয়ের জন্য গঠিত বিশেষ কমিটির কাছেও তালিকা ও আবেদনগুলো পাঠানো হয়েছে।’

আরআরআরসি কার্যালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এটি একটি সংবেদনশীল ও জটিল কারিগরি প্রক্রিয়া। তবে প্রকৃত বাংলাদেশিদের পরিচয় পুনরুদ্ধার ও ডেটাবেজ সংশোধনের কাজ চলছে। এ বিষয়ে আরআরআরসি কমিশনার মো. মিজানুর রহমান জানান, কোনো বাংলাদেশি নাগরিক রোহিঙ্গা ডেটাবেজে নিবন্ধিত হওয়ার অভিযোগ করলে বিষয়টি জেলা প্রশাসনের কাছে পাঠানো হয়। এরপর ইউএনও ও ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে তদন্ত করা হয়। তদন্ত শেষে প্রতিবেদন কমিশনে এলে তা ইউএনএইচসিআরের কাছে পাঠানো হয়, যাতে প্রয়োজনীয় তথ্য সংশোধন করা যায়। সাম্প্রতিক সময়ে এমন কয়েকটি তথ্য সংশোধন করা হয়েছে এবং আরও কিছু আবেদন তদন্তাধীন রয়েছে। তবে রোহিঙ্গা হিসেবে নিবন্ধিত স্থানীয় বাংলাদেশির মোট সংখ্যা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত