ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতা বাড়াতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেই নামলেন মাঠে। ঘুরে ঘুরে দেখলেন হাসপাতাল, স্কুল, সরকারি বাসাবাড়িসহ বিভিন্ন স্থাপনা। এসব জায়গায় অব্যবস্থাপনা দেখে অসন্তোষ প্রকাশ করলেন। পাশাপাশি এসব অব্যবস্থাপনা দূর করতে বেঁধে দিলেন সময়সীমা। শুধু তাই নয়, ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু সরকারের উদ্যোগের ওপর নির্ভর না করে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
গতকাল শনিবার রাজধানীর রাজউক উত্তরা মডেল কলেজে বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (বিএনসিসি) ও স্কাউট সদস্যদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী এ আহ্বান জানান। গণমাধ্যমকে এসব কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব হাসান শিপলু।
‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাজধানীর ডেঙ্গু পরিস্থিতি প্রতিরোধ ব্যবস্থা দেখতে রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাচ্ছেন। তারই অংশ হিসেবে সকালে রাজউক উত্তরা মডেল কলেজে ডেঙ্গু প্রতিরোধে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিদর্শন করেন।’
তিনি বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু সরকারের উদ্যোগের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। শিক্ষার্থী ও তরুণ প্রজন্মকে নিজেদের বাসাবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আশপাশের পরিবেশ-পরিচ্ছন্ন রাখতে কাজ করতে হবে।
‘রাজধানীর পরিচ্ছন্নতা পরিস্থিতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঢাকা একটি বিশাল শহর। এখানে দুই থেকে আড়াই কোটির বেশি মানুষের বসবাস। সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা নিয়মিত কাজ করলেও তাদের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তাই শুধু সিটি করপোরেশন বা প্রশাসনের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। নাগরিকদেরও দায়িত্ব নিতে হবে।
সকাল ৯টা ১০ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী গুলশানের বাসা থেকে বেরিয়ে প্রথমে যান কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতালে। সেখানে ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষে কার্যক্রম সম্পর্কে অবহিত হন এবং ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের সঙ্গে কথা বলেন। ‘হাসপাতালের ব্যবস্থাপনায় প্রধানমন্ত্রীর অসন্তোষ’ : সকালে কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতালে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্র (আইসিইউ), অস্ত্রোপচার কক্ষ (অপারেশন থিয়েটার) , ল্যাবরেটরিসহ বিভিন্ন বিভাগ ঘুরে দেখেন।
এ সময় তিনি রোগীদের সঙ্গে কথা বলেছেন, ‘হাসপাতালের সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও পরিচ্ছন্নতার পরিস্থিতি দেখে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। উন্নয়নে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে সাত দিনের সময় বেঁধে দেন।’
‘রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ’: কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতাল থেকে প্রধানমন্ত্রী যান রাজউক উত্তরা মডেল কলেজে। সেখানে তিনি শিক্ষক, শিক্ষার্থী, বিএনসিসি ও স্কাউট সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়ার পাশাপাশি ডেঙ্গু প্রতিরোধে শিক্ষার্থীদের ভূমিকা নিয়ে কথা বলেন।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ডেঙ্গুর সঙ্গে লড়াই করতে হলে সবচেয়ে ভালো উপায় হচ্ছে প্রতিরোধ। আর এ জন্য আমাদের চারপাশ পরিষ্কার রাখতে হবে। এ কাজে আমি তোমাদের সাহায্য চাই। দেশের বিপুলসংখ্যক তরুণ যদি নিজেদের আশপাশ পরিচ্ছন্ন রাখার দায়িত্ব নেয়, তাহলে ডেঙ্গু প্রতিরোধসহ পরিবেশ রক্ষায় বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব।’
‘ক্লিন ঢাকা : সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে হবে’ : যত্রতত্র ময়লা ফেলার প্রবণতা বন্ধে সামাজিক সচেতনতা তৈরির ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কেউ নির্ধারিত স্থানের বাইরে ময়লা ফেললে তাকে সচেতন করতে হবে। সবাই মিলে চেষ্টা করলে ঢাকা শহরকে পরিচ্ছন্ন রাখা সম্ভব।’
তিনি জানান, নগরীর বিভিন্ন স্থানে ময়লা ফেলার জন্য ডাস্টবিন স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে অনেক জায়গা থেকে এসব ডাস্টবিন চুরি হয়ে যাচ্ছে। একইভাবে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে বিভিন্ন স্থানে লাগানো গাছের চারাও চুরি হচ্ছে। এসব কর্মকান্ড প্রতিরোধে নাগরিকদের আরও সচেতন ও দায়িত্বশীল হতে হবে।
‘জন্মদিনে গাছ উপহার দাও’ : রাজউক উত্তরা মডেল কলেজে পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি দেখতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শিক্ষার্থীদের তাদের জন্মদিনে একটি করে গাছ লাগানোর পরামর্শ দিয়েছেন।
তিনি বলেন, তোমরা জন্মদিনে কিংবা নানা-নানির জন্মদিনে একটি করে গাছ লাগানোর চেষ্টা করবে। সেটা তোমার বাসায় হতে পারে, স্কুলে হতে পারে কিংবা গ্রামের বাড়িতে হতে পারে। গাছগুলো যখন বড় হবে, তোমরাও তখন বড় হবে।’
‘ঢাকার মাত্রাতিরিক্ত তাপমাত্রা প্রসঙ্গে’ : রাজধানীতে ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা ও সবুজের ঘাটতি নিয়ে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। নিজের শৈশবের স্মৃতিচারণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, একসময় ঢাকায় অনেক বেশি গাছপালা ও খোলা জায়গা ছিল। এখন সেখানে বহুতল ভবন গড়ে উঠেছে। গাছপালা কমে যাওয়ায় শহরে গরমের অনুভূতিও বেড়েছে। গাছ যত বাড়বে, আমরা তত বুক ভরে শ্বাস নিতে পারব। গাছের পাতার ঝিরঝির শব্দ আমার খুব ভালো লাগে। আমরা সবাই মিলে গাছ লাগালে শহরের তাপমাত্রাও কিছুটা কমিয়ে আনা সম্ভব।’ রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ থেকে প্রধানমন্ত্রী মিরপুর হার্ট ফাউন্ডেশনে যান।
নিজ কলেজ প্রাঙ্গণেও গেলেন প্রধানমন্ত্রী, শিক্ষার্থীদের দিলেন দেশ গড়ার বার্তা : রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আকস্মিক পরিদর্শনের একপর্যায়ে নিজের একসময়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজেও যান প্রধানমন্ত্রী। সেখানে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন। এ সময় দেশকে পরিচ্ছন্ন ও সবুজ রাখতে তরুণ প্রজন্মকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘শুধু সরকারের একার পক্ষে দেশকে পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য করে তোলা সম্ভব নয়। এ জন্য সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। বিশেষ করে তরুণদের নিজেদের বাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখার পাশাপাশি অন্যদেরও সচেতন করতে হবে।’
আজিমপুর সরকারি কোয়ার্টারে অপরিচ্ছন্নতায় ক্ষুব্ধ প্রধানমন্ত্রী, বাসযোগ্য করতে সময় দিলেন ২ সপ্তাহ : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাজধানীর আজিমপুর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কোয়ার্টারের অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ দেখে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তিনি পুরো এলাকা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে বাসযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দুই সপ্তাহের সময় বেঁধে দিয়েছেন।
পরিদর্শনকালে প্রধানমন্ত্রী কোয়ার্টারের এলাকা, চলাচলের পথ ও সার্বিক পরিবেশ ঘুরে দেখেন। এ সময় পরিচ্ছন্নতার ঘাটতি দেখে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে এর কারণ জানতে চান। তিনি কোয়ার্টারের রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থাপনা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন।
প্রধানমন্ত্রী আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে কোয়ার্টারের সার্বিক পরিচ্ছন্নতা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন।
কক্ষে ধূমপান, চিকিৎসককে বরখাস্তের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর : গতকাল রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে আকস্মিক পরিদর্শনকালে এক চিকিৎসককে নিজ কক্ষে ধূমপান করতে দেখে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী। ওই চিকিৎসকের কক্ষও অপরিচ্ছন্ন অবস্থায় দেখতে পান তিনি। এ ঘটনায় ওই চিকিৎসককে তাৎক্ষণিক বরখাস্তের নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগ ঘুরে দেখার পাশাপাশি চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের কর্মপরিবেশ এবং হাসপাতালের সার্বিক পরিচ্ছন্নতা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন তিনি।
পরিদর্শনের একপর্যায়ে হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক রফিকুল ইসলামের কক্ষে গিয়ে তাকে ধূমপান করতে দেখেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় ওই চিকিৎসকের কক্ষও অপরিচ্ছন্ন অবস্থায় ছিল। হাসপাতালের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসকের এমন আচরণ ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী তাৎক্ষণিকভাবে হাসপাতালের পরিচালনা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. একেএম আজিজুল হককে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পর চিকিৎসক রফিকুল ইসলামকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কথা শুনলেন প্রধানমন্ত্রী, দাবি বাস্তবায়নে নেওয়া হচ্ছে আশ্বাস : শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কথা শুনলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে তাদের দাবি বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। গতকাল শনিবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী কল্যাণ সমিতির সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি এ আশ্বাস দেন।
এ সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, সমাজে সবার সম্মানের সঙ্গে বাঁচার অধিকার আছে। তার সরকার বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিসহ যাদের বিশেষ মনোযোগ ও সহযোগিতা প্রয়োজন, তাদের পাশে রয়েছে। শুধু সরকার গঠনের পরই নয়, এর আগেও তিনি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন এবং তাদের সমস্যার কথা শুনেছেন।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী কল্যাণ সমিতির (ইচকঝ) প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক আব্দুস সাত্তার দুলালের সঞ্চালনায় ৩০ প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও প্রতিবন্ধী সংগঠনের প্রতিনিধিরা বক্তব্য দেন। তারা নিজেদের বিভিন্ন দাবি ও সমস্যার কথা প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রী তাদের বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শোনেন এবং তাৎক্ষণিকভাবে বেশ কিছু দাবি মেনে নেন।
প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য জাতীয় বাজেটে বরাদ্দ বৃদ্ধি, দক্ষতা উন্নয়ন, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ততা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির দাবি জানান বক্তারা। বিশেষ করে সরকারি প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও আদালতে ইশারা ভাষার দোভাষী নিয়োগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তারা। জবাবে প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে আদালত ও হাসপাতালে ইশারা ভাষার দোভাষী নিয়োগের বিষয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন।
অনুষ্ঠানে মো. মহসিন নামে একজন প্রতিবন্ধী ক্রীড়াবিদ প্রধানমন্ত্রীর জন্য একটি ক্যাপ উপহার এনেছেন বলে জানালে প্রধানমন্ত্রী মঞ্চ থেকে নেমে এসে তা গ্রহণ করেন। এ সময় বিদেশে খেলাধুলায় অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে তার দলকে সহযোগিতা করারও আশ্বাস দেন প্রধানমন্ত্রী। অনুষ্ঠান শেষে উপস্থিত বক্তাদের অনুরোধে প্রধানমন্ত্রী তাদের সঙ্গে ফটোসেশনে অংশ নেন।
এ সময় আরও বক্তব্য দেন সমাজকল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন, প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন, এমপি এবং প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এবিএম আব্দুস সাত্তার।