চাপে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা

আপডেট : ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৫৫ এএম

এ বছর বোরো মৌসুমে উৎপাদন ভালো হওয়ায় বাজারে চালের পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে। চাহিদা মেটাতে এখনো আমদানি-নির্ভরতা তৈরি হয়নি, সরকারের কাছেও রয়েছে বড় মজুদ। অন্যান্য দেশের তুলনায় দেশে চালের দাম এখনো সহনীয়। তবে কৃষি উপকরণ যেমন সার সংগ্রহের ক্ষেত্রে তৈরি হওয়া চাপ, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাবে বৈশি^ক ও স্থানীয় বাজারে জ¦ালানির মূল্যবৃদ্ধি, পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়াসহ নানা কারণে আসন্ন বোরো মৌসুমে বাড়বে কৃষির উৎপাদন খরচ, যা চালের দাম বাড়িয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে দেশে গমের উৎপাদন তলানিতে নামায় চাহিদার ৮০ ভাগেরও বেশি পূরণ করতে হচ্ছে আমদানির মাধ্যমে। ইরান-আমেরিকা যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়ায় প্রতিনিয়ত জ¦ালানির মূল্যবৃদ্ধি, বাড়তি জাহাজ ভাড়া আমদানির খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। এর প্রভাবে গম, আটা, ময়দা কিনতে মানুষকে বাড়তি খরচ করতে হচ্ছে। ফলে সামগ্রিকভাবে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা চাপের মুখে পড়েছে। 

বিশ্লেষকরা বলছেন, খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে শুধু উৎপাদিত বা আমদানি করা পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকাটাই যথেষ্ট নয়। এর সঙ্গে দামও থাকতে হবে সহনীয় এবং ক্রয়-সক্ষমতার মধ্যে। খাবার কেনার খরচ বেড়ে গেলে দরিদ্র মানুষের জন্য তা ঝুঁকি তৈরি করে। কারণ দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও চড়া মূল্যস্ফীতির কারণে অনেক মানুষের প্রকৃত আয় কমে গেছে, অন্যদিকে দ্রুত নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। নিম্ন আয়ের মানুষ আরও আর্থিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাব বলছে, গত আগস্টে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ, যেটা সেপ্টেম্বরে বেড়ে ৭ দশমিক ২২ শতাংশে পৌঁছেছে।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) সর্বশেষ মূল্যায়ন প্রকাশিত হয়েছে গত সেপ্টেম্বরে। এতে দেশে চাল-উৎপাদন পরিস্থিতি নিয়ে ইতিবাচক ধারণা দেওয়া হলেও গমের আমদানি-নির্ভরতার কারণে খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। সংস্থাটি বলছে, চালের উৎপাদনে স্বস্তি থাকলেও গমের চাহিদা মেটাতে বাংলাদেশকে নির্ভর করতে হচ্ছে আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মূল্যস্ফীতি, জ¦ালানি ও জ¦ালানিসংশ্লিষ্ট ব্যয় বৃদ্ধি এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার সংকট।

এফএওর উল্লেখ করা সমন্বিত খাদ্যনিরাপত্তা পর্যায় শ্রেণিবিন্যাসের (আইপিসি) পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে প্রায় ১ কোটি ৮১ লাখ মানুষ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়তে পারে। কারণ সবার জন্য পর্যাপ্ত খাবার কেনার সামর্থ্য নিশ্চিত হবে না। গমের উৎপাদন ও আমদানির পাশাপাশি খাদ্যের দাম, আয় এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতার প্রশ্নটি এ পর্যালোচনায় উঠে এসেছে।

এই পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলতে পারে চালের বাড়তি উৎপাদন খরচ। যেমন চলতি আমন মৌসুমে সারের সরবরাহ চেইনের জটিলতার কারণে উচ্চ দাম দিয়ে সার কিনতে হয়েছে সারা দেশের কৃষকদের। এর মধ্যে বেড়েছে বিদ্যুৎ ও ডিজেলের খরচ। যা দেশের চাল উৎপাদনের সবচেয়ে বড় মৌসুমে প্রভাব ফেলবে। সে সময় পরিবহন থেকে শুরু করে বাড়তি খরচ করতে হবে বিদ্যুৎ ও ডিজেলে। কারণ মৌসুমটি পুরোপুরি সেচনির্ভর।

এ পরিস্থিতির একটি ব্যাখ্যা তুলে ধরেছেন কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম খান। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, জ¦ালানির মূল্য বাড়লে তা সব ধরনের উৎপাদনের ওপরেই প্রভাব ফেলে। উৎপাদন-খরচ বেড়ে গেলে এবং তা যদি কৃষকের সক্ষমতার বাইরে চলে যায়, তাহলে কৃষক উৎপাদন কমিয়ে দেবে, যা সামগ্রিক উৎপাদনে প্রভাব ফেলবে। চাল বা ধান উৎপাদনের যে প্রবৃদ্ধির হার সেটা কমে যেতে পারে।

‘এতে একদিকে আমদানি-নির্ভরতা তৈরি হতে পারে, অন্যদিকে দেশেও পণ্যের দাম বেড়ে যেতে পারে। বৈশি^ক যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে ইতিমধ্যেই আমদানিনির্ভর পণ্য যেমন গমের দামটা বেশি। স্থানীয় বাজারেও এর দাম বেশি। এই পরিস্থিতি সামগ্রিকভাবে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে দেবে। মূল্যস্ফীতি বেড়ে গেলে নিম্ন আয় বা দরিদ্র মানুষের জন্য খাদ্যের নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করবে বলে জানান এই অর্থনীতিবিদ।

তিনি বলেন, ‘সরকারকে সামগ্রিকভাবে উৎপাদন বাড়ানো, দাম সহনশীল রাখা এবং কৃষিতে অর্থাৎ কৃষকের হাতে ভর্তুকি বাড়ানোর বিষয়ে উদ্যোগ নিতে হবে। বিশেষ করে সারের মতো কৃষি উপকরণ নিয়ে যাতে কৃষককে বাড়তি খরচ করতে না হয়, সরবরাহ পাওয়া নিয়ে চিন্তিত না থাকতে হয় তা নিশ্চিত করতে হবে।’

সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট প্রতিবেদনে বাংলাদেশের দারিদ্র্য পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বলা হয়েছে, গত চার বছরে দেশে ৮০ লাখ মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়েছেন। এ ছাড়া দারিদ্র্যসীমার কিছুটা ওপরে থাকা আরও ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ রয়েছে নতুন দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে। বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ বলছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়াসহ যেকোনো অর্থনৈতিক ধাক্কায় এ মানুষগুলো দরিদ্র হয়ে যেতে পারেন। দারিদ্র্যের হার এখন পৌঁছেছে সাড়ে ২২ শতাংশে, যা চলতি অর্থবছর শেষে আরও ২২ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছতে পারে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, খাদ্য ও কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দেশে বছরে চালের চাহিদা ৩ কোটি ৭ লাখ থেকে ৩ কোটি ৯ লাখ টন। সেখানে স্থানীয়ভাবে গত অর্থবছর (২০২৫-২৬) চাল উৎপাদিত হয়েছে ৪ কোটি ২৪ লাখ টন। অর্থাৎ চাহিদার চেয়ে উৎপাদন কোটি টনেরও বেশি। ঠিক সেখানে গমের চাহিদা যেখানে বছরে প্রায় ৮০ লাখ টন, সেখানে গত অর্থবছর উৎপাদন হয়েছে মাত্র ১১ লাখ ২৩ হাজার টন। শুধু ওই বছর নয়, গত প্রায় ১৭ বছর ধরে বাংলাদেশে বার্ষিক গড় গম উৎপাদন আটকে আছে এই ১১ লাখ টনের ঘরে। আর এতেই তৈরি হয়েছে পুরোদমে আমদনি-নির্ভরতা। গত অর্থবছর বিদেশ থেকে গম আমদানি করতে হয়েছে ৬৫ লাখ ৮১ হাজার টন। অর্থাৎ দেশের চাহিদার ১৪-১৫ শতাংশ স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হচ্ছে, বাকি ৮৫ শতাংশই আমদানি হয়।

বিবিএসের এক জরিপ অনুযায়ী, ছয় বছরের ব্যবধানে গমের খাবারের ব্যবহার বেড়েছে প্রায় ১৬ শতাংশ। পাশাপাশি এ সময়ে গ্রামের চেয়ে শহরে গমের খাবারের ব্যবহার বেড়েছে ২৬ শতাংশ। এর বিপরীতে চালের ভোগ ১০ দশমিক ৪৩ শতাংশ কমেছে। অর্থাৎ গম বা আটা, ময়দার দাম বেড়ে গেলে তা দেশের বড় একটি মানুষের জন্য নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসেবে দেশে গত বোরো মৌসুমে ২ কোটি ২৭ লাখ টন চাল উৎপাদিত হয়েছে। বাজারে সরবরাহ বেশি থাকায় সরকারিভাবে ধান ও চাল কেনা হয়েছে নির্ধারিত পরিমাণের চেয়েও বেশি। এতে সরকারের কাছে একটি বড় মজুদ তৈরি হয়েছে।

খাদ্য অধিদপ্তর বলছে, সরকারের কাছে বর্তমানে ১৯ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ টন চালের মজুদ রয়েছে। এর সঙ্গে আছে ৩ লাখ ১২ হাজার টনের বেশি গমের মজুদ। ধান আছে ৫ হাজার ২০০ টন। সব মিলে সরকারের কাছে চাল-গমের ফ্লোটিং মজুদসহ খাদ্যশস্য মজুদ রয়েছে ২৩ লাখ ৪৫ হাজার ৫৭৪ টনের।  

বৈশি^ক যুদ্ধ পরিস্থিতি, প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাবসহ নানা কারণেই খাদ্য বিভাগ এ মজুদেও সন্তুষ্ট নয়। তারা আরও বেশি মজুদ গড়তে চায়। জানা গেছে, বর্তমানে সরকারের কাছে কার্যকরী মজুদ সক্ষমতা রয়েছে ২২ লাখ ৯৫ হাজার মেট্রিক টনের। তবে চলমান যেসব প্রকল্প রয়েছে তা-সহ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ২০৩০ সালের মধ্যে ৩৪ লাখ টনের মজুদের সক্ষমতা তৈরির উদ্যোগ নিয়ে কাজ শুরু হয়েছে।

এ বিষয়ে খাদ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. জামাল হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং বৈশি^ক অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে সরকার খাদ্যশস্য মজুদের সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা রূপায়িত করছে। পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে এটা ৩৪ লাখ টনে উন্নীত করা হবে।’

এ পরিস্থিতির মধ্য দিয়েই সারা বিশে^র মতো বাংলাদেশেও আজ পালন করা হবে বিশ্ব খাদ্য দিবস। এফএওর সঙ্গে প্রতি বছর কৃষি মন্ত্রণালয় এ খাদ্য দিবস পালন করে থাকে। আজকের উদ্ভাবন আগামীর সমৃদ্ধি সেøাগানকে সামনে রেখে আজ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল মিলনায়তনে একটি সেমিনারেরও আয়োজন করা হয়েছে, যেখানে প্রধান অতিথি হিসেবে থাকবেন কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত