সালমান মুক্তাদিরের শ্বশুরের মদের চার গুদাম সিলগালা

আপডেট : ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:১৭ এএম

রাজধানীর গুলশানে বন্ড সুবিধায় আমদানি করা শুল্কমুক্ত মদ ‘অননুমোদিত’ দুই গুদামে মজুদ রাখার অভিযোগে কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের শ্বশুর শেখ নুর ইসলামের দুটি বৈধসহ চারটি গুদাম সিলগালা করা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে দক্ষিণ গুলশানের বন্ডেড ওয়্যারহাউজ টস বন্ড প্রাইভেট লিমিটেডে এক যৌথ অভিযানে সেসব সিলগালা করা হয় বলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।

এতে বলা হয়, কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর (সিআইআইডি), মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এবং স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) এ অভিযান পরিচালনা করে। প্রাথমিকভাবে ‘গুরুতর অসংগতি’ পাওয়ায় ‘অধিকতর যাচাইয়ের জন্য’ ওয়্যারহাউজগুলো সিলগালা করা হয়েছে।

শুল্ক গোয়েন্দার এক কর্মকর্তা জানান, গত বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১০টা থেকে সাড়ে ৪টা পর্যন্ত এ অভিযান চলে। এনবিআর বলছে, কোম্পানিটির ‘অনুমোদিত’ বা ‘ঘোষিত’ গুদামের সংখ্যা দুটি। কিন্তু অভিযানে দেখা গেছে সেখানে মোট চারটি গুদামে পণ্য মজুদ রেখেছে।

সংস্থাটির কর্মকর্তারা বলছেন, প্রতিষ্ঠানটির অনুমোদিত ও ঘোষিত ওয়্যারহাউজের সংখ্যা ছিল মাত্র দুটি। তবে সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, তারা অনুমোদিত সীমার বাইরে গিয়ে মোট চারটি ওয়্যারহাউজে পণ্য মজুদ করে রেখেছিল। মূলত অনুমোদিত পরিসরের বাইরে গিয়ে অতিরিক্ত আরও দুটি অননুমোদিত ওয়্যারহাউজে আইনবহির্ভূতভাবে পণ্য সংরক্ষণ করা হচ্ছিল, যা বন্ড সুবিধায় আমদানি করা শুল্কমুক্ত পণ্য অননুমোদিত গুদামে স্থানান্তর বা অপসারণ রোধ এবং সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে প্রতিষ্ঠানটির চারটি গুদামই সিলগালা করা হয়েছে। তদন্ত ও বিস্তারিত ‘যাচাই কার্যক্রম’ চলমান রয়েছে বলে বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।

গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, ‘বন্ডেড ওয়্যারহাউজ’ থেকে কেবল বাংলাদেশে কর্মরত কূটনীতিক এবং আইন অনুযায়ী বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের শুল্কমুক্ত মদ কেনার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু টস বন্ডের বিরুদ্ধে শুল্কমুক্ত পণ্য খোলাবাজারে চড়া দামে বিক্রির অভিযোগ ওঠায় তা নিয়ে কয়েক মাস ধরেই অনুসন্ধান চলছিল।

এনবিআরের সিআইসি ও আয়কর গোয়েন্দা ইউনিট কানাডা থেকেও গোয়েন্দা প্রতিবেদন সংগ্রহ করেছে। তাতে নুর ইসলাম ও তার পরিবারের সদস্যদের সেখানে নাগরিকত্বসহ ‘সন্দেহজনক’ লেনদেন ও অন্তত চারটি কোম্পানির মালিকানা থাকার অস্তিত্ব মিলেছে। সেখানকার গোয়েন্দা প্রতিবেদনে ঢাকার এ বন্ডেড ওয়্যারহাউজের পরিচালক হিসেবে নাম আছে নুর ইসলাম, তার স্ত্রী শীলা ইসলাম ও মেয়ে তাসনিম ইসলামের। দেশে থাকা মদ ও বারের ব্যবসায় নানা অনিয়মের অভিযোগের পাশাপাশি কানাডায় নুর ইসলাম ও তার পরিবারের নাগরিকত্ব থাকার তথ্য ও সম্পদ মেলার খোঁজ পেয়ে তদন্ত করে আসছিল কর আদায়ের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। তবে সম্প্রতি ঢাকায় নিউ গিনি প্রপার্টিজের প্রকল্প এলাকায় সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলার ঘটনায় ক্ষমতাসীনদের দায়ী করার পর তদন্ত কার্যক্রমের গতি বাড়ে।

কানাডা থেকে যেসব গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করেছে সিআইসি এবং আয়কর গোয়েন্দা ইউনিট, তাতে ২০১২ সালের ২৬ এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের ১৯ এপ্রিল পর্যন্ত নুরুল ইসলামের পরিবারের লেনদেনের হিসাব বিশ্লেষণ করা হয়েছে। খতিয়ে দেখা হয়েছে সেই সময়ের মোট ১৬৩টি আর্থিক প্রতিবেদন। সেখানে ‘সন্দেহজনক’ লেনদেনের ১৭টি, ‘সন্দেহজনক’ লেনদেনের চেষ্টার দুটি, ‘বড় অঙ্কের’ নগদ লেনদেনের ১১৮টি, ‘ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার নেটওয়ার্ক-ইএফটিএন’ মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তরের প্রতিবেদন ২৬টি এবং

আন্তঃদেশীয় অর্থ লেনদেনের দুটি নথির খোঁজ মিলেছে। এক বছরে প্রায় ৯৫ কোটি টাকা রেমিট্যান্স আনার তথ্যও মিলেছে। সিআইসি, আয়কর গোয়েন্দা ও এনবিআরের একাধিক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এসব তথ্য জানিয়েছেন। ওই সব নথির সারাংশের অনুলিপি দেখেছে ।

তদন্ত কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, ‘এই অভিযান সালমান মুক্তাদিরের সাম্প্রতিক ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়’।

সিআইসির একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘সালমান মুক্তাদির ঘটনা এখানে ইস্যু নয়। সব গোয়েন্দা সংস্থাই আগে থেকে কাজ করছিল। তা থেকে কিছু প্রমাণও মিলেছে। সামনে হয়তো অভিযানেও দেখতে পাওয়া যাবে।’ আয়কর গোয়েন্দা ইউনিটের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘নুর ইসলামের নানান ব্যবসা। মদের ব্যবসা। তার বন্ডেড ওয়্যারহাউজ আছে। তার বিরুদ্ধে নানান অভিযোগ ছিল। আমরা এর মধ্যে জানতে পারি তার ও পরিবারের কারও কারও বিদেশি নাগরিকত্ব আছে। এসব কিছুই কর নথিতে নেই। যে কারণে আমরা কাজ শুরু করি। যেহেতু কেবল এখানে আয়কর নয়, ভ্যাট (মূল্য সংযোজন কর-মূসক বা ভ্যাট), আমদানির ক্ষেত্রে শুল্কের ব্যাপার আছে। সব মিলেই কাজ চলছে।’

গত ২৬ সেপ্টেম্বর রাতে ঢাকার দক্ষিণ মানিকদীতে নিউ গিনি আবাসন প্রকল্পের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয়। হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয় সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ‘ব্রাউনফিশ’। এরপর ফেইসবুকে লাইভে সালমান মুক্তাদির ঘটনাটিকে ‘বিএনপির চাঁদাবাজি’ বলে দায়ী করেন এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে উদ্দেশ করে নানা মন্তব্য করেন। পরে অবশ্য চাঁদাবাজির অভিযোগ থেকে সরে আসেন তিনি।

তবে ঘটনার পর নিউ গিনি প্রোপার্টিজের পরিচালক সাইফুল ইসলাম ভূঁইয়া যে মামলা করেছেন, তাতে জমি দখল ও পূর্বশত্রুতার জেরে হামলা চালানোর কথা বলা হয়। মামলায় আসামি করা হয় অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরীসহ ১৩ জনকে। অজ্ঞাতনামা আসামির সংখ্যা ১৫০ থেকে ২০০। মামলায় এখন পর্যন্ত গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরী ও কুষ্টিয়া-২ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য আব্দুল গফুরের জামাতা মিজানুর রহমানসহ সাতজনকে গ্রেপ্তারের খবর পেয়েছে পুলিশ। এর মধ্যে বিএফআইইউ সালমান মুক্তাদিরের ব্যাংক হিসাব তলব করেছে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত