ডিসেম্বরে অনিশ্চিত বিএনপির কাউন্সিল

আপডেট : ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৫৬ এএম

চলতি বছরের ডিসেম্বরে বিএনপির সপ্তম কাউন্সিল নিয়ে অনিশ্চিয়তা দেখা দিয়েছে। সম্প্রতি দলটির জাতীয় স্থায়ী কমিটির একাধিক বৈঠক হলেও কাউন্সিল নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মহাসচিব থাকাকালে একাধিকার কাউন্সিলের কথা বললেও এখন কেউ কাউন্সিলের কথা বলছেন না। স্থায়ী কমিটির সিদ্ধান্ত মোতাবেক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির শূন্য পদ গঠনতন্ত্র অনুযায়ী পূরণ করা হবে। এখন কাউন্সিল নয়, দলটি আপাতত ব্যস্ত স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে। এরই মধ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। দলের কাউন্সিলের বিষয়ে জানতে চাইলে দলটির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সপ্তম কাউন্সিলের বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি। সিদ্ধান্ত হলে জানিয়ে দেওয়া হবে।’

বিএনপির একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, দলীয় কাউন্সিল না হলেও নেতৃত্বের সংকট রাখতে চায় না নীতিনির্ধারণী ফোরাম। এ জন্য অভ্যন্তরীণভাবে শূন্য পদ পূরণে একটি বিশেষ কমিটি কাজ করছে। দলের বিভিন্ন পর্যায়ের শূন্য পদগুলো চিহ্নিত করা হচ্ছে। বিশেষ করে স্থায়ী কমিটি, ভাইস চেয়ারম্যান, যুগ্ম মহাসচিব, সাংগঠনিক সম্পাদক, বিভিন্ন সম্পাদকীয় পদ এবং কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির শূন্য পদগুলোতে নতুন নেতাদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে। গত আগস্ট থেকেই এ প্রক্রিয়া চলছে। আগামী ডিসেম্বর নাগাদ গুরুত্বপূর্ণ আরও কিছু পদে নতুন মুখ যুক্ত হতে পারে। এ তৎপরতার কারণে আগামী ডিসেম্বর বা জানুয়ারিতে কাউন্সিল হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবের রহমান শামীম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সামনে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বড় উৎসব দুর্গাপূজা। দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে আমরা এখন এই উৎসব নিয়ে ব্যস্ত। সনাতন ধর্মাবলম্বীরা যাতে শান্তিপূর্ণভাবে উৎসব পালন করতে পারে এবং উৎসবে কেউ যাতে বিঘœ ঘটাতে না পারে সে বিষয়ে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে নির্দেশ দিয়েছেন দলের চেয়ারম্যান। তাই আমরা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের দায়িত্বশীল নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখছি।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির এক ভাইস চেয়ারম্যান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এই দেশে যখন যে সরকার আসে, সে সরকার শুধু সরকার পরিচালনায় ব্যস্ত থাকে। দলের গুরুত্ব তখন হারিয়ে যায়। এ কারণে দল হয় দুর্বল। তাই বর্তমান সরকারকে শুধু সরকার পরিচালনা করলেই হবে না; দলকে গতিশীল রাখতে হবে। দলকে গতিশীল রাখতে হলে কাউন্সিল করতে হবে। বিরোধী দল জামায়াতকে মোকাবিলা করতে হলে দলকে শক্তিশালী করতে হবে। পাশাপাশি বর্তমান বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং প্রধান বিরোধী দল জামায়াত ও কার্যক্রমনিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের তৎপরতাকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হলে একজন পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব দরকার। প্রয়োজনে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীকে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব করা যেতে পারে। তাকে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব থেকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব করা হয়েছে। কিন্তু জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব কাউকে করা হয়নি। যদিও স্থায়ী কমিটির শূন্য পদে কয়েকজনকে নির্বাচিত করা হয়েছে।’

গত ১৫ আগস্ট দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটিতে চার নেতাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তারা হলেন রুহুল কবির রিজভী, আমানউল্লাহ আমান, ফরহাদ হালিম (ডোনার) ও মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ। রিজভী সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ছিলেন। বাকি তিনজন ছিলেন চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা।

সর্বশেষ ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিল হয়েছিল। গঠনতন্ত্রে ৩ বছর পরপর কাউন্সিলের বিধান থাকলেও প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে এরপর আর তা করতে পারেনি দলটি। ক্ষমতায় ফেরার পরপরই সপ্তম কাউন্সিলের বিষয়টি আলোচনায় আসে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার আগে বিদায়ী মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর একাধিকবার বলেছিলেন শিগগির কাউন্সিল হবে। তার আগে তৃণমূল সংগঠন গুছিয়ে নেওয়ার বিষয় রয়েছে। এজন্য যেসব জেলায় আংশিক কমিটি রয়েছে, সেগুলো পূর্ণাঙ্গ করতে হবে। মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিতে আহ্বায়ক কমিটি দিতে হবে। আর যেসব জেলায় আহ্বায়ক কমিটি রয়েছে, সেগুলোয় কাউন্সিল করার উদ্যোগ নিতে হবে। কিন্তু দলটির মধ্যে সেসব উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর দলের কাউন্সিলের নিয়ে আলোচনা অনেকটা থেমে গেছে।

এদিকে মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার পরও ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবক দলের নতুন কমিটি ঘোষণা না হওয়ায় সংগঠন দুটির নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা কাজ করছে। ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা বলছেন, ছাত্রদলের কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে। সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান বৈঠক করেছিলেন। বৈঠকের পর সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক বিদায়ী স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে। এরপর পদপ্রত্যাশী নেতারা নিজ নিজ সমর্থকদের নিয়ে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছিলেন। কিন্তু নতুন কমিটি কবে হবে তার কোনো নির্দেশনা না থাকায় তারা ঝিমিয়ে পড়েছেন। স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাকর্মীরাও অপেক্ষায় রয়েছেন নতুন কমিটির। তারা বলছেন, যাকেই দায়িত্ব দিক, দিয়ে দিক। নতুন কমিটি না হলে সংগঠনে প্রাণচাঞ্চল্য আসবে না।   

গত সোমবার আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সময় নির্ধারণ-সংক্রান্ত সভা শেষে নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার আবুল ফজল মোহাম্মদ সানাউল্লাহ আসন্ন স্থানীয় সরকারের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন পাঁচ ধাপে করার পরিকল্পনার কথা জানান। প্রথম ধাপের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে ২০২৭ সালের ২১ জানুয়ারি।

ইসি সানাউল্লাহ বলেছেন, প্রথম ধাপে আগামী ২১ জানুয়ারি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। দ্বিতীয় ধাপে আগামী ৪ ফেব্রুয়ারি, তৃতীয় ধাপে আগামী ২৯ এপ্রিল, চতুর্থ ধাপে আগামী ১৩ মে এবং পঞ্চম ধাপে আগামী ২৭ মে ইউনিয়ন পরিষদের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। তিনি বলেন, স্থানীয় সরকারের ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন নিয়ে প্রাক-প্রস্তুতিমূলক সভা করেছি। ৪ হাজার ৩০০’র মতো ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন ২৭ মে ২০২৭ সালের মধ্যে সম্পন্ন হবে। পাঁচ ধাপে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ইতিমধ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। সামনের দিনগুলোয় আমরা স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত থাকব। এমন পরিস্থিতিতে দলের কাউন্সিল করার মতো বড় উদ্যোগ সম্পন্ন করা জটিল। তাই চলতি ডিসেম্বরে দলের কাউন্সিল করা সম্ভব হবে না।’

তিনি বলেন, ‘দলের কাউন্সিল না হলেও কেন্দ্রীয় কমিটিতে শূন্য পদ থাকবে না। দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী শূন্য পদগুলো পূরণ করা হবে। দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত স্থায়ী কমিটির সভায় এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর অংশ হিসেবে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব করা হয়েছে।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত