শিক্ষা ও চাকরির আশায় যে সমাজের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন মোহাম্মদ আলতাফ হোসেন, আজ সেই সমাজের শিশুদের হাতেই তুলে দিচ্ছেন শিক্ষার আলো। জন্মগতভাবে দুই হাত না থাকলেও থেমে থাকেনি তার পথচলা। পা দিয়ে ব্ল্যাকবোর্ডে লেখা প্রতিটি অক্ষর যেন প্রতিকূলতাকে জয় করার একেকটি গল্প। আর তার প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়ের প্রতিটি শিক্ষার্থী যেন তার দীর্ঘ সংগ্রামের পথে অর্জিত একেকটি সাফল্য।
দুখু মিয়া
১৯৬৪ সালে নরসিংদী সদর উপজেলার নগর পাঁচদোনা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আলতাফ হোসেন। পেশায় তাঁতি তমিজ উদ্দিনের ঘরে পরপর দুই সন্তান মারা যাওয়ার পর জন্ম হয় তার। কিন্তু জন্মগতভাবে দুই হাত না থাকায় নবজাতক সন্তানকে দেখে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন মা। দাদা নাতির নাম রাখেন ‘দুখু মিয়া’। হয়তো দুঃখই তার সারা জীবনের সঙ্গী হবে, এমন আশঙ্কা ছিল অনেকের। কিন্তু সেই দুঃখকে জয় করেই আজ তিনি হয়ে উঠেছেন এলাকার মানুষের অনুপ্রেরণা।
পড়া হলো না কাক্ষিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে
বাবার ইচ্ছা ছিল ছেলেকে মাদ্রাসায় পড়িয়ে বড় আলেম হিসেবে গড়ে তুলবেন। সেই স্বপ্ন নিয়ে দুখু মিয়াকে সঙ্গে করে মাদ্রাসায় ভর্তি করাতে যান তিনি। কিন্তু সেখানে দায়িত্বে থাকা শিক্ষক তাদের জানান, পা দিয়ে আরবি লেখা সম্ভব নয়। হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরতে হয় তাদের।
তবে ছেলের শিক্ষার স্বপ্ন থেকে সরে আসেননি বাবা। বাড়িতে ফিরে পাতিলের কালি ও পানি মিশিয়ে কালি তৈরি করেন। বাঁশের চিকন কঞ্চি দিয়ে বানিয়ে দেন কলম। সেই কলম পায়ের দুই আঙুলে ধরে ধীরে ধীরে লিখতে শেখেন দুখু মিয়া। এরপর পাঁচদোনা ইউনিয়নের দীঘিরপাড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শুরু হয় তার শিক্ষাজীবন।
দুই হাত না থাকায় সহপাঠীদের কাছ থেকে নানা বঞ্চনা ও মানসিক কষ্টের শিকার হয়েছেন তিনি। অনেকবার ভেঙে পড়লেও পড়াশোনা থেকে পিছিয়ে যাননি। ১৯৮১ সালে বাটপাড়া এনসি গুপ্ত উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক পাস করেন। পরে নরসিংদী সরকারি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক এবং ১৯৮৬ সালে বিএ সম্পন্ন করেন। মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও ডিগ্রি তিনটি পরীক্ষাতেই দ্বিতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হন তিনি। সে সময় কোনো অতিরিক্ত সময় ছাড়াই অন্য শিক্ষার্থীদের মতো নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পরীক্ষা দিতে হয়েছে তাকে। পড়াশোনার পাশাপাশি ফুটবলের প্রতিও ছিল তার প্রবল আগ্রহ। বন্ধুদের সঙ্গে জেলার বিভিন্ন স্থানে ফুটবল খেলতে যেতেন আলতাফ হোসেন।
শিক্ষা মিললেও মেলা না চাকরি
পড়াশোনা শেষ হওয়ার পর আলতাফ হোসেনের জীবনে শুরু হয় কঠিন অধ্যায়। তিনটি সনদ অর্জন করেও কোথাও চাকরির সুযোগ পাচ্ছিলেন না তিনি। শারীরিক প্রতিবন্ধিতার কারণে চাকরির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছিলেন তিনি। বিভিন্ন চাকরির লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেও মৌখিক পরীক্ষায় তাকে দেখে বাদ দেওয়া হতো। চাকরির আশায় বিভিন্ন মন্ত্রী ও সরকারি কর্মকর্তার দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন, কিন্তু কাক্সিক্ষত চাকরি মেলেনি।
নিজ উদ্যোগেই স্কুল প্রতিষ্ঠা
ছোটবেলা থেকেই শিক্ষকতার প্রতি ছিল তার বিশেষ আগ্রহ। অবশেষে চাকরির আশা ছেড়ে টিউশনি শুরু করেন। ১৯৮৮ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত নরসিংদীর বিভিন্ন এলাকায় শিক্ষার্থীদের পড়িয়ে সংসার চালিয়েছেন। যাতায়াতের অসুবিধা ও শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে গিয়ে পড়ানো ছিল কষ্টসাধ্য। তবু থেমে থাকেননি তিনি।
অবশেষে ২০০৭ সালে নিজের জমানো টাকা এবং বাবার ১৫ শতক জমি বিক্রি করে পাওয়া অর্থ দিয়ে লিজ নেওয়া জায়গায় প্রতিষ্ঠা করেন ‘প্রতিভা দুখু মিয়া কিন্ডারগার্টেন। প্রায় ছয় হাজার টাকা পুঁজি এবং ৩৩ জন শিক্ষার্থী নিয়ে শুরু হয় বিদ্যালয়টির যাত্রা। বর্তমানে প্লে থেকে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান করা ১৪৫ জন শিক্ষার্থী ও ১০ জন শিক্ষক রয়েছেন বিদ্যালয়টিতে। বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকে একক প্রচেষ্টায় এটি পরিচালনা করে আসছেন আলতাফ হোসেন। অনেকেই সহায়তার আশ্বাস দিলেও বাস্তবে প্রত্যাশিত সহযোগিতা পাননি বলে জানান তিনি।
বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, ছোট শিক্ষার্থীদের শরীরচর্চা করাচ্ছেন দুখু মিয়া। টিনশেড ভবনের একটি শ্রেণিকক্ষে পা দিয়ে ব্ল্যাকবোর্ডে লিখছেন, গল্পের ছলে হাসিমুখে বুঝিয়ে দিচ্ছেন পাঠ। দুই হাত না থাকা তার পাঠদানের পথে যেন কোনো বাধাই নয়।
আলতাফ হোসেন বলেন, ‘আমি এলাকার শিশুদের মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যেতে চাই। একই সঙ্গে চাই, কোনো প্রতিবন্ধী শিশু যেন শিক্ষা নিতে এসে আমার মতো হেয়প্রতিপন্ন না হয়। এ লক্ষ্যেই প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে পড়াশোনার ব্যবস্থা রেখেছি।’
হাজার মানুষের অনুপ্রেরণা
মাধবদী ও নগর পাঁচদোনা এলাকায় শিক্ষক দুখু মিয়া নামেই পরিচিত আলতাফ হোসেন। এলাকার বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে রয়েছে তার অসংখ্য সাবেক শিক্ষার্থী। তাদের কেউ চিকিৎসক, কেউ আইনজীবী, কেউবা প্রকৌশলী। প্রতিষ্ঠিত শিক্ষার্থীরা দেখা করতে এলে গর্বে ভরে ওঠে বুক, আনন্দে চোখে পানি চলে আসে তার। নিজের সন্তানকেও উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করেছেন তিনি। তাদের একজন মোহাইমিনুল ইসলাম তার প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়েই সহকারী শিক্ষক হিসেবে কাজ করছেন। মোহাইমিনুল ইসলাম বলেন, ‘শত প্রতিকূলতা পেরিয়ে বাবা সমাজে শিক্ষার প্রসারে কাজ করছেন। এর চেয়ে আনন্দের আর কী হতে পারে!’
স্থানীয় বাসিন্দা জামাল উদ্দিন বলেন, ‘দুখু মিয়ার জীবন কষ্টের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দুই হাত না থাকলেও তিনি সমাজে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিচ্ছেন।’
সহকারী শিক্ষক মাহি বলেন, ‘দুই হাত না থাকা সত্ত্বেও স্যার অত্যন্ত নিষ্ঠা, মেধা ও পরিশ্রম দিয়ে বিদ্যালয়টি পরিচালনা করছেন। তিনি আমাদের প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য অনন্য অনুপ্রেরণা। স্যারের জীবনসংগ্রাম থেকে আমরা শিখি, ইচ্ছাশক্তি ও আত্মবিশ্বাস থাকলে প্রতিকূলতা জয় করে অনেক দূর এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। তার এই পথচলা আমাদের সাহস জোগায় তিনি পারলে, আমরাও পারব।’
পেলেন প্রধানমন্ত্রীর উৎসাহ
সম্প্রতি (১৪ অক্টোবর) রাজধানীর সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন আলতাফ হোসেন। এ সময় তার সঙ্গে আরও সাক্ষাৎ করেন বুয়েট থেকে পাস করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা পেশা বেছে নেওয়া নায়লা শারাফ এবং নিজ উদ্যোগে হাজার হাজার গাছ লাগানো ভোলার রেজাউল কিবরিয়া বাবুল। প্রধানমন্ত্রী তাদের জীবনসংগ্রাম, ব্যতিক্রমী উদ্যোগ ও সমাজের কল্যাণে পরিচালিত কার্যক্রমের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন। তিনি তিনজনের উদ্যোগের প্রশংসা করে বলেন, সমাজ ও দেশের কল্যাণে ব্যক্তিগত উদ্যোগে কাজ করা মানুষের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের উদ্যোগ অন্যদেরও ভালো কাজে এগিয়ে আসতে উৎসাহিত করবে।
এ সময় প্রধানমন্ত্রী তাদের নিজ নিজ কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে উৎসাহ দেন এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দেন।