লাইসেন্সহীন ৫ শতাধিক হোটেল-রিসোর্ট

আপডেট : ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:১৫ এএম

কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে ইনানীর পাটুয়ারটেক। এখানে পর্যটকদের বিনোদনের জন্য গড়ে উঠেছে টুপটুপ রেস্তোরাঁ অ্যান্ড রিসোর্টসহ অর্ধশতাধিক রিসোর্ট ও কটেজ। কাঠ, বাঁশ দিয়ে তৈরি এসব রিসোর্ট পরিবেশবান্ধব হলেও এগুলোর নেই কোনো অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা। নেই ফায়ার সার্ভিসের লাইসেন্স ও পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র। এমনকি রিসোর্ট নির্মাণে নেওয়া হয়নি কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ও ব্যবসা পরিচালনার জন্য জেলা প্রশাসনের অনুমতি। শুধু পাটুয়ারটেকের রিসোর্ট ও কটেজ নয়, প্রশাসনিক তদারকির অভাবে এভাবে অনুমোদনহীনভাবেই চলছে জেলার প্রায় ৫ শতাধিক হোটেল, মোটেল, কটেজ, রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁ।

জেলা প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স এবং পরিবেশ অধিদপ্তর ও হোটেল মোটেল মালিক সমিতির কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, ছোট বড় মিলিয়ে কক্সবাজার জেলা শহর, রামুর পেচারদ্বীপ ও ইনানীসহ এর আশপাশে প্রায় ৬ শতাধিক হোটেল মোটেল, রিসোর্ট, কটেজ রয়েছে। এর অধিকাংশ সংশ্লিষ্ট পৌরসভা কিংবা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে শুধু ট্রেড লাইসেন্স সংগ্রহ করেই কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

কক্সবাজার হোটেল মোটেল মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম বলেন, আমাদের সমিতির তালিকাভুক্ত প্রায় সব হোটেলেরই সব ধরনের অনুমোদন রয়েছে। তবে কক্সবাজারের বেশিরভাগ রিসোর্ট ও কটেজের অনুমোদন নেই। এরা কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা করে না। তাই এদের আমরা সমিতির অন্তর্ভুক্ত করিনি। প্রশাসনের উচিত তাদের একটি নিয়মে এনে পর্যটন শিল্পকে এগিয়ে নেওয়া।

এই বিষয়ে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের লাইসেন্স শাখার কক্সবাজার ইন্সúেক্টর শফিকুল ইসলাম বলেন, আমাদের কাছ থেকে চলতি বছরে মাত্র ৫০টি হোটেল লাইসেন্স নবায়ন করেছে। তবে আবেদন জমা পড়েছে সর্বোচ্চ ১০০টি। কিন্তু এর আগে প্রায় ২০০ হোটেলের লাইসেন্স ছিল। এ জন্য আমরা অধিকাংশ হোটেলকেই নোটিস দিয়েছি। ট্রেড লাইসেন্স নেওয়ার সময় ফায়ার লাইসেন্সও তদারকি করা হলে তারা তা সংগ্রহ করবে।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কক্সবাজারের উপ-পরিচালক (ফায়ার) সৈয়দ মুহাম্মদ মোরশেদ বলেন, কক্সবাজারে ব্যাঙের ছাতার মতো হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট রয়েছে। এর সঠিক পরিসংখ্যান নেই। এই যে দুর্ঘটনার আগে এই রিসোর্টকে আমরা দুইবার নোটিস দিয়েছি। কিন্তু তারা সতর্ক হয়নি। অগ্নিনির্বাপণের ব্যবস্থা নেয়নি। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের সচেতন হতে হবে। নতুবা এমন দুর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব হবে না।

শুধু ফায়ার লাইসেন্স নয় অধিকাংশ হোটেল মোটেল রিসোর্ট, কটেজ ও রেস্তোরাঁর স্যুয়ারেজ ব্যবস্থাও নেই। এরা পরিবেশ ছাড়পত্র ও নেয়নি। এ বিষয়ে পরিববেশ অধিদপ্তরের কক্সবাজারের উপ-পরিচালক খন্দকার মাহমুদ মোর্শেদ বলেন, জেলার সর্বোচ্চ ৫০টি হোটেলের পরিবেশ ছাড়পত্র রয়েছে। ছাড়পত্র না থাকায় গত এক বছরে ৫৮টি হোটেল, মোটেল, রেস্তোরাঁ, রিসোর্ট ও কটেজ থেকে প্রায় দেড় কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছে। একই সময়ে ইসি এলাকায় অবস্থিত শতাধিক হোটেলের বিরুদ্ধে ২৮টি মামলা করা হয়েছে। সাধারণত ২০ কক্ষের নিচের আবাসিক হোটেলের ক্ষেত্রে পরিবেশ ছাড়পত্র লাগে না। এ ছাড়া ৩০ লাখ টাকা নিচের রেস্তোরাঁর ক্ষেত্রে অনুমোদনের দরকার নেই। আর এই সুযোগটিকেই কৌশল হিসেবে ব্যবহার করছেন কিছু ব্যবসায়ী।

এদিকে জেলা প্রশাসনের তথ্য বলছে, কক্সবাজারের দুই শতাধিক হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট ও কটেজ অনুমোদনের জন্য আবেদন এসেছে। এর মধ্যে ৫০টির মতো প্রতিষ্ঠানের সব কাগজপত্র ঠিক থাকায় তাদের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বাকিদের প্রয়োজনীয় কাগজ জমাদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

কক্সবাজার নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও বিএনপি নেতা রাশেদ মুহাম্মদ আলী বলেন, একটি দুর্ঘটনা ঘটলেই প্রশাসন নড়েচড়ে বসে। তদন্ত কমিটি গঠন করে। কিন্তু এর আগে এরা কোথায় থাকে। এদের কাছে তো কক্সবাজার জেলায় কতগুলো আবাসিক হোটেল মোটেল রিসোর্ট কটেজ রয়েছে তার হিসাবও নেই । অথচ পর্যটন সেল, বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটিসহ কত হাবিজাবি কমিটি রয়েছে। এই সেলের কাজ কী? কীভাবে অনুমোদন ছাড়া, ফায়ার লাইসেন্স ছাড়া এতগুলো প্রতিষ্ঠান দিনের পর দিন ব্যবসা করছে তা তদন্ত করে দেখা উচিত।

অধিকাংশ হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট ও কটেজের অনুমোদন না থাকার বিষয়টি স্বীকার করে জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মান্নান বলেন, ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তর, পর্যটন করপোরেশন, কউক ও জেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে পর্যটন মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হবে। তাদের নির্দেশনা এলে তা বাস্তবায়ন করা হবে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত