খাদ্যের সংকট অনেক সময় গুদামে নয়, শুরু হয় জ্বালানি, সার, বাণিজ্য ও আবহাওয়ার বাজারে। ২০২৬ সালের ঘটনাপ্রবাহ বাংলাদেশের জন্য সেই পুরনো সতর্কবার্তাই নতুন করে সামনে এনেছে। ইতিহাসের একটি অস্বস্তিকর শিক্ষা আছে : বড় খাদ্য সংকট অনেক সময় খাদ্যের অভাব দিয়ে শুরু হয় না। শুরু হয় জ্বালানি, সার, যুদ্ধ, পরিবহনব্যবস্থা কিংবা আবহাওয়ার ধাক্কা দিয়ে। ২০২৬ সালের ঘটনাপ্রবাহ সেই পুরনো শৃঙ্খলকেই আবার সামনে এনেছে। ফেব্রুয়ারির শেষে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার পর হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল হয়ে পড়ে। এই জলপথ দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও এলএনজি বাণিজ্য এবং বৈশ্বিক ইউরিয়া রপ্তানির বড় অংশ চলাচল করে। সালফারেরও প্রায় অর্ধেক সমুদ্রবাণিজ্য এই পথের সঙ্গে যুক্ত। ফলে হরমুজে নিরাপত্তা সংকট মানে শুধু জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি নয়; কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তা কৃষকের উৎপাদন ব্যয়েও পৌঁছে যেতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, মার্চ ২০২৬-এ ইউরিয়ার গড় দাম আগের মাসের তুলনায় ৫৩ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে টনপ্রতি ৭২৫ ডলারে পৌঁছায়। এপ্রিলে তা ৮৫০ ডলারের ওপরে ওঠে। বিশ্বব্যাংক এ বছর সার মূল্যসূচক ৩০ শতাংশের বেশি বাড়ার আশঙ্কা করেছে। খাদ্যবাজারে চাপের আগেই কৃষি উপকরণের বাজারে সতর্ক সংকেত জ¦লেছে। নতুন একটি ভূরাজনৈতিক সংকেতও যুক্ত হয়েছে। ১ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্র তৃতীয় বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস থিওডোর রুজভেল্টের ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ এবং ইউএসএস মার্কিন আইল্যান্ডের নেতৃত্বাধীন উভচর বাহিনী মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন ও ইউএসএস জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশের সঙ্গে এটি যোগ হলে অক্টোবরের শেষ দিকে অঞ্চলটিতে তিনটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরি থাকতে পারে। এটিকে ‘তিনটি বৃহত্তম যুদ্ধজাহাজ পারস্য উপসাগরের দিকে যাচ্ছে’ বলা ঠিক হবে না; বরং যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক সক্ষমতা দ্রুত বাড়াচ্ছে। সংঘাত নতুন করে তীব্র হলে হরমুজে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল, বীমা প্রিমিয়াম, জাহাজ ভাড়া এবং তেল, এলএনজি ও সারের সরবরাহ আবার চাপের মুখে পড়তে পারে। এই প্রবণতা নতুন নয়। ১৯৭৩-’৭৪ সালের তেল ও খাদ্য সংকট দেখিয়েছিল, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, সারের ব্যয়, খারাপ আবহাওয়া ও কম আন্তর্জাতিক মজুদ একসঙ্গে হলে কৃষি উৎপাদন ও খাদ্যমূল্য দ্রুত চাপে পড়ে। বাংলাদেশের ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষও ছিল বহুমাত্রিক বন্যা, বাজার ও বণ্টনব্যবস্থার ব্যর্থতা, দরিদ্র মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হারানো এবং আন্তর্জাতিক খাদ্য ও জ্বালানি সংকট সবকিছু মিলেই পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়েছিল। ২০০৭-০৮ সাল আরও গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। তখন বিশ্বে খাদ্য ছিল। ২০০৭ সালে বিশ্বে রেকর্ড পরিমাণ শস্য উৎপাদিত হয়েছিল। তবু একের পর এক রপ্তানিকারক দেশ চালসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের রপ্তানি সীমিত করায় আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ সংকুচিত হয়। এফএও নিজেই পরে লিখেছে, রেকর্ড ফসল থাকা সত্ত্বেও ২০০৭ সালে আন্তর্জাতিক দাম বেড়েছিল এবং বহু দেশ তীব্র খাদ্য সংকটে পড়েছিল। অর্থাৎ পর্যাপ্ত উৎপাদন মানেই সবার কাছে খাদ্য পৌঁছানো নয়।
২০২২ সালের ইউক্রেন যুদ্ধ একই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করেছে। বিশ্বব্যাংক সে সময় বলেছিল, পৃথিবীতে সামগ্রিকভাবে গমের অভাব ছিল না; সমস্যা ছিল কৃষ্ণসাগরের বন্দর বন্ধ হওয়া, পরিবহন ও বীমা ব্যয় বৃদ্ধি এবং রাশিয়া-ইউক্রেননির্ভর আমদানিকারক দেশগুলোর হঠাৎ বিকল্প উৎস খুঁজতে বাধ্য হওয়া। বাংলাদেশও ঝুঁকিতে ছিল : বিশ্বব্যাংকের হিসাবে তখন প্রায় ৪০ লাখ টন গম আমদানির প্রয়োজনের বড় অংশ রাশিয়া ও ইউক্রেননির্ভর ছিল। যুদ্ধের পর গম ও ভোজ্যতেলের দাম বাড়ে আর দরিদ্র ও আমদানিনির্ভর দেশগুলোর খাদ্য আমদানি ব্যয় দ্রুত বাড়ে। খাদ্য উৎপাদন একেবারে ভেঙে না পড়লেও যুদ্ধ ও সরবরাহ ব্যবস্থার ব্যাঘাত কীভাবে খাদ্যনিরাপত্তাকে দুর্বল করে এই ইতিহাস পূর্বাভাস পড়ার ক্ষেত্রেও সতর্ক করে। এফএওর পূর্বাভাস গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু পূর্বাভাস নিশ্চিত ভবিষ্যৎ নয়। জুন ২০১২-তে সংস্থাটি ধারণা করেছিল, বিশ্ব শস্য উৎপাদন ২৪১ কোটি ৯০ লাখ টনের নতুন রেকর্ড করবে, ব্যবহারকে ছাড়িয়ে যাবে এবং মজুদ বাড়াবে। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের খরা সেই হিসাব বদলে দেয়। জুলাইয়ে এফএও পূর্বাভাস ২ কোটি ৩০ লাখ টন কমায়; অক্টোবর নাগাদ হিসাব নেমে আসে প্রায় ২২৮ কোটি ৬০ লাখ টনে এবং আগের বছরের রেকর্ডের তুলনায় উৎপাদন কমার কথা নিশ্চিত করা হয়। একটি বড় ধাক্কা কয়েক মাসেই আশাবাদী পূর্বাভাস পাল্টে দিতে পারে। এই ব্যবধানই বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য মূল ঝুঁকি : গুদামে খাদ্য থাকতে পারে, কিন্তু যুদ্ধের সময় দাম, পরিবহন ও বৈদেশিক মুদ্রার চাপ সেটিকে নাগালের বাইরে ঠেলে দিতে পারে। তাই ২০২৬ সালের উৎপাদন পূর্বাভাস স্বস্তির হলেও নিশ্চয়তা নয়। এফএওর হিসাবে এ বছর বিশ্বে মোট শস্য উৎপাদন প্রায় ২৯৮ কোটি টন হতে পারে।
এফএও ২০২৬ সালে বিশ্ব গম উৎপাদন আগের বছরের তুলনায় ৩ দশমিক ৮ শতাংশ কমার পূর্বাভাস দিয়েছে। একই সঙ্গে এল নিনো এখন আর কেবল সম্ভাবনা নয়; বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা বলছে, এটি প্রতিষ্ঠিত এবং ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত স্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শতভাগ। খরা, অতিবৃষ্টি কিংবা অস্বাভাবিক তাপমাত্রা শস্য উৎপাদনের জন্য এই অনিশ্চয়তা বড় ঝুঁকি।
বাংলাদেশের জন্য সমস্যাটি আরও সংবেদনশীল। দেশে বছরে প্রায় ৬৬ লাখ টন রাসায়নিক সার ব্যবহার হয় এবং চাহিদার ৮৫ শতাংশের বেশি আমদানিনির্ভর। ধান দেশের মোট ক্যালরি গ্রহণের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ জোগায় এবং কৃষিতে ব্যবহৃত সারের বড় অংশও ধান উৎপাদনে যায়। ফলে আন্তর্জাতিক সারের বাজারে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা শেষ পর্যন্ত খাদ্য উৎপাদন ও ভোক্তার ব্যয়ের ওপর প্রভাব ফেলবে। জলবায়ু ঝুঁকিও এই চাপ বাড়ায়। আকস্মিক বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলাবদ্ধতা কিংবা উপকূলীয় লবণাক্ততা প্রতি বছরই কোনো না কোনো অঞ্চলের ফসল ক্ষতিগ্রস্ত করে। আন্তর্জাতিক বাজারে সার ব্যয়বহুল হওয়ার একই বছরে আমন বা বোরো মৌসুমে বড় আবহাওয়াজনিত ধাক্কা এলে কৃষককে একই সঙ্গে বেশি উৎপাদন ব্যয় ও কম ফলনের ঝুঁকি নিতে হয়। অর্থাৎ খাদ্যনিরাপত্তা এখানে আমদানি, জ্বালানি ও জলবায়ু তিন ধরনের ঝুঁকির মিলিত ফল। ঝুঁকির আরেকটি স্তর জ্বালানি। প্রাকৃতিক গ্যাস আমাদের বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি ইউরিয়া তৈরিরও গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল। মার্চে গ্যাস সংকটের কারণে দেশের ছয়টি বড় ইউরিয়া কারখানার পাঁচটি বন্ধ রাখতে হয়। ২০২৫ সালে বাংলাদেশের প্রায় ৭০ লাখ টন এলএনজি আমদানির মধ্যে কাতার একাই দিয়েছিল প্রায় ৪১ লাখ টন, অর্থাৎ প্রায় ৬০ শতাংশ। হরমুজ সংকটে কাতারি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বাংলাদেশকে বেশি দামে বিকল্প উৎস খুঁজতে হয়েছে। জ্বালানিনিরাপত্তা ও খাদ্যনিরাপত্তাকে আলাদা করে দেখার সুযোগ তাই ক্রমেই কমছে। বাংলাদেশের সামনে প্রথম কাজ আগাম পরিকল্পনা।
বিশ্বব্যাংক জুনে ৩০ কোটি ডলারের জরুরি খাদ্যনিরাপত্তা প্রকল্প অনুমোদন করেছে, যার অর্থ দিয়ে আমন ও বোরো মৌসুমের জন্য ছয় লাখ টন গুরুত্বপূর্ণ সার আমদানি করা হবে। অর্থায়ন দ্রুত ক্রয় ও সরবরাহে পরিণত হলে কৃষকের অনিশ্চয়তা কমবে। একই সঙ্গে একাধিক দেশ ও অঞ্চল থেকে দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তি করে উৎস বহুমুখী করা জরুরি। দ্বিতীয় কাজ কৌশলগত মজুদ। খাদ্যশস্যের মতো সারের ক্ষেত্রেও ন্যূনতম নিরাপদ মজুদের একটি স্বচ্ছ নীতি থাকা উচিত কত দিনের চাহিদা ধরে মজুদ থাকবে, কখন তা ছাড়া হবে এবং কখন পুনরায় কেনা হবে, তা আগেই নির্ধারিত থাকা দরকার। তৃতীয়ত, মাটি পরীক্ষার ভিত্তিতে সুষম সার ব্যবহার বাড়াতে হবে। ইউরিয়ার অতিরিক্ত ব্যবহার কমাতে পারলে আমদানি ব্যয় ও মাটির ওপর চাপ দুটিই কমবে। চতুর্থ কাজ একটি কার্যকর আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা। আন্তর্জাতিক তেল, গ্যাস, সার, শস্য, জাহাজ ভাড়া, সামুদ্রিক বীমা, আবহাওয়া এবং প্রধান রপ্তানিকারক দেশের নীতিগত সিদ্ধান্ত একই ড্যাশবোর্ডে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব। কৃষি, খাদ্য, শিল্প ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তে এই ডেটা যুক্ত হলে কয়েক মাস পরের ঝুঁকি আজই দেখা যাবে। এফএওর উৎপাদন পূর্বাভাসও তখন একটি গুরুত্বপূর্ণ ইনপুট হবে, কিন্তু একমাত্র সিদ্ধান্তের ভিত্তি হবে না।
সবশেষে ২০০৮ সালের শিক্ষা মনে রাখতে হবে। আতঙ্কজনিত নীতি বাজারকে আরও অস্থির করে। রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা, অতিরিক্ত মজুদ কিংবা হঠাৎ ক্রয়চাপ আন্তর্জাতিক বাজারে ঘাটতির অনুভূতি বাড়ায়। খাদ্যনিরাপত্তা শুধু উৎপাদনের হিসাব নয়; এটি প্রবেশাধিকার, পরিবহন, অর্থায়ন ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতারও প্রশ্ন। সংঘাত আবার বড় আকার নিলে প্রথম ধাক্কা হয়তো তেলের বাজারে দেখা যাবে, কিন্তু তার ঢেউ পৌঁছাবে সার, পরিবহন ও খাদ্যে। বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের জন্য তাই সবচেয়ে নিরাপদ কৌশল হলো সংকট শুরু হওয়ার অপেক্ষা না করে আগেই ক্রয়, মজুদ, বিকল্প উৎস ও আগাম সতর্কতার ব্যবস্থা শক্ত করা। খাদ্যনিরাপত্তার প্রস্তুতির সময় সংকটের দিন নয়, এখনই।
লেখক : গ্র্যাজুয়েট রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট ফেলিসিয়ানো স্কুল অব বিজনেস মন্টক্লেয়ার স্টেট ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাষ্ট্র