বাংলাদেশ ও স্পেনের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত করার একটি সুযোগ রয়েছে। স্পেনের বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানির মাধ্যমে বাংলাদেশের যে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি হয়েছে, তার ভিত্তিতে দুই দেশের মধ্যে বিনিয়োগ, লজিস্টিকস ও প্রযুক্তি সহযোগিতার নতুন অধ্যায় সূচনা করা সম্ভব। ১২ অক্টোবর স্পেনের জাতীয় দিবস। এ উপলক্ষে স্পেনের জনগণ ও সরকারকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা। ফুটবলে স্পেনের সাফল্য দেশটিকে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি দিয়েছে। পাশাপাশি শিল্প, প্রযুক্তি, পর্যটন ও বাণিজ্যে দেশটির সক্ষমতা স্পেনকে বিশ্ব অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারে পরিণত করেছে। বাংলাদেশের জন্য স্পেন তাই কেবল একটি রপ্তানি গন্তব্য নয়, বরং বিনিয়োগ, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা এবং ইউরোপের বৃহত্তর বাজারে প্রবেশের একটি সম্ভাবনাময় অংশীদার। বাংলাদেশ ও স্পেনের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে বিদ্যমান। এ সময় দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কও উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে স্পেনে বাংলাদেশের রপ্তানি ছিল প্রায় ৩ দশমিক ৪৭৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেড়ে প্রায় ৩ দশমিক ৫৫৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এই বাণিজ্যের প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক খাত। তবে প্রবৃদ্ধি টেকসই করতে হলে রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনতে হবে এবং একটি খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে হবে। চামড়াজাত পণ্য, জুতা, পাটজাত পণ্য, গৃহসজ্জার বস্ত্র, হিমায়িত খাদ্য, সিরামিক, হালকা প্রকৌশলপণ্য এবং তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সেবায় বাংলাদেশের রপ্তানি সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। উন্নত পণ্যের নকশা, আন্তর্জাতিক মান ও সনদ অনুসরণ, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন এবং কার্যকর বিপণন কৌশল বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের স্পেনের বাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান তৈরি করতে সহায়তা করতে পারে।
স্পেনের আমদানি বাজারেও বাংলাদেশের জন্য রয়েছে ব্যাপক সম্ভাবনা। ২০২৫ সালে দেশটির পণ্য আমদানির পরিমাণ ছিল আনুমানিক ৫০২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই বিশাল বাজারের তুলনায় স্পেনে বাংলাদেশের রপ্তানির পরিমাণ এখনো সীমিত। চ্যালেঞ্জটি কেবল উৎপাদন বাড়ানো নয়, বরং সঠিক ক্রেতা চিহ্নিত করা, বাজারের চাহিদা বোঝা, পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়ানো এবং নির্ভরযোগ্য বিতরণব্যবস্থা গড়ে তোলা। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পরবর্তী পর্যায়ে রপ্তানির পাশাপাশি বিনিয়োগকেও গুরুত্ব দিতে হবে। নবায়নযোগ্য জ¦ালানি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, পর্যটন, তথ্যপ্রযুক্তি, অবকাঠামো এবং শিল্পসেবায় স্পেনের বিনিয়োগকারীদের জন্য বাংলাদেশে সম্ভাবনা রয়েছে। যৌথ বিনিয়োগের মাধ্যমে শুধু মূলধন নয়, আধুনিক প্রযুক্তি, ব্যবস্থাপনাগত দক্ষতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগও তৈরি হতে পারে। বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটি বড় অংশ চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে পরিচালিত হয়। ফলে বন্দরের দক্ষতা এবং পণ্য পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন জাতীয় অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বন্দর পরিচালনা, শিপিং, ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং, উড়োজাহাজে যাতায়াত ও পণ্য পরিবহন পরিচালনা, গুদামজাতকরণ, অভ্যন্তরীণ কনটেইনার ডিপো (আইসিডি), কোল্ড চেইন, লজিস্টিকস পার্ক এবং ডিজিটাল সরবরাহ ব্যবস্থার আধুনিকায়নে ব্যাপক সুযোগ রয়েছে।
স্পেনের প্রতিষ্ঠানগুলো এসব ক্ষেত্রে বিনিয়োগ ও কারিগরি দক্ষতা নিয়ে এগিয়ে আসতে পারে। স্বয়ংক্রিয় গুদামব্যবস্থা, ডিজিটাল কার্গো ট্র্যাকিং, আধুনিক আইসিডি এবং সমন্বিত পরিবহন ব্যবস্থা পণ্য খালাস ও পরিবহনে বিলম্ব কমাতে এবং পরিচালন ব্যয় হ্রাস করতে পারে। উন্নত কোল্ড চেইন অবকাঠামো পচনশীল পণ্য নিরাপদে পরিবহন এবং দূরবর্তী বাজারে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে সহায়ক হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থায় অংশগ্রহণ আরও শক্তিশালী হতে পারে। এ প্রেক্ষাপটে স্পেন-বাংলাদেশ এক্সপো ২০২৬ দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক গভীর করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। ২৬ অক্টোবর স্পেনের সেভিলে অনুষ্ঠেয় এ আয়োজনের লক্ষ্য দুই দেশের ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা, আমদানিকারক, রপ্তানিকারক ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে যোগাযোগ ও সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করা। স্পেন-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি আয়োজিত এ এক্সপো কেবল পণ্য প্রদর্শনীর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক সহযোগিতার কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠতে পারে। এক্সপোটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন এসবিসিসিআইর প্রেসিডেন্ট মুহাম্মদ আশিকুর রহমান। তার নেতৃত্বে এ আয়োজন দুই দেশের ব্যবসায়িক সম্পর্ককে আরও সুসংগঠিত ও ফলাফলমুখী করতে সহায়তা করতে পারে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ও সংসদ সদস্য শামা ওবায়েদ ইসলাম ২৬ অক্টোবর সেভিলে এক্সপোটির উদ্বোধন করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। সরকারি ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ দুই দেশের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদারের গুরুত্ব তুলে ধরবে। আন্দালুসিয়া অঞ্চলের সরকার ও ব্যবসায়ী মহলের প্রতিনিধিদের সম্পৃক্ততাও এ আয়োজনের গুরুত্ব বাড়াতে পারে।
তৈরি পোশাক, চামড়া, জুতা, পাটজাত পণ্য, খাদ্য, পর্যটন, প্রযুক্তি ও লজিস্টিকস খাতভিত্তিক বৈঠক সাধারণ আলোচনাকে সুনির্দিষ্ট বাণিজ্যিক উদ্যোগে রূপ দিতে পারে। তবে কোনো এক্সপোর সাফল্য কেবল দর্শনার্থী বা প্রদর্শক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। এক্সপো শেষ হওয়ার পরও নিয়মিত যোগাযোগ, পরবর্তী বৈঠক, প্রস্তাব মূল্যায়ন এবং অগ্রগতি পর্যালোচনা অব্যাহত রাখতে হবে। চেম্বার অব কমার্স, ব্যবসায়িক সংগঠন এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলো সমন্বিতভাবে এ কাজ এগিয়ে নিতে পারে। ব্যবসায়ী থেকে ব্যবসায়ী বৈঠক, বাজারবিষয়ক তথ্যবিনিময় এবং বিনিয়োগসংক্রান্ত অনুসন্ধানের জন্য সুস্পষ্ট যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলা বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অনিশ্চয়তা কমাতে পারে। বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদেরও ইউরোপীয় বাজারের প্রত্যাশা পূরণের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। স্পেনে বসবাসরত বাংলাদেশিরাও স্থানীয় বাজার সম্পর্কে জ্ঞান, ভাষাগত দক্ষতা এবং ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ক কাজে লাগিয়ে দুই দেশের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধ হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারেন। বাংলাদেশ–স্পেন সম্পর্কের ভবিষ্যৎ পারস্পরিক অর্থনৈতিক সুবিধার ভিত্তিতে গড়ে উঠতে হবে।
লেখক : সদস্য, স্পেন-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি। সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট, বিএএফএফ ও পরিচালক, বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশন