গোখাদ্যে আগুন, লোকসানে খামারিরা

আপডেট : ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৪৯ এএম

গোখাদ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং দুধের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় চরম লোকসানে পড়েছেন পাবনার গবাদিপশু খামারিরা। খামার টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা। বাজারে গম, ভূষি, ভুট্টা ও খৈলের দাম বাড়লেও দুধের বাজারদর অনেক কম। ফলে উৎপাদন খরচই উঠছে না, বাধ্য হয়ে অনেকে পশুর সংখ্যা কমাচ্ছেন। এর মধ্যে চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, ফরিদপুরসহ চলনবিল ও পাবনার বিভিন্ন চরাঞ্চলের নিচু জমি প্লাবিত হওয়ায় বিস্তীর্ণ ঘাসের ক্ষেত পানির নিচে তলিয়ে গেছে। দেখা দিয়েছে কাঁচা ঘাসের তীব্র সংকট। খড় ও শুকনো খাবারের বাড়তি খরচ মেটাতে খামারিরা হিমশিম খাচ্ছেন। ডেইরি শিল্প রক্ষায় দুধের ন্যায্যমূল্য নির্ধারণ, গো-খাদ্যে ভর্তুকি এবং বন্যাদুর্গত এলাকায় সরকারি পশুখাদ্য সহায়তার জরুরি দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্যমতে, ফরিদপুর উপজেলার ১৫০০-১৬০০ খামারের মধ্যে ৬০ শতাংশই বর্ষায় কাঁচাঘাসের তীব্র সংকটে ভোগে। তথ্য মতে, জেলায় নিবন্ধিত ৪ হাজার ৮৭৪ ও অনিবন্ধিত ৪ হাজার ৭৯১টি দুগ্ধ উৎপাদনকারী খামার রয়েছে। এসব খামার থেকে বছরে ৩ দশমিক ৪ লাখ টন দুধ উৎপাদন হয়ে থাকে।

সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, পাবনার চাটমোহর উপজেলার হান্ডিয়াল জয়ঘর গ্রামে তীব্র গো-খাদ্য সংকটে পড়েছেন খামারিরা। বর্ষায় মাঠের ঘাস পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় বিকল্প হিসেবে তারা বিল থেকে কচুরিপানা তুলে গরুকে খাওয়াচ্ছেন। বাজারে প্রতি মণ খড় বিক্রি হচ্ছে চড়া দামে, প্রায় ৮০০ টাকায়। খামারিদের অভিযোগ, গোখাদ্যের আকাশছোঁয়া দাম ও বাজারে ভেজাল দুধের আধিক্যের কারণে দুধ উৎপাদনের ব্যয় দ্বিগুণ বেড়েছে।

পাটিয়াতা গ্রামের ডেইরি খামারি মনিরুল ইসলাম জানান, একটি গাভীর পেছনে প্রতিদিন ১০০-১৫০ টাকা খরচ হয়। প্রতি লিটার দুধ উৎপাদনে ৪৫-৫০ টাকা খরচ হলেও দুগ্ধ সংগ্রহ কেন্দ্রগুলোতে ফ্যাট অনুযায়ী দাম মিলছে মাত্র ৫৫-৬০ টাকা। লিটারপ্রতি নামমাত্র ৫-১০ টাকা লাভে সংসার চালানো তো দূরের কথা, পকেট থেকে টাকা দিয়ে খামার টিকিয়ে রাখতে হচ্ছে। ব্যয় সামলাতে না পেরে অনেক খামারি ইতিমধ্যে তাদের গবাদিপশু বিক্রি করে দিয়েছেন। পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে চাটমোহরের সম্ভাবনাময় দুগ্ধ শিল্প ও খামারগুলো পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন স্থানীয় খামারিরা।

বেড়া উপজেলার চর নাকালিয়া গ্রামের ডেইরি খামারি ইব্রাহিম জানান, তার খামারে মোট সাতটি গাভি রয়েছে। তবে বর্তমানে দুধ দিচ্ছে ৪টি গাভি। কাঁচা ঘাসের সময় ৫০ লিটার হলেও এখন শুকনো খড়ে দুধ মিলছে ২০-২২ লিটার। ৪ বিঘা জমিতে ঘাস আবাদ করে খামার চলতো তার। সেগুলো বর্ষা ও টানা বৃষ্টিতে ডুবে গেছে। ফলে দুধ উৎপাদনও কমে গেছে। তিনি বলেন, একটি ফ্রিজিয়ান জাতের গাভি দুই বেলায় ২০-২২ লিটার দুধ দিত। কাঁচা ঘাস না থাকায় সেই গাভি এখন ৭-১০ লিটারের বেশি দুধ দেয় না। তিনি আরও বলেন, বর্ষার তিনমাস বাদে এই গাভিটি দিনে ৫০০ টাকার মতো খেলে দুধ দিত হাজার টাকার। এখন খাওয়ায় খরচ বাড়লেও দুধ পাচ্ছি চার থেকে সাড়ে চারশো টাকার। তাতে বছরের অন্য সময়ে খরচ উঠলেও এখন লোকসান।

চাটমোহরের গোখাদ্য ব্যবসায়ী সজীব জানান, ১৫ দিনের ব্যবধানে বস্তা প্রতি ভূষির দাম বেড়েছে এক থেকে দেড়শো টাকা। এছাড়াও আগে বস্তা প্রতি নারিশ ফিডের দাম ছিল ৩৩০০ টাকা বর্তমানে দাম বেড়ে হয়েছে ৩৬০০ টাকা। আগে খৈলের দাম ছিল ১৪০০ থেকে ১৫০০ টাকা, বর্তমানে বস্তা প্রতি দাম হয়েছে ১৯০০-২০০০ হাজার টাকা। এ ছাড়া ভুট্টাসহ অন্যান্য গোখাদ্যর দাম বেড়েছে বলে জানান তিনি।

ফরিদপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. নুরুজ্জামান জানান, উপজেলার খামারগুলো থেকে প্রতিদিন ৩-৪ হাজার লিটার দুধ উৎপাদন হয়। কিন্তু বর্ষায় হাজার থেকে বারোশো লিটারের মতো কম হয়। কাঁচা ঘাস না থাকায় দানাদার খাবারে খামারিরা জোর দেন। ফলে তাদের প্রায় ৩০ শতাংশ খরচ বেড়ে যায়। তবে এই মৌসুমে লাভ না হলেও তেমন লোকসান হয় না তাদের। এদিকে কাঁচা ঘাসের সংকটে দুধ উৎপাদন কমে যাওয়ায় সরবরাহ ঘাটতি দেখা দেয় প্রক্রিয়াজাতকারী পাবনা জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আবু তালেব প্রাং খামারিদের ঘাস চাষের পরামর্শ দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, বর্ষাকালীন সংকট মেটাতে আগে থেকেই সাইলেজ পদ্ধতিতে ঘাস সংরক্ষণ এবং পানিতে জন্মানো জার্মান ঘাস চাষের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া, গো-খাদ্যের দাম বাড়ায় খামারিদের আর্থিক ক্ষতি পুষিয়ে নিতে করোনাকালের মতো সরকারি প্রণোদনা দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করি ।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত