গাজীপুর থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত যাতায়াত সহজ করতে নেওয়া হয়েছিল বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্প। পরিকল্পনা ছিল, সড়কের মাঝখানে নির্দিষ্ট লেনে চলবে দ্রুতগতির বাস। যানজটে আটকে থাকতে হবে না, কম সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবেন যাত্রীরা। কিন্তু প্রকল্প শুরুর প্রায় ১৪ বছর পরও সেই সেবা চালু করতে পারেনি কোনো সরকার। উল্টো প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ নিয়েই তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।
৪ হাজার ২৬৮ কোটি ৩২ লাখ টাকা ব্যয়ের প্রকল্পটিতে এ পর্যন্ত খরচ হয়েছে ২ হাজার ৮১০ কোটি ৬২ লাখ টাকা। নির্মিত হয়েছে উড়ালসড়ক, বাস চলাচলের পৃথক লেন ও স্টেশনসহ নানা অবকাঠামো। এসব অবকাঠামো ব্যবহার করে বিআরটি চালু করা হবে, নাকি পরিকল্পনা বদলে করিডরটিকে টোল এক্সপ্রেসওয়ে কিংবা ছয় লেনের সাধারণ সড়কে রূপান্তর করা হবে তা এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি সরকার। বিআরটি করিডর বাস্তবায়নসহ আরও তিনটি প্রস্তাবনা নিয়ে আজ আলোচনা হতে পারে মন্ত্রিসভায়। সেখানেই ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হতে পারে এ প্রকল্পের।
বিআরটি নিয়ে গত জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে বৈঠক হয়। পরে প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে বিভিন্ন বিকল্প নির্ধারণ করতে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি করে দেওয়া হয়। সেই কমিটির প্রস্তাবের আলোকে মন্ত্রিসভার জন্য তৈরি সরকারি সারসংক্ষেপ তৈরি করা হয়েছে। যেখানে চারটি প্রস্তাব রয়েছে। আজ রবিবার বিকেলে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
মূল কাঠামো বদলে তিন ধারণা : মন্ত্রিসভার বৈঠকের জন্য তৈরি করা প্রস্তাবনায় প্রথম বিকল্পে বিদ্যমান স্টেশন, টার্মিনাল ও ডিপো ব্যবহার করে বাস-রুট ফ্র্যাঞ্চাইজির আওতায় অন্তর্বর্তী বাসসেবা চালুর কথা বলা হয়েছে। পরে সেটিকে পূর্ণাঙ্গ বিআরটি ব্যবস্থায় রূপান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে বিদ্যমান অবকাঠামো কাজে লাগিয়ে যাত্রীসেবা চালুর সুযোগ থাকবে।
দ্বিতীয় বিকল্পে বিআরটির নির্দিষ্ট বাস লেনকে টোলের বিনিময়ে চলাচলযোগ্য এক্সপ্রেসওয়েতে রূপান্তরের প্রস্তাব রয়েছে। অর্থাৎ, বাসের জন্য নির্ধারিত করিডরকে যানবাহন চলাচলের উপযোগী সড়ক হিসেবে ব্যবহার করা হবে। এ ক্ষেত্রে বিদ্যমান অবকাঠামোর কী ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন হবে, তা গুরুত্বপূর্ণ।
তৃতীয় বিকল্পে বিআরটির স্টেশন, পৃথক লেন ও ডিভাইডার সরিয়ে করিডরটিকে ছয় লেনের সাধারণ সড়ক হিসেবে চালুর কথা বলা হয়েছে। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে গেলে নির্মিত অবকাঠামোর একটি অংশ অপসারণ করতে হবে। ফলে নতুন করে ব্যয়, অবকাঠামোর ব্যবহারযোগ্যতা এবং জনগণের অর্থের সর্বোত্তম ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অন্যদিকে, বিআরটি প্রকল্পের মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী অবশিষ্ট প্রায় ৩ শতাংশ অবকাঠামোগত কাজ শেষ করে বাস কেনা ও পরিচালনাব্যবস্থা নিশ্চিত করার প্রস্তাব রয়েছে। এই বিকল্পে নতুন করে সড়কব্যবস্থা সাজানোর পরিবর্তে নির্ধারিত লেনে দ্রুতগতির বাস চালু করাই হবে লক্ষ্য।
বিশেষজ্ঞদের মতবিরোধ : প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মো. শামসুল হকের নেতৃত্বে বিশেষজ্ঞ দল প্রকল্পটিকে বিআরটি হিসেবে চালু না করে বিদ্যমান অবকাঠামো কাজে লাগিয়ে উন্নত মহাসড়ক তৈরির সুপারিশ করেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক এম মোসলেহ উদ্দিন হাসান নির্মিত অবকাঠামো ব্যবহার করে বিআরটি চালুর পক্ষে মত দিয়েছেন। পরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামানও পর্যায়ক্রমে বিআরটি চালুর পক্ষে।
বিশেষজ্ঞদের মতভেদের মূল জায়গা হলো, নির্মিত অবকাঠামো ব্যবহার করে কত দ্রুত ও কী পরিমাণ অতিরিক্ত ব্যয়ে যাত্রীসেবা চালু করা সম্ভব। অন্যদিকে, সড়কব্যবস্থা পরিবর্তন করলে কী ধরনের অবকাঠামোগত পরিবর্তন প্রয়োজন হবে এবং নতুন করে কতটা বিনিয়োগ করতে হবে, সেটিও সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
বিআইপির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক এম মোসলেহ উদ্দিন হাসানের প্রস্তাব অনুযায়ী, অব্যবহৃত অর্থ কাজে লাগিয়ে আগামী ছয় থেকে ১২ মাসের মধ্যে প্রাথমিক পর্যায়ের বিআরটি চালু করা সম্ভব। এ জন্য অতিরিক্ত প্রায় ৩০০ কোটি টাকা লাগতে পারে। পরে আধুনিক বৈদ্যুতিক বাস চালু করতে আরও প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে বলে সংস্থাটি জানিয়েছে। বিআরটি কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদে বিশেষজ্ঞ ও পেশাজীবীদের অন্তর্ভুক্ত করা এবং অন্যান্য জেলা শহরেও বিআরটি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নেওয়ার সুপারিশ করেছে বিআইপি।
অন্যদিকে, বুয়েটের বিশেষজ্ঞদলের মূল্যায়নে প্রকল্পের পরিকল্পনা, নকশা ও বাস্তবায়নের দুর্বলতা এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতার বিষয় উঠে এসেছে। তাদের সুপারিশে বিআরটি হিসেবে প্রকল্পটি চালু না করে করিডরটিকে দ্রুতগতির সড়ক হিসেবে ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। ফলে সরকারের সিদ্ধান্তে নির্মিত অবকাঠামো কাজে লাগানোর সম্ভাবনা এবং সড়কব্যবস্থা পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা দুই দিকই বিবেচনায় নিতে হবে।
দ্রুত চালুর দাবি, সাত দফা প্রস্তাব : প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে সরকারের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থাকলেও বিআরটি ভেঙে ফেলা বা পরিত্যক্ত রাখার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন গাজীপুরের সচেতন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। গতকাল শনিবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির শফিকুল কবির মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলনে তারা দ্রুত বিআরটি চালুর দাবি জানান। লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (ডুয়েট) সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. খসরু মিয়া।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, দুর্বল যোগাযোগব্যবস্থা, দীর্ঘ যাত্রাসময়, তীব্র যানজট ও অকার্যকর গণপরিবহনের কারণে গাজীপুরের শিল্প-বাণিজ্যের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। প্রতিদিন ঢাকা ও গাজীপুরের মধ্যে যাতায়াতকারী মানুষকে দীর্ঘ সময় যানজটে আটকে থাকতে হচ্ছে। এতে কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, উৎপাদনশীলতা কমছে এবং যাতায়াত ব্যয় বাড়ছে।
বিআরটি চালু হলে দ্রুত, নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য গণপরিবহনসেবা নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি ঢাকার ওপর চাপ কমবে বলে মত দেন তারা। একই সঙ্গে গাজীপুরে আবাসন, রিয়েল এস্টেট, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হোটেল খাতের বিকাশের সুযোগ বাড়বে বলেও উল্লেখ করা হয়।
ব্যয় বেড়েছে, মেয়াদও পেরিয়েছে : ২০১২ সালে বিমানবন্দর থেকে গাজীপুরের শিববাড়ী পর্যন্ত প্রায় ২০ দশমিক ৫ কিলোমিটার বিআরটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। শুরুতে ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ২ হাজার ৪০ কোটি টাকা। ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে প্রকল্পটি শেষ করার লক্ষ্য ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় কয়েক দফায় বাড়ানো হয় মেয়াদ ও ব্যয়। পরে প্রকল্পের অনুমোদিত ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৪ হাজার ২৬৮ কোটি ৩২ লাখ টাকা, যা প্রাথমিক ব্যয়ের দ্বিগুণেরও বেশি।
প্রকল্প তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষ পর্যন্ত প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ২ হাজার ৮১০ কোটি ৬২ লাখ টাকা। প্রকল্পের নির্ধারিত সমাপ্তির তারিখ ছিল ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর। অর্থাৎ, নির্ধারিত মেয়াদ পেরিয়ে গেলেও পুরো প্রকল্প চালু করা সম্ভব হয়নি। ২০২৫ সালে প্রকল্পের চতুর্থ সংশোধনী প্রস্তাবে ব্যয় বাড়িয়ে প্রায় ৬ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকা এবং মেয়াদ ২০২৯ সাল পর্যন্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তবে একনেক তা অনুমোদন করেনি। বরং প্রকল্পের বিকল্প ব্যবহার পর্যালোচনা এবং পরিকল্পনা ও নকশাগত ত্রুটির জন্য দায়ীদের চিহ্নিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
সরকারি হিসাবে সামগ্রিক অগ্রগতি ৭৭ দশমিক ৪৬ শতাংশ এবং সিভিল ওয়ার্কসের অগ্রগতি প্রায় ৯৭ শতাংশ উল্লেখ করা হয়েছে। গাজীপুরের সচেতন নাগরিক সমাজ প্রায় ৯৭ শতাংশ কাজ শেষ হওয়ার কথা তুলে ধরে দ্রুত বিআরটি চালুর দাবি জানিয়েছে।
সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব মোহাম্মদ জিয়াউল হক জানিয়েছেন, বিআরটি প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে চারটি বিকল্প প্রধানমন্ত্রীর সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে। বিকল্পগুলো পর্যালোচনা করে প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা রয়েছে।