আমানতকারীর অর্থ ফেরত দিতে ঋণ চায় ন্যাশনাল ব্যাংক

আপডেট : ১২ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৩২ এএম

বিপুল অঙ্কের ঋণ জালিয়াতির পর নগদ অর্থ সংকটে পড়া বেসরকারি ন্যাশনাল ব্যাংক পিএলসি গ্রাহকের টাকা উত্তোলন সংকুচিত করেছিল। এখন ব্যাংকটি চলতি, স্থায়ী ও সঞ্চয়ী আমানতকারীর টাকা ফেরত দিতে চায়। তবে এজন্য প্রয়োজনীয় নগদ অর্থ নেই ব্যাংকটির। তাই অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে নগদ অর্থের জোগান নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। আগামী ১৫ অক্টোবর থেকে আমানতকারীদের টাকা উত্তোলনের সুযোগ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ব্যাংকটি। গতকাল রবিবার থেকে যেসব গ্রাহক নিজ নিজ শাখায় গিয়ে কত টাকা তুলতে চান, তাদের কাছ থেকে আবেদন আহ্বান করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে টাকা জমা রেখেও প্রয়োজনের সময় তা তুলতে না পারায় ন্যাশনাল ব্যাংকের আমানতকারীরা আর্থিক ভোগান্তিতে পড়েছেন। তাদের দুর্ভোগ বিবেচনায় নিয়ে টাকা উত্তোলনের সুযোগ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ব্যাংকের ওপর নতুন চাপ বা সংকট সৃষ্টি হয়, এমন পদক্ষেপ নেওয়া হবে না।

এদিকে আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ব্যাংকটির তারল্য সংকট সাময়িকভাবে সামাল দেওয়া সম্ভব হলেও আর্থিক সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়া হলে একদিকে গ্রাহকদের তাৎক্ষণিক চাহিদা পূরণ হবে, অন্যদিকে ন্যাশনাল ব্যাংকের ওপর নতুন ঋণের দায় তৈরি হবে। এ ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধ করতে হবে নির্ধারিত সময়ে। ফলে খেলাপি ঋণ আদায়, আটকে থাকা অর্থ উদ্ধার এবং আয় বাড়ানোর কার্যকর উদ্যোগ না থাকলে ভবিষ্যতে ব্যাংকটি আবারও তারল্য সংকটে পড়তে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, আমানতকারীদের চাহিদা সংগ্রহ করে সম্ভাব্য নগদ অর্থের প্রয়োজন নির্ধারণ করা হবে। এরপর সেই চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। টাকা ফেরতের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের বৈষম্য করা হবে না। ব্যক্তিগত আমানতকারী, প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারী কিংবা ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্বজন, কেউ বিশেষ সুবিধা পাবেন না। চলতি, সঞ্চয়ী ও স্থায়ী আমানতসহ সব ধরনের আমানতকারীর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার কথা জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

ন্যাশনাল ব্যাংকের তারল্য সংকট মোকাবিলায় অন্য ব্যাংক থেকে সহায়তা নেওয়ার ঘটনা নতুন নয়। ২০২৪ সালের অক্টোবরে ব্যাংকটি কয়েকটি ব্যাংক থেকে তারল্য সহায়তা পেয়েছিল। সে সময় প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিটি ব্যাংক ২০০ কোটি টাকা, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক ৫০ কোটি টাকা এবং বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংক ২০ কোটি টাকা সহায়তা দেয়। এ ছাড়া সোনালী ব্যাংক থেকে ২২০ কোটি টাকা এবং ডাচ্-বাংলা ব্যাংক থেকে ১০০ কোটি টাকা সহায়তা পাওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছিল।

আগের এসব সহায়তা থেকে বোঝা যায়, তারল্য সংকট সামাল দিতে ন্যাশনাল ব্যাংক এর আগেও অন্য ব্যাংকের অর্থের ওপর নির্ভর করেছে। তবে আগের সহায়তার অর্থ কীভাবে সমন্বয় বা পরিশোধ করা হয়েছে জানাতে পারেনি কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে আমানত ফেরত দেওয়ার ক্ষেত্রে মূল বিষয় হলো, অর্থের উৎস এবং পরিশোধের সক্ষমতা। আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়া হলে ব্যাংকের আমানতসংক্রান্ত দায় কমতে পারে। কিন্তু সেই অর্থের পরিবর্তে অন্য ব্যাংকের কাছ থেকে ঋণ নেওয়া হলে নতুন ঋণদায় তৈরি হবে।

ন্যাশনাল ব্যাংকের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়ার পাশাপাশি নিজেদের আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানো। এ জন্য খেলাপি ঋণ আদায়, আটকে থাকা অর্থ উদ্ধার, আয় বাড়ানো এবং অব্যবহৃত সম্পদ কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি নতুন ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধের জন্য বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, ন্যাশনাল ব্যাংকের আর্থিক সংকট মোকাবিলায় ব্যাংকটির নিজস্ব স্থাবর সম্পদের অব্যবহৃত অংশ বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের বিশেষ অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে নতুন আয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এ উদ্যোগ থেকে কতটা আয় আসবে এবং তা ব্যাংকের তারল্য পরিস্থিতির উন্নতিতে কতটা ভূমিকা রাখবে, সেটি নির্ভর করবে সম্পদের কার্যকর ব্যবহার ও বাস্তবায়নের ওপর।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ব্যাংক খাতকে সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হবে। কৃষিঋণসহ বিভিন্ন খাতে ব্যাংকগুলোর নিজস্ব তহবিল এবং পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচির মাধ্যমে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। এসব কর্মসূচির অর্থায়নে নতুন করে টাকা ছাপানোর কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি। তার মতে, নিয়ম ও নীতিমালার মধ্যে থেকে এমন ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে আমানতকারীদের প্রত্যাশা পূরণের পাশাপাশি ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা বজায় থাকে এবং মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি না হয়।

অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষক হেলাল আহমেদ খান জনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ন্যাশনাল ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার উদ্যোগ ইতিবাচক। তবে শুধু অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে টাকা ফেরত দিলে ন্যাশনাল ব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সংকট কাটবে না। এ জন্য খেলাপি ঋণ আদায়, সম্পদ উদ্ধার, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং নতুন ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে আমানত ফেরতের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও বৈষম্যহীনতা নিশ্চিত করা জরুরি। সেই সঙ্গে ন্যাশনাল ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে কাক্সিক্ষত সংস্কার প্রয়োজন। অনিয়মের সঙ্গে জড়িত সবাইকে বিচারের আওতায় আনা জরুরি।

সব মিলিয়ে ১৫ অক্টোবর থেকে টাকা উত্তোলনের সুযোগ দেওয়ার ঘোষণা ন্যাশনাল ব্যাংকের আমানতকারীদের জন্য স্বস্তির খবর। তবে এ উদ্যোগের সফলতা নির্ভর করবে প্রয়োজনীয় নগদ অর্থের জোগান নিশ্চিত করা এবং ব্যাংকটির আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করার ওপর। অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে আমানত ফেরত দেওয়ার উদ্যোগ সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু খেলাপি ঋণ আদায় ও আয় বাড়ানোর কার্যকর ব্যবস্থা ছাড়া সংকটের স্থায়ী সমাধান কঠিন হবে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত