মরিয়মের মৃত্যুতে অনুচ্চারিত শব্দাবলী 

আপডেট : ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:২৮ পিএম

মরিয়মের মৃত্যুর পর সবচেয়ে বেশি যে প্রশ্ন উঠেছিলো- তিনি যদি নির্যাতিতা হয়ে থাকেন, তবে আইনের আশ্রয় আগে নেননি কেন? কিন্তু এর ভেতরে একটি সিদ্ধান্ত পূর্বেই বসানো থাকে: অভিযোগ না করাই যেন, নির্যাতন না হওয়ার পক্ষে প্রমাণ!  মরিয়মের চিরকুট সেই সরলতাকে টিকতে দেয় না। সেখানে সম্পর্ক ভাঙনের সঙ্গে আছে বিশ্বাসভঙ্গ, প্রতারণা, বারবার নত হয়ে থাকার অভিজ্ঞতা এবং নিজের অবস্থানকে অন্যের খেলার গুটি হিসেবে দেখার ভাষা- “বারবার তোমার কাছে নত হই”, “ঠকিয়ে জিততে পেরেছো”, “তোমার গেমসের দাবার এক গুটি”, “বিপক্ষের সেনাপতি”। এগুলো শুধু সম্পর্ক ভাঙার ভাষা নয়। একজন মানুষ নিজের মর্যাদা, অবস্থান ও নিজস্ব নিয়ন্ত্রণকে কীভাবে অনুভব করছিলেন, তারও ভাষা। এত অভিযোগ থাকার পরও প্রশ্নটি কি হওয়া উচিত- মরিয়ম কেন আইনের আশ্রয় নেননি, নাকি নিতে পারেননি?  মামলার নথিতে তাঁর বাবা অভিযোগ করেছেন- ‘বিয়ের পর গাজী নজরুল ইসলাম ও তাঁর প্রথম স্ত্রী মরিয়মকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করতেন এবং মরিয়ম বিভিন্ন সময়ে ফোনে পরিবারের সদস্যদের বিষয়টি জানিয়েছিলেন।’ মৃত্যুর পর তাঁর ঘর থেকে পাওয়া হাতে লেখা নোটেও সম্পর্কের ভাঙন, বিশ্বাসভঙ্গ ও মানসিক যন্ত্রণার ভাষা ছিল। অর্থাৎ ‘অভিযোগ করেননি’ বলার আগে অভিযোগের ভাষাটি দেখতে হয়। প্রশ্নটি শুধু মামলা করার নয়, সেই অভিযোগ নিয়ে একজন নারী আইনের কাছে পৌঁছানোর অবস্থানে ছিলেন কি না।


বাংলাদেশের ২০২৪ সালের Violence Against Women Survey এই প্রশ্নটিকে বড় বাস্তবতায় বসায়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও UNFPA-এর জাতীয় জরিপে ২৭,৪৭৬ নারী অংশ নিয়েছেন। ১৫ বছর বা তার বেশি বয়সী ever-married  নারীদের ৭৫.৯ শতাংশ জীবদ্দশায় intimate partner violence-এর কোনো না কোনো অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। জরিপে অন্তর্ভুক্ত survivors--এর ৬৪ শতাংশ তাঁদের অভিজ্ঞতার কথা কাউকে জানাননি (বা জানাতে পারেননি); গত ১২ মাসে intimate partner violence-এর অভিজ্ঞতা থাকা survivors-এর মাত্র ৭.৪ শতাংশ আইনি পদক্ষেপ নিতে পেরেছেন।

“অভিযোগ করেননি”-এই বাক্য অনেক কিছু আড়াল করতে পারে। অভিযোগের অভিজ্ঞতা, অভিযোগ জানানোর পথ এবং সেই পথ ধরে আইনের কাছে পৌঁছানো—তিনটি এক নয়। ২৩ জুলাই ২০২৬-এর ‘ঠিকানা’র আলোচনায় মরিয়ম ও গাজী নজরুল ইসলাম প্রসঙ্গে খালেদ মুহিউদ্দীন বলেছেন, “ওই মেয়েটাও অভিযোগ করে নাই, তার বাবাও অভিযোগ করে নাই। আপনি কী নিয়ে পড়েলেন?” সেই বক্তব্যে মরিয়মের অভিযোগের প্রশ্নটি সরে গিয়ে গাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গেই বরং অন্যায় হয়েছে—এমন দাবি করা হয়েছে। তখন “অভিযোগ করেননি” কথাটি শুধু তথ্য থাকে না; সেটিই হয়ে ওঠে মরিয়মের অভিজ্ঞতাকে দেখার মাপকাঠি।  বাংলাদেশের পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন, ২০১০-এর ৩ ধারায় মানসিক নির্যাতনের মধ্যে মৌখিক নির্যাতন, অপমান, অবজ্ঞা, ভীতি প্রদর্শন, হয়রানি এবং ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ—স্বাভাবিক চলাচল, যোগাযোগ কিংবা ব্যক্তিগত ইচ্ছা ও মতামত প্রকাশে হস্তক্ষেপ—অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। চিরকুটের “নত”, “ঠকিয়ে জেতা”, “গুটি” হয়ে থাকার ভাষাকে কেবল সম্পর্ক ভাঙার আবেগ বলে সরিয়ে দিলে তার অভিযোগের জায়গাটিই বাদ পড়ে যায়।


আইনের কাঠামো প্রতিকারকে শুধু ভুক্তভোগীর নিজের মুখে করা অভিযোগের ওপর রাখেনি। পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন, ২০১০-এর ১১ ধারায় সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি ছাড়াও তাঁর পক্ষে প্রয়োগকারী কর্মকর্তা, সেবা প্রদানকারী বা অন্য কোনো ব্যক্তি আদালতে প্রতিকারের আবেদন করতে পারেন। ঝুঁকি বা সহিংসতার সম্ভাবনা থাকলে অন্তর্র্বতীকালীন সুরক্ষা আদেশ, যোগাযোগ বন্ধের নির্দেশ এবং অংশীদারী বাসগৃহে অবস্থান করে সুরক্ষা, নিরাপদ আশ্রয় বা বিকল্প বাসস্থানের ব্যবস্থার সুযোগও রয়েছে। কাগজে দরজাগুলো আছে। কিন্তু দরজা থাকা আর সেখানে পৌঁছাতে পারা ভিন্ন বিষয়।  বাংলাদেশে নারীর আইনি প্রতিকারের পথ নিয়ে ঐঁসধহ জরমযঃং ডধঃপয-এর ২০২০ সালের গবেষণাতেও এই দূরত্বের চিত্র এসেছে। প্রভাবশালী অভিযুক্তের ক্ষেত্রে তদন্তে প্রভাব, পুলিশ অভিযোগ নিতে অস্বীকার করা বা গড়িমসি করা, প্রতিশোধের ভয়, দীর্ঘসূত্রতা, মামলার খরচ এবং নিরাপদ আশ্রয় ও victim-witness protection-এর ঘাটতিকে নারীর আইনি প্রতিকার পাওয়ার পথে প্রাতিষ্ঠানিক বাধা হিসেবে নথিবদ্ধ করা হয়েছে।


মরিয়মের মৃত্যুর পর তাঁর বাবা গাজী নজরুল ইসলাম, তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকসুদা বেগম ও ওবায়দুর রহমানের বিরুদ্ধে আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলা করেন। ৩০ সেপ্টেম্বর মরিয়মের বাবা আদালতে সমঝোতার দলিল দিয়ে গাজী নজরুল ও মাকসুদার জামিনে আপত্তি নেই বলে জানান। এই ঘটনাক্রমে একটি অস্বস্তিকর ব্যবধান চোখে পড়ে। মৃত্যুর পর মরিয়মের হয়ে তাঁর বাবা মামলা করতে পেরেছেন। আবার অভিযুক্তের জামিনেও আপত্তি নেই জানিয়েছেন। তাহলে মৃত্যুর আগে মরিয়মের যে অভিযোগের ভাষা এখন চিরকুটে, মামলার নথিতে ও পরিবারের বয়ানে ফিরে আসছে, সেই অভিযোগ নিয়ে মৃত্যুর আগে আইনের দরজা কোথায় ছিল—সেখানেই প্রশ্নটি এসে দাঁড়াচ্ছে।  তাছাড়া আইনের আশ্রয় নেয়া বা না নেয়া শুধু প্রভাবযুক্ত চাপের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়; এর সঙ্গে আরও অনেক কিছু জড়িত। জানতে হয় কোথায় যেতে হবে, কার কাছে যেতে হবে, অভিযোগের পর কী সুরক্ষা পাওয়া যাবে, থাকার জায়গা কোথায় হবে, যোগাযোগ বন্ধের ব্যবস্থা কে করবে এবং পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হলে সেই নারীকে কে নিরাপদ রাখবে। আইন লেখা আছে—এটি এক ধরনের বাস্তবতা। একজন ক্ষমতাসীন প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কোনো সাধারণ নাগরিক নারীর সেই আইন পর্যন্ত পৌঁছানোর পথ তৈরি আছে কি না—সেটি আরেকটি। তাই মরিয়মের নীরবতাকে তাঁর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য বানানোর আগে তাঁর অভিযোগের ভাষাটিকে দেখতে হয়। দেখতে হয়, সেই অভিযোগের সময় তাঁর সামনে আইনের কোন দরজা খোলা ছিল এবং কোন দরজা পর্যন্ত পৌঁছানো তাঁর পক্ষে কেন সম্ভব ছিল না।  


আইনের দরজা আছে। কিন্তু পথ খোলা ছিল কি না, তার উত্তর আইনের বইয়ে থাকে না। কখনো কখনো দরজা খোলা থাকলেও প্রশ্ন থেকে যায়: একজন মানুষ কি সেখানে পৌঁছানোর জায়গায় ছিলেন?

--
লেখক: শিল্পী ও কলাম লেখক   
[email protected]

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত