কুমিল্লা আমার জন্মভূমি, আমার জন্মভিটা। আমার কৈশোর কেটেছে এই মাটিতে। তাই কুমিল্লা আমার কাছে শুধু একটি জেলা নয়, এটি আমার আবেগ, স্মৃতি ও আত্মপরিচয়ের অংশ। কুমিল্লার গৌরব আমাকে যেমন বিমোহিত করে, তেমনি এই জনপদের কোনো কলঙ্ক আমাকে কাঁদায়। কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্যে কুমিল্লার যে ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তা একজন কুমিল্লার সন্তান হিসেবে আমাকে গভীরভাবে ব্যথিত করে। কুমিল্লার ইতিহাসের দিকে তাকালে প্রথমেই আসে ময়নামতি। শালবন বিহার ৭ম শতকের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৌদ্ধবিহার ও জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র, যেখানে দীক্ষা নিয়েছিল বহু জ্ঞানপিপাসু তরুণ ও কিশোর। এটি অক্সফোর্ড বা কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো আধুনিক অর্থে বিশ্ববিদ্যালয় ছিল না, কিন্তু জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে শালবন বিহার বা ময়নামতির গুরুত্ব অনস্বীকার্য। অক্সফোর্ডের নিজস্ব ইতিহাস অনুযায়ী সেখানে ১০৯৬ সালের মধ্যে শিক্ষাদানের প্রমাণ রয়েছে; কেমব্রিজের ক্ষেত্রে ১২০৯ সালে অক্সফোর্ড থেকে আগত পণ্ডিতদের মাধ্যমে এর প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশ শুরু হয়। অর্থাৎ ইউরোপের এই দুই বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু শতাব্দী আগে কুমিল্লার মাটিতে একটি বৃহৎ বৌদ্ধ আবাসিক শিক্ষাকেন্দ্র গড়ে উঠেছিল। ময়নামতির বিহারগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় এই ভূখণ্ড একসময় জ্ঞান, দর্শন, ধর্ম ও সংস্কৃতির আন্তর্জাতিক যোগাযোগের অংশ ছিল। দূরদূরান্ত থেকে ভিক্ষু ও শিক্ষার্থীদের আগমন এই অঞ্চলের বিস্তৃত বৌদ্ধ জ্ঞানজগতের সঙ্গে সংযোগের সাক্ষ্য বহন করে।
কুমিল্লার গৌরব শুধু প্রাচীন ইতিহাসে সীমাবদ্ধ নয়। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনেও এই জনপদ অসাধারণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। শান্তি ঘোষ, সুনীতি চৌধুরী ও প্রফুল্লনলিনী ব্রহ্ম এই তিন কিশোরীর নাম সেই ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। ১৯৩১ সালে শান্তি ঘোষ ও সুনীতি চৌধুরী তৎকালীন কুমিল্লার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সি. জি. বি. স্টিভেন্সকে গুলি করে হত্যা করেন। তারা ছিলেন কিশোর/কিশোরী শিক্ষার্থী। ঔপনিবেশিক ভারতের রাজনৈতিক বাস্তবতা ও বিপ্লবী আন্দোলনের প্রভাবে তারা এ কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়েছিলেন। কুমিল্লার আরেক গৌরবময় সন্তান মেজর আবদুল গনি। ১৯৪৮ সালে তার উদ্যোগ ও নেতৃত্বে বাঙালি সৈনিকদের নিয়ে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ভিত্তি স্থাপিত হয়। কুমিল্লা থেকে তখন বহু তরুণ ও যুবক মেজর গনির হাত ধরে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে যোগ দেয়। পরবর্তীকালে এই রেজিমেন্ট বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে গৌরবময় ভূমিকা পালন করে এবং স্বাধীন বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর অন্যতম ভিত্তি গড়ে তোলে। মেজর গনির জন্ম কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়ায়। কুমিল্লার সন্তান শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত পাকিস্তানের গণপরিষদে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি উত্থাপন করে ভাষার অধিকার প্রশ্নকে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে নিয়ে আসেন। আর কুমিল্লায় বেড়ে ওঠা শিব নারায়ণ দাস বাংলাদেশের প্রথম দিকের জাতীয় পতাকার নকশা প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও কুমিল্লার গুরুত্ব অসামান্য। দেশের বৃহত্তম বন্দর চট্টগ্রাম থেকে রাজধানী ঢাকা এবং দেশের অন্যান্য অঞ্চলে বিপুল পরিমাণ পণ্য পরিবহনের প্রধান সড়কপথের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ কুমিল্লার মধ্য দিয়ে গেছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ককে বাংলাদেশের বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘লাইফলাইন’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে; এই করিডরে বিঘ্ন ঘটলে দেশের বাণিজ্য ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব পড়ে। এই বাস্তবতায় রূপক অর্থে কুমিল্লাকে বাংলাদেশের অর্থনীতির ‘হরমুজ প্রণালি’ বলা যেতে পারে। হরমুজ প্রণালি যেমন বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকটবিন্দু, তেমনি কুমিল্লার ওপর দিয়ে চলা ঢাকা-চট্টগ্রাম যোগাযোগব্যবস্থা দেশের বন্দরনির্ভর পণ্য ও সরবরাহ শৃঙ্খলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি শুধু কুমিল্লার স্থানীয় গুরুত্ব নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জাতীয় অর্থনীতির স্বার্থ। প্রবাস থেকে বৈদেশিক মুদ্রা প্রেরণের ক্ষেত্রেও কুমিল্লার তরুণ ও যুবকরা শীর্ষে থাকে। এমন একটি ঐতিহ্যবাহী জনপদ আজ কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্যে কলঙ্কিত হবে এটি কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। কুমিল্লার কিশোর অপ্রতিম অকালে কিশোরদের হাতে প্রাণ হারাবে, ইটা মেনে নেওয়া কঠিন। কিশোর গ্যাংকে শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর সঙ্গে পরিবার, শিক্ষা, মাদক, সামাজিক অবক্ষয়, প্রযুক্তির অপব্যবহার, অপরাধীদের প্রভাব এবং কখনো কখনো রাজনৈতিক ছত্রছায়ার অভিযোগ সবকিছুর সম্পর্ক থাকতে পারে। এ প্রসঙ্গে ২০০১ সালে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্র ও ছাত্রলীগ নেতা ওবায়দুল হক ওরফে দুলাল হত্যাকাণ্ডের কথা মনে পড়ে। সমসাময়িক সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, দীর্ঘ সময়েও মামলাটির নিষ্পত্তি হয়নি; পরবর্তী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পর্যাপ্ত সাক্ষ্য না পাওয়ায় মামলার আসামিরা খালাস পান। একটি হত্যাকাণ্ডের বিচার না হওয়ায় কিশোরদের সামনে যদি এমন ধারণা তৈরি হয় যে, প্রভাবশালী অপরাধী শেষ পর্যন্ত আইনের আওতার বাইরে থেকে যেতে পারে, তাহলে তা আইনের শাসনের প্রতি আস্থা দুর্বল করে। তাই দুলাল হত্যাকাণ্ডের মতো পুরনো ঘটনাগুলোর ইতিহাসও আমাদের নতুন করে স্মরণ করা দরকার। তবে এও উল্লেখ্য, শুধু কুমিল্লাই নয়, রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন নগরে-শহরে এমন কি উপজেলা পর্যন্ত কিশোর গ্যাংয়ের দাপটে জনপদ থরথরের অনেক চিত্রই ইতিমধ্যে সংবাদমাধ্যমে কম উঠে আসেনি। কিশোর গ্যাংয়ের মূলোৎপাটনে নজর দিতে হবে উৎসে। এই পরিস্থিতি এক দিনে সৃষ্ট নয়। এই বিপথগামীদের ‘বড় ভাই’ কিংবা ‘পালিত পিতাদের’ সন্ধান করে দ্রুত আনতে হবে আইনের আওতায়। দরকার রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও যথাযথ প্রতিবিধানে দায়িত্বশীলদের নির্মোহ অবস্থান।
একটি শহরের দেয়ালে যখন কিশোর গ্যাংয়ের নাম লেখা থাকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যখন অস্ত্র হাতে মহড়ার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে, আর সন্ধ্যার পর কোনো কোনো এলাকায় অভিভাবকরা সন্তানকে বাইরে যেতে দিতে ভয় পান তখন সেটিকে আর নিছক কিশোরদের দুষ্টুমি বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। এটি আইনশৃঙ্খলা, পরিবার, শিক্ষা, সামাজিক মূল্যবোধ এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার সম্মিলিত সংকেত। স্থানীয় বাসিন্দা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালের দিকে নগরে বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে। তখন তিন-চারটি দল সক্রিয় ছিল। ২০২২ সালের দিকে আলোচিত দলের সংখ্যা অন্তত ২০টিতে পৌঁছায়। সাম্প্রতিক অনুসন্ধানেও নগরে অন্তত ২০টি গ্যাং সক্রিয় থাকার কথা উঠে এসেছে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এটি এখন কেবল মারামারি বা দলাদলির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। হত্যা, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক, অস্ত্রের ব্যবহার এবং আধিপত্য বিস্তারের মতো গুরুতর অপরাধের সঙ্গে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের নাম বিভিন্ন ঘটনায় এসেছে। ২০২৬ সালের প্রথম সাড়ে আট মাসে কুমিল্লায় অন্তত ২৫টি আলোচিত অপরাধের ঘটনায় গ্যাং সদস্যদের নাম আসার কথা সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে বলা হয়েছে। ২০১৭ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে অন্তত ১২টি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গেও তাদের সম্পৃক্ততার তথ্য উঠে এসেছে।
কিশোর গ্যাং কোনো শূন্যস্থান থেকে জন্ম নেয় না। একটি কিশোর যখন পরিবার, বিদ্যালয়, খেলাধুলা ও সুস্থ সামাজিক পরিবেশের বাইরে গিয়ে একটি গ্যাংয়ের মধ্যে নিজের পরিচয় খুঁজে পায়, তখন বুঝতে হবে কোথাও একটি সামাজিক শূন্যতা তৈরি হয়েছে। গ্যাং তাকে দেয় বন্ধুত্ব, পরিচয়, ক্ষমতার অনুভূতি, উত্তেজনা এবং কখনো অর্থনৈতিক সুবিধা। বিপরীতে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যদি তাকে দিতে না পারে সময়, স্বীকৃতি, নেতৃত্বের সুযোগ এবং ভবিষ্যতের স্পষ্ট পথ, তাহলে গ্যাং-ভিত্তিক পরিচয় তার কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই প্রক্রিয়াকে আরও দৃশ্যমান করেছে। কুমিল্লার সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘোষণা দিয়ে মহড়া, দলীয় পরিচয় এবং অস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনাও উঠে এসেছে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ভুলে গেলে চলবে না যে, একজন অপরাধপ্রবণ কিশোর কখনো অপরাধী হয়ে জন্মায় না। পরিবেশ তাকে অনেক সময় সেই পথে ঠেলে দেয়। তাই এই সমস্যার সমাধান কেবল পুলিশের হাতে নয়, সরকারের হাতেও এককভাবে নয়। অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে। সন্তান কার সঙ্গে মিশছে, কোথায় যাচ্ছে, কী করছে এসব বিষয়ে নজর রাখতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে শুধু পরীক্ষার ফল নয়; মূল্যবোধ, নেতৃত্ব ও সামাজিক দায়বদ্ধতার শিক্ষা দিতে হবে। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অপরাধের বিরুদ্ধে দ্রুত, নিরপেক্ষ ও আইনসম্মত ব্যবস্থা নিতে হবে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো নৈতিক শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধ জাগিয়ে তুলতে পারে। আর সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া সংগঠনগুলোকে কিশোরদের জন্য সৃজনশীল ক্ষেত্র তৈরি করতে হবে। একজন কিশোরের হাতে অস্ত্রের বদলে যদি আমরা বই তুলে দিতে পারি, মাদকের বদলে খেলাধুলার সুযোগ দিতে পারি, অপরাধী চক্রের বদলে সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত করতে পারি তাহলেই পরিবর্তন সম্ভব।
ময়নামতির জ্ঞানচর্চা, শান্তি-সুনীতির ইতিহাস, মেজর গনির সামরিক ঐতিহ্য, ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের ভাষার অধিকার, শিব নারায়ণ দাসের জাতীয় পতাকার সঙ্গে সম্পৃক্ততা এবং প্রবাসীদের অর্থনৈতিক অবদান সব মিলিয়ে কুমিল্লা বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি অনন্য জনপদ। এই কুমিল্লার ভবিষ্যৎ কিশোর গ্যাংয়ের হাতে ছেড়ে দেওয়া যায় না। কুমিল্লার সন্তান হিসেবে আমার প্রত্যাশা আমরা এমন একটি কুমিল্লা গড়ে তুলব, যেখানে কিশোরের পরিচয় হবে তার মেধা, সৃজনশীলতা, ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও মানবিকতায়; অপরাধ ও সহিংসতায় নয়। কুমিল্লার গৌরব অক্ষুণœ থাকুক এটাই আমাদের সবার কামনা।
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত মেজর এবং গবেষক ও বিশ্লেষক
directordmin 2007 @gmail. com