‘প্রযুক্তি উন্নত হলেও কারিগরের অভাব মেটেনি’

আপডেট : ১২ অক্টোবর ২০২৬, ০১:২৯ এএম

আসল নাম ফখরুল ইসলাম মানিক হলেও চলচ্চিত্র ও দর্শক মহলে সংক্ষিপ্ত নাম এফ আই মানিক নামে পরিচিত। ঢাকাই সিনেমা যখন অশ্লীলতার জোয়ারে ডুবতে বসেছিল, ঠিক সেই সময় একের পর এক পারিবারিক সিনেমা নির্মাণ করে মোড় ঘুরিয়ে ফিরিয়ে আনেন সুস্থধারার পরিবেশ। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির সাবেক এই মহাসচিব নানা কারণেই দীর্ঘদিন নির্মাণ থেকে দূরে। গল্প-চিত্রনাট্যের দুর্বলতা, নতুন শিল্পী তৈরির উদ্যোগের অভাব, একের পর এক প্রেক্ষাগৃহ বন্ধ হয়ে যাওয়া। অনুদান প্রথায় অব্যবস্থাপনা, সংগঠনগুলোর নিষ্ক্রিয়তাসহ চলমান চলচ্চিত্রের নানা বিষয় নিয়ে দেশ রূপান্তরের সঙ্গে লম্বা আড্ডায় বসেন তিনি। তার সঙ্গে কথা বলেছেন জাহাঙ্গীর বিপ্লব

শুরুতেই জানতে চাই, সবমিলিয়ে কোন পথে এগোচ্ছে দেশীয় চলচ্চিত্র?

সত্যি কথা বলতে, এখন তো চলচ্চিত্রে কোনো বিভাজন নেই। মূলধারা, বিকল্পধারা কিংবা মনস্তাত্ত্বিক সব ধরনের সিনেমাই নির্মাণ হচ্ছে। পরিসর ছোট অথবা সংখ্যায় কম হলেও এসব সিনেমা এখন দর্শকপ্রিয়তা পাচ্ছে, দেশের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রশংসা কুড়াচ্ছে। তরুণ মেধাবী পরিচালকরা এগিয়ে আসছে। আমি দুয়েকটি সিনেমা দেখেছি, তারা মেধার পরিচয় দিয়েছে, কমিটমেন্ট নিয়ে কাজ করছে। এই চর্চা যদি আগামী প্রজন্মের মধ্যে আসে এবং সেটাকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে ভালো স্ক্রিনপ্লে তৈরি করে তাহলে অবশ্যই সেটা ভালো। তবুও বলব মূলধারার পরিধি আরও বাড়াতে হবে। আর একজনকে দিয়ে মূলধারাকে টিকিয়ে রাখা অকল্পনীয়।

এর জন্য কী কী পদক্ষেপ জরুরি এখন?

চলচ্চিত্রশিল্পকে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতামূলক করে তুলতে সবার আগে জরুরি আমাদের সমিতিগুলো বিশেষ করে চলচ্চিত্র প্রযোজক সমিতিকে সক্রিয় হতে হবে। আর শিল্পী-কলাকুশলীর সংখ্যা বাড়াতে হবে। ওই যে বললাম, একজনকে দিয়ে মূলধারাকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব না। এর জন্য আরও নায়ক-নায়িকা দরকার। প্রয়োজনে নতুন মুখের সন্ধানে কার্যক্রম আবার চালু করতে হবে। আমাদের প্রযোজক সমিতি, পরিচালক সমিতি, শিল্পী সমিতিসহ বেশ কিছু সংগঠন আছে। কিন্তু নতুন যে প্রজন্ম আসছে, তারা কী করছে? পিকনিক করছে, ফুটবল খেলছে। অথচ শিল্পী নেই, ভালো স্ক্রিপ্ট রাইটার নেই, ভালো মিউজিক ডিরেক্টররা চলে গেছেন।

নতুন শিল্পী তৈরির বিষয়ে এত গুরুত্ব দিচ্ছেন?

গুরুত্ব আছে বলেই গুরুত্ব দিচ্ছি। আমি বারবার সংগঠনের বর্তমান নেতৃত্বকে বলেছি, নতুন মুখের কর্মসূচি করুন। লাল-সবুজের মাধ্যমে নতুন শিল্পী খুঁজে বের করা যায়। আমরা চেষ্টা করলে নতুন শিল্পী তৈরি করতে পারব। কিন্তু কাজ হচ্ছে না। কারণ আমরা নতুন মুখের কর্মসূচি থেকে মান্না, আমিন খান, অমিত হাসান, দিতিসহ অসংখ্য শিল্পী পেয়েছি। তাহলে এখন নতুন মুখের কর্মসূচি করা হবে না কেন? এটি আমার কাছে একটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র মনে হয়। আমি বর্তমান ক্যাবিনেটের সচিবকে বারবার বলেছি নতুন মুখের কর্মসূচি করুন। এতে অনেক ছবি তৈরি হবে, কর্মসংস্থান হবে, সংগঠনও ব্যস্ত থাকবে। কিন্তু পরিচালকরা বসে বসে চা খেয়ে পত্রিকা পড়ে বাড়ি চলে যাচ্ছেন।

শিল্পী তৈরির ক্ষেত্রে পরিচালক ও সংগঠনের ভূমিকার কথা বলছেন। এখনকার শিল্পীদের সবচেয়ে বড় সমস্যা কোথায় দেখছেন?

এখন অনেকে আসে, কিন্তু তাদের গ্রুমিং হয় না। অভিনয় শেখানো হয় না, বডি ল্যাঙ্গুয়েজ কী হবে, ডায়ালগ থ্রোয়িং কী হবে, মডুলেশন কীভাবে হবে, স্টেপিং কী হবে কিছুই শেখানো হয় না। ফলে শিল্পী তৈরি হচ্ছে না। আমরা যখন কাজ শুরু করেছি, শিল্পীকে চরিত্র অনুযায়ী তৈরি করা হতো। একজন শিল্পীকে গল্প, চরিত্র, পোশাক, মেকআপ, গেটআপ, পারিবারিক অবস্থান, শিক্ষাগত যোগ্যতা সবকিছু নিয়ে আলোচনা করতে হতো। এখন অনেকেই মোবাইলে কথা বলছে, মেকআপ করছে, সেটে কী সিকোয়েন্স চলছে তার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই। ‘রেডি, রেডি, চলেন টেক’ এভাবে তো ক্রিয়েটিভ কাজ হয় না। সিনেমা কোনো কামলার কাজ নয়, এটি সৃজনশীল কাজ।

আর সিনেমা নির্মাণের ক্ষেত্রে একজন পরিচালকের প্রধান গুরুত্ব কোনটা?

ফিল্ম মেকিংয়ের ক্ষেত্রে পরিচালকের প্রধান ও প্রথম কাজ হওয়া উচিত গল্প ও স্ক্রিপ্ট নির্বাচন। এর জন্য যথেষ্ট সময় দিতে হবে। যত বেশি আলোচনা হবে, যত বেশি কথা হবে, তত বেশি কাজটি উন্নত হবে। কিন্তু আমাদের এই জায়গাটাই দুর্বল হয়ে গেছে। তবে আমার সঙ্গে যারা কাজ করতেন, তাদের মধ্যে এখন প্রায় কেউই ছবি বানাচ্ছেন না। কাজী হায়াৎ ভাইয়ের বয়স হয়েছে, নানা সমস্যায় ভুগছেন, আগের মতো গতিতে কাজ করতে পারছেন না। তারপরও অসুস্থ শরীর নিয়ে প্রাণের টানে তিনি এখনো কাজে আসেন। খোকন, সোহান চলে গেল। মালেক আফসারী জেদ করে চলচ্চিত্র নির্মাণ বন্ধ করে দিলেন। কারণ প্রযোজক কোথায়? কী ছবি বানাব? যে স্ক্রিপ্টগুলো আসছে, সেগুলোও খুব ভালো কিছু হচ্ছে না। এ কারণে অনেকে ইউটিউব চ্যানেলসহ অন্য মাধ্যমে কাজ করছেন।

আগের শিল্পী ও এখনকার শিল্পীদের ব্যবধান কতটুকু?

আমি ১৯৮৬ সালে কাজ শুরু করি। তখন জসিম, জাফর ইকবাল, আজিম সাহেব, আহমেদ শরীফ, রাজীব, রোজিনা, অঞ্জনার মতো শিল্পীরা জনপ্রিয় ছিলেন। তারা পরিচালক যা বোঝাতেন, দ্রুত সেটা ধারণ করতে পারতেন। কারণ তাদের ডিভোশন ও ডেডিকেশন ছিল। তখন শিল্পী একটি ছবি করার পর পরের ছবির জন্য পরিচালককে ফোন দিতেন। চরিত্র নিয়ে আলোচনা করতেন। এখন অনেক ক্ষেত্রে বাড়ি থেকে পোশাক নিয়ে এসে সেটাই পরে অভিনয় করা হচ্ছে। একটি চরিত্রের পরিচয় কী, কোথা থেকে এসেছে, তার পারিবারিক অবস্থান কী, শিক্ষাগত যোগ্যতা কী এসব জানতে হবে। চরিত্রের ম্যানারিজম, পারিপার্শ্বিকতা, পোশাক, বাড়ি, অফিস, কর্মজীবন নিয়েও আলোচনা করতে হবে।

আপনি বলতে চাইছেন প্রযুক্তি উন্নত হলেও চলচ্চিত্র নির্মাণের মানসিকতা পিছিয়ে গেছে?

প্রযুক্তি আপগ্রেড হয়েছে, কিন্তু টেকনিশিয়ানরা সেভাবে আপগ্রেড হয়নি। আমরা ডিজিটালে চলে এসেছি। ৩৫ মিলিমিটারে প্রতিদিন দুই বেলা শুটিংয়ে আমার পাঁচ ক্যান ফিল্ম লাগত। একেকটি ক্যানের দাম ছিল ১৫ হাজার টাকা। অর্থাৎ ৭৫ হাজার টাকার ফিল্ম নিয়ে শুটিংয়ে ঢুকতাম। তখন কাজের প্রতি একটা মায়া ও প্রেম ছিল। প্রত্যেকে নিজের জায়গায় খুব সতর্ক থাকত। এভাবেই নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত চমৎকার একটি ইন্ডাস্ট্রি ছিল। আগে সিনেমা দেখা ছিল নিয়মিত জীবনের অংশ। ছবি মুক্তি পেলে পুরো পরিবার হলে গিয়ে ছবি দেখত। সেই অভ্যাসটাই ভেঙে গেছে।

শাকিব খানকে নিয়ে এখন একটি বড় বাজার তৈরি হয়েছে। এটিকে আপনি কীভাবে দেখেন?

শাকিব খানকে ইন্ডাস্ট্রিই তৈরি করেছে। আমি চাই শাকিব খানও ইন্ডাস্ট্রির জন্য কিছু করুক। মান্না যেমন শিল্পী সমিতির সাধারণ সম্পাদক হয়ে দৌড়াদৌড়ি করতেন, ইন্ডাস্ট্রির ভালো ছবি কীভাবে করা যায় তা নিয়ে ভাবতেন, শাকিব খানও সেই মানসিকতায় ভাবতে পারতেন। আজ যারা ছবি বানানোর চিন্তা করছেন, তাদের ফোন করে বাসায় গিয়ে বসা উচিত। বলা উচিত ‘স্ক্রিপ্ট তৈরি করেন, আমি ছবি করব। এটাই শিল্পের প্রতি প্রেম। যে শিল্প তাকে এত বড় তারকা বানিয়েছে, তার জন্য কিছু করা দরকার। তার নামে বাংলাদেশে সিনেমা হল বুক হয়ে যায়। তিনি অনেক পেয়েছেন। এখন প্রশ্ন হলো, তিনি কী দিয়েছেন, কী দিচ্ছেন? তবে তার জন্য শুভকামনা থাকবে। মানুষ পরিবর্তনও হতে পারে। এখনো তার বয়স ও অবস্থান এমন যে চাইলে তিনি দায়িত্বশীল হতে পারেন এবং ইন্ডাস্ট্রিকে পরিবর্তনের দিকে নিতে পারেন।

আপনার নতুন সিনেমার অগ্রগতি কেমন?

আমি নতুন মুখের বিষয়ে অনেককে এড়িয়ে যেতে দেখেছি। তাই আমার অবস্থান থেকে আমি নিজের মতো চলছি। আমি যে গল্প তৈরি করেছি, সেটিই আমার ছবির তারকা। গল্পটা অসাধারণ। ছবির নাম ‘ইটস এ ওয়ান্ডারফুল লাভ’। অচিরেই সবাইকে নিয়ে জমকালো আয়োজনে সিনেমাটির মহরত করব। অনেক বড় বাজেটের সিনেমা হবে এটি। দুই বাংলার তারকারা কাজ করবে এখানে। সময় হলেই বিস্তারিত জানাব।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত