পর্যটকশূন্য ছেঁড়া দ্বীপে কীভাবে এত বর্জ্য

আপডেট : ১০ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৩২ এএম

পর্যটন মৌসুম শুরু না হতেই দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনের সর্বদক্ষিণের ছেঁড়া দ্বীপের সমুদ্রসৈকতে ভেসে এসেছে বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্য। দ্বীপে পর্যটক না থাকার পরও বিশাল পরিমাণ বর্জ্য জমা হওয়ায় পরিবেশবিদ ও স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে বিষয়টি ছড়িয়ে পড়লে তা দ্রুত প্রশাসনের নজরে আসে। এরই ধারাবাহিকতায় গত বৃহস্পতিবার ব্র্যাকের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও রিসাইক্লিং প্রকল্পের উদ্যোগে স্থানীয় বাসিন্দাদের সহায়তায় ছেঁড়া দ্বীপে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানো হয়। অভিযানে বোতল, প্লাস্টিক প্যাকেট ও পলিথিনসহ প্রায় ২৮৬ কেজি অপচনশীল প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ করা হয়।

সংগৃহীত বর্জ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এসব প্লাস্টিকসামগ্রী ও কোমল পানীয়ের বোতলের লেবেলে মিয়ানমার এবং থাইল্যান্ডের ভাষা ও লোগো রয়েছে। সমুদ্রের প্রবল স্রোত ও মৌসুমি বায়ুর কারণে প্রতিবেশী দেশগুলোর এই আন্তঃসীমান্ত বর্জ্য ভেসে এসে প্রবাল দ্বীপের জীববৈচিত্র্যকে হুমকির মুখে ফেলছে।

স্থানীয় পরিবেশকর্মী ও গ্রিন সেভার্সের প্রতিনিধি আব্দুল আজিজ বলেন, ‘ছেঁড়া দ্বীপের নীল জল আর সাদা পাথর এখন প্লাস্টিকের চাদরে ঢাকা পড়ছে। পরিচ্ছন্নতাকালে প্রবালের খাঁজে খাঁজে প্লাস্টিকের বোতল ও ছেঁড়া জাল আটকে থাকতে দেখেছি। পর্যটকরা না থাকলেও সাগরের স্রোত প্রতিদিন এই বর্জ্য দ্বীপে বয়ে নিয়ে আসছে। ব্র্যাকের এ উদ্যোগ সাময়িকভাবে সৈকতকে পরিষ্কার করেছে ঠিকই, কিন্তু স্থায়ী সমাধান না হলে এই প্রবাল দ্বীপটিকে বাঁচানো কঠিন হয়ে যাবে। কেবল প্রসাশন বা বেসরকারি সংস্থার ওপর ভরসা না করে নিজেদের দায়িত্ব মনে করে স্থানীয়দের পাহারাদারের ভূমিকা পালন এবং প্লাস্টিক বর্জ্য সাগরে ফেলা সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে।’

সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম বলেন, ‘ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে সবসময় দ্বীপ পরিচ্ছন্ন রাখার চেষ্টা করি। পর্যটন মৌসুম ছাড়াও এভাবে টন টন প্লাস্টিক সাগরের ঢেউয়ের সঙ্গে আমাদের সৈকতে আছড়ে পড়ছে। ছেঁড়া দ্বীপের মতো সংবেদনশীল এলাকায় এ প্লাস্টিক দূষণ বন্ধ না হলে প্রবাল ধ্বংস হয়ে যাবে। ব্র্যাকের কর্মীরা স্থানীয় তরুণদের সঙ্গে নিয়ে যে ২৮৬ কেজি বর্জ্য সরিয়েছে, এটি দ্বীপের জন্য বড় স্বস্তি। ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে ব্র্যাকের এই প্রকল্পকে সব ধরনের সহযোগিতা এবং দ্বীপের চারপাশ পরিষ্কার রাখতে তদারকি বাড়ানো হচ্ছে।

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এসএম অনীক চৌধুরী বলেন, পর্যটক না থাকা সত্ত্বেও ছেঁড়া ॥দ্বীপে বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্য জমে থাকার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, এগুলো প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডের সমুদ্র উপকূল থেকে স্রোতের টানে ভেসে এসেছে। সেন্টমার্টিন ও ছেঁড়া দ্বীপের প্রবাল এবং সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা আমাদের জাতীয় দায়িত্ব। ব্র্যাকের এই পরিচ্ছন্নতা অভিযান অত্যন্ত প্রশংসনীয়। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমরা দ্বীপে প্লাস্টিক ব্যবহার বন্ধ এবং বর্জ্য অপসারণে কড়াকড়ি আরোপ করছি। তবে আন্তর্জাতিক জলসীমার দূষণ রোধে আরও দীর্ঘমেয়াদি এবং সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

কক্সবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা বলেন, প্লাস্টিকের বোতল ও প্যাকেটের লেবেল দেখে নিশ্চিত হওয়া গেছে, এগুলো মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডের। স্থানীয় পর্যায়ে পর্যটন সীমিত এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন করলেও সমুদ্রের ওপার থেকে আসা এই বর্জ্য দ্বীপকে ঝুঁকিতে ফেলছে। সৈকতে এত বর্জ্য আসা মানে সমুদ্রের তলদেশেও প্লাস্টিক জমা হচ্ছে, যা প্রবালের মারাত্মক ক্ষতি করবে। এ আন্তঃসীমান্ত সামুদ্রিক দূষণ মোকাবিলায় এখন আন্তর্জাতিক নীতিমালার আলোকে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

ব্র্যাকের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মসূচির সমন্বয়ক মোহাম্মদ রফিক জানান, ছেঁড়া দ্বীপের বর্জ্যরে খবর পাওয়ার পরপরই আমাদের টিম মাঠে নামে। ২৮৬ কেজি প্লাস্টিক বর্জ্য যাতে পুনরায় সাগরে বা মাটিতে না মেশে, সে জন্য এগুলোকে মূল ভূখন্ডে নিয়ে এসে যথাযথ বৈজ্ঞানিক উপায়ে রিসাইক্লিং করা হবে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ব্র্যাকের এই উদ্যোগ স্থানীয় প্রশাসন ও সাধারণ মানুষের সহায়তায় আগামীতেও চলমান থাকবে।

পরিবেশবাদীদের মতে, স্রোতের কারণে ঘটে যাওয়া এই দূষণ ঠেকাতে কেবল স্থানীয় সচেতনতাই যথেষ্ট নয়। সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এবং আন্তর্জাতিক পরিম-লে পরিবেশ কূটনীতি জোরদার করে সমুদ্রের প্লাস্টিক দূষণ বন্ধে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা করা এখন সময়ের দাবি।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত