দিনশেষের দীপ্তি

আপডেট : ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:১৫ এএম

বেলা শেষের বিকেল। উঠোনে বসে আছেন অতিথিরা। শুধু একটি চেয়ার ফাঁকা। সবার উৎসুক অপেক্ষা একজনের জন্য। বাড়ির বড়দের চোখ বারবার ফিরে যাচ্ছে পশ্চিমের আকাশ পানে। একসময় অনুচ্চ স্বরে আসে আহ্বান ‘এবার নিয়ে এসো।’ কনে দেখার আয়োজনে মধ্যমণি হয়ে সেই চেয়ারে এসে বসে একটি মেয়ে। আলো আলতোভাবে এসে থামে তার লজ্জাবনত মুখে। মুহূর্তেই মুখজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এক অনিন্দ্য বিভা। সপ্রশংস চোখে চেয়ে থাকেন সবাই। সম্ভবত এ কারণেই বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে ‘কনে দেখা আলো’ এক স্নিগ্ধ অনুভূতির নাম। শেষ বিকেলের সেই আলো যে মুহূর্তে পৃথিবীকে স্পর্শ করে তার সবচেয়ে কোমল রূপে, আলোকচিত্রের ভাষায় সেই ক্ষণপ্রভ সময়টিই পরিচিত গোল্ডেন আওয়ার হিসেবে।

গোল্ডেন আওয়ার কেবল আলোর গল্প নয়; সময়ের পিঠে সওয়ার হয়ে আসা এক ক্ষণস্থায়ী জাদুর গল্প। সূর্য যখন দিগন্তের কোল ঘেঁষে নিচে নেমে আসে, তার তীব্রতা হারিয়ে যায় এক গভীর মায়ায়। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে পৃথিবীতে আসা সেই আলোতে থাকে না দিনের প্রখর দহন, বরং থাকে এক মোলায়েম উষ্ণতা। চারপাশের মায়াবী ছায়া হয়ে ওঠে দীর্ঘ, রঙে জমে সোনালি আবেশ, আর চিরচেনা দৃশ্যও কখনো কখনো রূপ নেয় নতুন রূপকথায়। আলো তখন শুধু দৃশ্যকে আলোকিত করে না; দৃশ্যের ভেতরে লুকিয়ে থাকা অনুভূতিকেও যেন জাগিয়ে তোলে সোনার কাঠি ছুঁয়ে। গোল্ডেন আওয়ারের আরেক নাম ম্যাজিক আওয়ার হয়তো এ কারণেই।

টাঙ্গুয়ার হাওরের বুকে তোলা বড় বকের এই ছবিটির কথাই যদি আমরা ভাবি, ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফির জটিল ব্যাকরণ, প্রজাতির অনন্যতা কিংবা নাটকীয় মুহূর্তের নিক্তিতে মাপলে ছবিটি হয়তো আহামরি কিছু নয়। এ বছর জানুয়ারির শেষে এক বিকেলে হাওরের বুকে যখন আমাদের ছোট ডিঙি নৌকাটি ভাসছিল, মন ছেয়ে ছিল একরাশ ক্লান্তি আর অপ্রাপ্তির বেদনায়। সারা দিন ঘুরেও কোনো বিরল পাখি কিংবা কাক্সিক্ষত মুহূর্ত মেলেনি। শীতের পরিযায়ী পাখিরা যেন এক অজানা ভয়ে দূরেই রয়ে যাচ্ছিল। বিরস বদনে প্রথম দিনের আয়োজন গুটিয়ে আমরা যখন ‘হাওর বিলাস’-এর পথে, ঠিক তখনই জাদুর কাঠি ছোঁয়ালেন দিনান্তের সূর্যদেব। ভাগ্যিস ক্যামেরা তখনো ব্যাগবন্দি করিনি!

আকাশজুড়ে গোধূলির আবির; পটভূমি ক্রমেই আচ্ছন্ন হচ্ছে সাঁঝের মায়ায়। সেই মøান অন্ধকারের বুক চিরে একটি সাধারণ সাদা বক ডানা মেলল আকাশের দিকে। এক মুহূর্তেই যেন মিলিয়ে গেল চারপাশের বিষাদ। দিনশেষের অবশ করা আলো বকটির ডানার প্রতিটি পালককে সোনা দিয়ে মুড়িয়ে দিল। হাওরের জল থেকে ছিটকে ওঠা জলবিন্দুগুলো সেই সোনালি ছটায় হয়ে উঠল এক একটি ভাসমান মুক্তদানা। মনে হলো, কোনো নিপুণ শিল্পী যেন ক্যানভাসে আলো-ছায়ার এক নিখুঁত কাব্য রচনা করলেন। লেন্সের ভেতর দিয়ে সেই দৃশ্য দুচোখে বুলিয়ে দিল স্নিগ্ধ পরশ। শাটারের সুরে ফ্রেমে স্থায়ী হয়ে রইল সেই অপার্থিব মুহূর্ত।

দিনের অন্য কোনো সময় হলে বকটির ডানার বিস্তার এমন থরে থরে সাজানো স্বচ্ছ আলোর চাদর হয়ে উঠত না; তৈরি হতো না পটভূমির আধো-অন্ধকারের বিপরীতে ডানার সোনালি দীপ্তির এমন মায়াময় কন্ট্রাস্ট। গোল্ডেন আওয়ারের এই এক অদ্ভুত মহিমাসাধারণ একটি পাখির সহজাত উড়ালকেও দিতে পারে শিল্পের রূপ।

গোল্ডেন আওয়ারে একটি ভালো ছবি ক্যামেরার শাটার চাপার মুহূর্তে নয়, বরং তৈরি হয় অভিজ্ঞ দৃষ্টি নিয়ে আলোকচিত্রীর অপেক্ষার মধ্য দিয়ে আলো কখন নদীর জলে সোনালি রেখা আঁকে, কখন কাশফুলের মাথায় নরম আভা হয়ে জমে, কখন একটি মুখে এসে নীরবে রেখে যায় প্রশান্তির স্পর্শ। কম্পোজিশন ও এক্সপোজারের পাশাপাশি হোয়াইট ব্যালেন্স তখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ক্যামেরায় কেলভিনের সামান্য পরিবর্তনেই বদলে যেতে পারে আলোর উষ্ণতার অনুভূতি। অনেক আলোকচিত্রী সেই সোনালি আবেশ ধরে রাখতে ৬০০০ক-এর কাছাকাছি হোয়াইট ব্যালেন্স বেছে নেন, আবার কেউ ৩২০০ক থেকে ৩৫০০ক-এর মধ্যে রেখে উষ্ণতাকে সংযত করেন। কিন্তু কোনো ক্যামেরা সেটিংই আলোকচিত্রীর সময়কে পড়ার ক্ষমতাকে ছাপিয়ে যেতে পারে না। কারণ গোল্ডেন আওয়ারের আলোকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না; তাকে শুধু সঠিক সময়ে গ্রহণ করতে হয়। আর সেই গ্রহণের মধ্য দিয়েই ছবিতে জন্ম নেয় নান্দনিকতা।

গোল্ডেন আওয়ার তাই শুধু আলোকচিত্রের একটি সময় নয়; এটি ধৈর্য, সংবেদন আর অপেক্ষারও একটি শিক্ষা। আমরা প্রায়ই সবচেয়ে উজ্জ্বল আলোর পেছনে ছুটি, অথচ দিনব্যাপী প্রতীক্ষায় পাওয়া কোমল আলোই মানুষের মুখ, প্রকৃতির রূপ কিংবা একটি মুহূর্তের সত্যকে প্রকাশ করে সবচেয়ে গভীরভাবে। জীবনের সুন্দর মুহূর্তগুলোও এমনই তারা দীর্ঘ সময়ের জন্য আমাদের সঙ্গী হয় না, কিন্তু তাদের জন্য অপেক্ষা করতে হয় অধীর আগ্রহ নিয়ে। হয়তো সে কারণেই দিনের সবচেয়ে মূল্যবান মুহূর্তটিও দীর্ঘস্থায়ী হয় না; কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী হয়ে থাকে সেই মুহূর্তের দীপ্তি ছবিতে, স্মৃতিতে, আর আমাদের অনুভূতির গভীরে।

লেখক : আলোকচিত্রী ও ব্যাংক কর্মকর্তা

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত