অন্যের বিপদে আনন্দিত হওয়ার ফল

আপডেট : ১২ অক্টোবর ২০২৬, ০১:০৯ এএম

অন্যের সুখে আনন্দিত হওয়া এবং বিপদে সহমর্মিতা প্রকাশ করা উত্তম গুণ। কেউ বিপদে পড়লে তার দুরবস্থা দেখে আনন্দিত হওয়া নিন্দনীয় স্বভাব। ইসলাম মানুষকে এমন মানসিকতা পরিহার করতে শিক্ষা দেয়। কারণ একজন মুমিনের হৃদয়ে অন্যের জন্য কল্যাণকামিতা, সহানুভূতি ও ভালোবাসা থাকা উচিত।

অন্যের বিপদে আনন্দিত হওয়ার মানসিকতা মানুষের হৃদয়কে সংকীর্ণ করে। এর পেছনে হিংসা, বিদ্বেষ, অহংকার কিংবা প্রতিশোধপরায়ণতা কাজ করে। কারও সঙ্গে ব্যক্তিগত বিরোধ থাকলে তার ব্যর্থতায় কেউ কেউ আনন্দিত হয়। আবার প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়া কাউকে বিপদে পড়তে দেখলে কেউ মনে মনে খুশি হয়। কেউ কেউ প্রকাশ্যেও কটূক্তি করে, পুরনো ভুল তুলে ধরে কিংবা তাকে অপমান করার চেষ্টা করে। এসব আচরণ মানুষের নৈতিক সৌন্দর্য নষ্ট করে এবং পারস্পরিক সম্পর্কের অবনতি ঘটায়।

মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে অন্যের প্রতি হিংসা ও বিদ্বেষ পোষণ না করার শিক্ষা দিয়েছেন। নবীজি (সা.)-ও এই বিষয়ে নানা নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘তোমরা একে অন্যের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করো না, একে অন্যের প্রতি হিংসা করো না এবং একে অন্যের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করো না। তোমরা আল্লাহর বান্দা হিসেবে পরস্পর ভাই ভাই হয়ে যাও।’ (সহিহ বুখারি ৬০৬৫)

এই হাদিসে মুসলমানদের পারস্পরিক সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তুলে ধরা হয়েছে। একজন মুসলমান অন্য মুসলমানের অকল্যাণ কামনা করবে না। তার ব্যর্থতা দেখে আনন্দিত হবে না। বরং তার বিপদে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবে। অন্যের প্রতি বিদ্বেষ ও হিংসা পোষণ করলে মানুষের অন্তর কলুষিত হয়। আর ভালোবাসা, ক্ষমা ও সহমর্মিতা মানুষের মধ্যে সৌহার্দ্য প্রতিষ্ঠা করে।

পবিত্র কোরআনে অন্যের বিপদে আনন্দিত হওয়ার প্রবণতা সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের কোনো কল্যাণ হলে তারা দুঃখিত হয়, আর তোমাদের কোনো অকল্যাণ হলে তারা আনন্দিত হয়। তোমরা যদি ধৈর্য ধারণ করো এবং তাকওয়া অবলম্বন করো, তবে তাদের ষড়যন্ত্র তোমাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। তারা যা করে, নিশ্চয়ই আল্লাহ তা পরিবেষ্টন করে আছেন।’ (সুরা আলে ইমরান ১২০)

আয়াতটিতে এমন এক মানসিকতার কথা বলা হয়েছে, যেখানে অন্যের কল্যাণে মন খারাপ হয় এবং অকল্যাণে আনন্দ জাগে। এই মনোভাব হিংসা ও বিদ্বেষের পরিচায়ক। একজন মুমিনের চরিত্র এর বিপরীত হওয়া জরুরি। অন্যের উন্নতি দেখে তার কল্যাণ কামনা করা এবং বিপদে পড়লে তার কষ্ট লাঘবের চেষ্টা করা ইমানি সৌন্দর্যের প্রকাশ।

রাসুলুল্লাহ (সা.) অন্যের বিপদে আনন্দিত হওয়া থেকে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেন, ‘তোমার ভাইয়ের বিপদে আনন্দ প্রকাশ করো না। তাহলে আল্লাহ তার প্রতি দয়া করবেন এবং তোমাকে সেই বিপদে ফেলবেন।’ (তিরমিজি ২৫০৬)

এই হাদিস মানুষকে নিজের অবস্থান নিয়ে ভাবতে শেখায়। আজ যে ব্যক্তি বিপদে পড়েছে, কাল একই পরিস্থিতিতে অন্য কেউ পড়তে পারে। এমনকি যে ব্যক্তি অন্যের দুরবস্থা দেখে আনন্দিত হচ্ছে, সেও জীবনের কোনো এক সময়ে কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে পারে। মানুষের জীবন সব সময় এক রকম থাকে না। সুস্থতা, অসুস্থতা, সচ্ছলতা, অভাব, সাফল্য ও ব্যর্থতা জীবনেরই অংশ। তাই অন্যের দুর্দশাকে উপহাস করার পরিবর্তে নিজের জন্য শিক্ষা হিসেবে গ্রহণ করা উচিত।

অন্যের বিপদে আনন্দিত হওয়ার প্রবণতা থেকে মুক্ত থাকতে হলে নিজের অন্তরের যত্ন নিতে হবে। কারও সাফল্যে হিংসা জাগলে নিজের নেয়ামতগুলোর কথা স্মরণ করতে হবে। কারও ব্যর্থতায় আনন্দ অনুভব করলে ভাবতে হবে, তার জায়গায় আমি থাকলে কেমন লাগত। নিজের ভুলের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে এবং অন্যের প্রতি বিদ্বেষ থাকলে তা দূর করার চেষ্টা করতে হবে। পাশাপাশি এমন মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করা উচিত, যারা পরনিন্দা, উপহাস ও বিদ্বেষের পরিবর্তে ভালো কাজ, সহমর্মিতা ও কল্যাণের চর্চা করেন।

লেখক : ধর্মীয় নিবন্ধকার

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত