চুনতিতে শত একর বন উজাড়

আপডেট : ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:২৭ এএম

বাংলাদেশের অন্যতম একটি সংরক্ষিত বনাঞ্চল ও বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য। এটি এশীয় হাতির গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল ও চলাচলের করিডর হিসেবে পরিচিত। চট্টগ্রাম শহর থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দক্ষিণে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের পাশে এর অবস্থান। আয়তন ৭ হাজার ৭৬৪ হেক্টর। এই অভয়ারণ্যের হারবাং বনবিটে সংরক্ষিত বনভূমি উজাড় করে একের পর এক গড়ে তোলা হচ্ছে ছনখোলা। অবৈধ দখলের কারণে ইতিমধ্যে শত একর বন উজাড় হয়ে গেছে। ছনখোলা করতে গিয়ে কেটে ফেলা হচ্ছে সেখানকার বনজ, ফলদসহ বিভিন্ন প্রজাতির ছোট-বড় গাছ। বিষয়টি জানার পরও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না বন বিভাগ। উল্টো অবৈধ দখলে বন রক্ষকদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

বন বিভাগের তথ্যমতে, হারবাং অভয়ারণ্য এলাকায় সংরক্ষিত ও রক্ষিত বনের পরিমাণ ২ হাজার ৬২১ দশমিক ৯৫ একর। এর মধ্যে সরকারি হিসাবে জবরদখলের পরিমাণ ২৫১ দশমিক ১১ একর। স্থানীয়দের দাবি, বাস্তবে দখলের পরিমাণ ৫০০ একরের বেশি। সরেজমিন অন্তত ১৫টি এলাকায় প্রায় ১০০ একর বনভূমিতে ছনখোলা গড়ে ওঠার চিত্র দেখা গেছে। হারবাং অভয়ারণ্য বনবিটের মগঘোনা, চিতার বিল, বনাঘোনা ও পশ্চিম ভিলেজার পাড়ার দক্ষিণে ছড়িয়ে রয়েছে এসব ছনখোলা। স্থানীয়দের অভিযোগ, হারবাং স্টেশনের জোবাইর মাঝি দখলদারের কাছ থেকে একরপ্রতি বছরে ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা ‘খাজনা’ হিসেবে নিয়ে বনভূমি ধ্বংসের সুযোগ করে দিচ্ছেন। তারা জানান, উত্তর হারবাং মধ্য বৃন্দাবনখীল এলাকার মৃত নূর আহমদের ছেলে মাহমুদুল হকের দখলে রয়েছে এসব বনভূমি। গয়ালমারার পশ্চিমে মগপাড়া বিল ও চিতার বিল এলাকায় প্রায় ৩০ একর বনভূমিতে তার ছনখোলা দেখা গেছে।

অন্যদিকে, বনাঘোনা এলাকায়ও বড় একটি অংশ দখলে রেখে ছনখোলা তৈরির অভিযোগ পাওয়া গেছে উত্তর হারবাং করমমুহুরী পাড়ার মৃত শহর আলীর ছেলে আবদুল আজিজ ও একই এলাকার ফাতেমা বেগমের বিরুদ্ধে। এ ছাড়া গয়ালমারা এলাকার মোহাম্মদ আলী, মো. গফুর, উত্তর হারবাং ভিলেজার পাড়ার হাকিম আলী ও মো. শফি এবং ভা-ারীর ডেপার আব্দুস শুক্কুরসহ আরও কয়েকজনের দখলে রয়েছে প্রায় ৫০ একর বনভূমি। স্থানীয়রা জানান, ছনখোলা তৈরির আগে ছোট-বড় গাছ কেটে জায়গা পরিষ্কার করা হয়। এতে সেগুন, গর্জনসহ পুরনো গাছ কমার পাশাপাশি বন্যপ্রাণীর খাদ্য ও আশ্রয়স্থলও নষ্ট হচ্ছে। বন বিভাগের পুরনো ব্যবস্থাপনা প্রতিবেদনেও চুনতি এলাকায় বড় গাছের অবক্ষয় ও অবৈধভাবে গাছ কাটার বিষয়টি উঠে এসেছে। বনভূমি দখল, খ-িত হওয়া ও বন অবক্ষয় হাতির আবাসস্থলের জন্য হুমকি তৈরি করছে বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বনভূমি কমে যাওয়ায় হাতিসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণী লোকালয়ে চলে আসার ঝুঁকিও বাড়ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তারা জানান, কোনো কোনো এলাকায় ছন কাটার পর আগুনও দেওয়া হয়। এতে বনজ উদ্ভিদ ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তাছাড়া অভয়ারণ্য এলাকায় বনভূমি দখল ও গাছ কাটার পাশাপাশি রেললাইন থাকায় হাতি ট্রেনে কাটা পড়ে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, হারবাং অভয়ারণ্য বনবিট কর্মকর্তা কবির হোসেন যোগদানের পর থেকে এ বিটে বনভূমি দখল, গাছ কাটা ও পাহাড় কাটার ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। বনভূমি রক্ষায় নজরদারি ও কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় দখলদাররা আরও উৎসাহিত হচ্ছে। বন বিভাগের নথিতে জবরদখলের তথ্য থাকার পরও এসব ছনখোলা দীর্ঘদিন ধরে কীভাবে টিকে আছে, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে দখলদার মাহমুদুল হক বিষয়টি স্বীকার করে নিয়ে বলেন, তার বাবা বন বিভাগের বনপ্রহরী হিসেবে কর্মরত থাকায় হারবাং অভয়ারণ্য বনবিটের কর্মকর্তাদের সঙ্গে পরিচয় ও সখ্য রয়েছে। সেই সুবাদে তিনি কিছু জায়গা দখলে নিয়ে পরিচর্যা করে সেখানে ছনখোলা করেছেন। তবে দখলকৃত সব ছনখোলা তার নয় দাবি করে বলেন, অন্য ব্যক্তিরাও তার নাম ব্যবহার করে এসব জায়গা দখল ও বিক্রি করছেন।

হারবাং অভয়ারণ্য বনবিট কর্মকর্তা কবির হোসেনের কাছে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি প্রথমে বিষয়টি অস্বীকার করার চেষ্টা করেন। পরে বলেন, বনায়নের প্রয়োজন হলে দখলকৃত জায়গাগুলো উদ্ধার করে সেখানে বনায়ন করা হবে।

চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য রেঞ্জ কর্মকর্তা আনিসুজ্জামান শেখের সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ না করায় বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ চট্টগ্রামের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আবু নাছের মো. ইয়াছিন নেওয়াজ বলেন, বনভূমি দখল করে ছনখোলা করার ব্যাপারে খবর পাওয়ার পরপরই তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত