দেশে মাদকের আগ্রাসন তরুণ সমাজ ও পরিবারের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ, সীমান্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে শহরের অলিগলিতে মাদকদ্রব্য খুব সহজে পাওয়া যাচ্ছে। তরুণ প্রজন্ম অবক্ষয়ের স্রোতে ভেসে যাচ্ছে। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীসহ তরুণ সমাজ ইয়াবা, গাঁজা, ফেনসিডিল ও আইসের মতো নানা ধরনের মাদকে আসক্ত হচ্ছে। এটি এখন গুরুতর জাতীয় সমস্যা। সমস্যাটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে বলে অনেকের ভাষ্য। গভীর উদ্বেগের হলো, আইনি সংস্থাগুলো একে কেবল সাধারণভাবে আইনশৃঙ্খলাজনিত একটি বিষয় হিসেবে মোকাবিলার গতানুগতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখার প্রয়াস পাচ্ছে।
পৃথিবীর সর্বত্র মাদকের বিস্তার বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। পরিবারের অসহায়ত্ব, মাদকসেবীদের মানসিক বিকৃতি সমাজ-সভ্যতার পথে কঠিন অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। পারিবারিক অশান্তি, সামাজিক অস্থিরতার ধারাবাহিকতায় নৃশংসতা-সহিংসতা চরম রূপ পরিগ্রহ করেছে। মানুষ আর মানুষের মধ্যে বসবাস করছে না। বিকলাঙ্গ উদ্ভট আচরণে চারদিকে হাহাকার। রাষ্ট্র-জাতিভেদে মানবিক বিপর্যয় শুধু দীর্ঘায়িত হচ্ছে। প্রচলিত রীতিনীতি, নৈতিকতা, আদর্শিক চেতনার অভাব, মানবিক গুণাবলিকে গভীর সংকটে নিপতিত করছে। ধনী-দরিদ্র, জাতিভেদ, অসম যুদ্ধ-বিগ্রহ এবং এর ফলে বেকারত্ব, দারিদ্র্য ও কুৎসিত সামাজিক অনাচার সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে। মাদকের অপব্যবহার শুধু যুব সমাজ নয়; সমগ্র সমাজের সচল ভিত্তিকে দুর্বল করে ফেলেছে। মানবিক মূল্যবোধের এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে মানবিকতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও মমত্ববোধ হিংসা-বিরোধ থেকে সমাজকে সুস্থ রাখার উপায়। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক কার্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত ‘বিশ্ব মাদক প্রতিবেদন ২০২৬’ এর তথ্য মতে, ২০২৪ সালে বিশ্বজুড়ে ৩৩ কোটি ১০ লাখ মানুষ অন্তত একবার মাদক সেবন করেছে। এক দশকে বিশ্বব্যাপী গাঁজা ব্যবহারকারীর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে এবং এই প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। ২০১৪ সালে ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সী মানুষের মধ্যে গাঁজা ব্যবহারের হার ছিল ৩ দশমিক ৮ শতাংশ। এক দশক পর ২০২৪ সালে সেই হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৮ শতাংশেরও বেশি। মাত্র ১০ বছরের ব্যবধানে বিশ্বে গাঁজা ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। মহাদেশভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায় গাঁজা ব্যবহারে সর্বোচ্চ স্থানে রয়েছে উত্তর আমেরিকা। এর পরই এশিয়ার অবস্থান। এই মহাদেশে নিয়মিত গাঁজা সেবন করে ৬ কোটি ৮৫ লাখেরও বেশি মানুষ। এরপর রয়েছে আফ্রিকা। যেখানে গাঁজাসেবীর সংখ্যা ৬ কোটি ৫১ লাখের অধিক। তাছাড়া ইউরোপ, দক্ষিণ আমেরিকা ও ওশেনিয়াতে মাদক ব্যবহারকারীর সংখ্যা যথাক্রমে ৩ কোটি ১৩ লাখ, ১ কোটি ৫৭ লাখ ও ৩ কোটির বেশি মানুষ। প্রতিবেদনে কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, নিউজিল্যান্ড, স্পেন, উরুগুয়ে এবং অস্ট্রেলিয়ায়ও গাঁজা ব্যবহারের প্রবণতার চিত্র রয়েছে।
বাংলাদেশে মাদকের উদ্বেগজনক বিস্তার পরিলক্ষিত। মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা, বিশেষ অভিযান পরিচালনায়ও বন্ধ হয়নি মাদকের বিস্তার। দেশজুড়ে এর জাল দিন দিন আরও শক্তিশালী হয়েছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত গবেষণা ফলাফলের পরিসংখ্যান অনুসারে, দেশে প্রায় ৮২ লাখ মানুষ কোনো না কোনো ধরনের মাদক ব্যবহার করছে। যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ। যাদের অধিকাংশই তরুণ। এদের মধ্যে প্রায় ৩৩ শতাংশ প্রথম মাদক সেবন করেছে ৮-১৭ বছর বয়সে। ১৮-২৫ বছর বয়সে সেবন করেছে ৫৯ শতাংশ। সংখ্যার দিক থেকে সর্বাপেক্ষা বেশি মাদক সেবনকারী ঢাকায়। যার সংখ্যা ২২ লাখ ৮৭ হাজার ৯৭০ জন। ১৮ লাখ ৭৯ হাজার ৫০৩ জন নিয়ে চট্টগ্রামের অবস্থান দ্বিতীয়। তৃতীয় স্থানে থাকা রংপুরের মাদকসেবীর সংখ্যা ১০ লাখ ৮০ হাজার ৫৮৮ জন। এরপর পর্যায়ক্রমে রয়েছে ময়মনসিংহে ৭ লাখ ৬০ হাজার, খুলনায় ৭ লাখ ২৬ হাজার ২১০, রাজশাহীতে ৫ লাখ ৬৬ হাজার, সিলেটে ৪ লাখ ৮৮ হাজার ১৪১ ও বরিশালে ৪ লাখ ৪ হাজার ১১৮ জন। সম্প্রতি গণমাধ্যমে প্রকাশিত বেসরকারি সংগঠন মাদকদ্রব্য ও নেশা নিরোধ সংস্থা ‘মানস’র সূত্রমতে, দেশে প্রতি ১৭ জন তরুণের মধ্যে একজন মাদকাসক্ত। মাদকাসক্তদের মধ্যে ৮৪ শতাংশ পুরুষ এবং ১৬ শতাংশ নারী। তাদের মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ যুবক। বর্ণিত গবেষণায় আরও উপস্থাপিত যে, মাদকসেবীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সেবন করে গাঁজা। এরা অন্য মাদকেও আসক্ত। গাজা সেবনকারীর সংখ্যা হচ্ছে ৬০ লাখ ৭৯ হাজার ৯১৪ জন। ইয়াবা ২২ লাখ ৯২ হাজার ৭০৫, অ্যালকোহল ২০ লাখ ২০ হাজার ৯৭৭, কোডিন ফসফেট (কফ সিরাপ) ৩ লাখ ৩৯ হাজার ৬৬০, হেরোইন ৩ লাখ ২২ হাজার ৬৭৭, ঘুমের ওষুধ ৩ লাখ ৫ হাজার ৬৯৪, ইনহেল্যান্ট (যেমন: আঠা, পেইন্ট থিনার) ১ লাখ ৫২ হাজার ৮৪৭, ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক ৩৯ হাজার ৬১, ক্রিস্টাল মেথ (আইস) ১১ হাজার ৮৮৮, এলএসডি ৫ হাজার ৯৫ এবং অন্যান্য মাদক সেবনকারীর সংখ্যা ১ লাখ ৩৫ হাজার ৮৬৪ জন।
দেশে প্রচলিত মাদকগুলো হলো ইয়াবা, ফেনসিডিল, হেরোইন, গাঁজা, চোলাই, দেশি-বিদেশি মদ, দেশি-বিদেশি বিয়ার, রেক্টিফায়েড স্পিরিট, ডিনেচার্ড স্পিরিট, তাড়ি, প্যাথেডিন, বুপ্রেনরফিন (টি.ডি জেসিক ইনজেকশন), ভাং, কোডিন ট্যাবলেট, ফার্মেন্টেড ওয়াশ (জাওয়া), বুপ্রেনরফিন (বনোজেসিক ইনজেকশন), মরফিন, ভায়াগ্রা, সানাগ্রা, টলুইন, পটাশিয়াম পারম্যাংগানেট ও মিথাইল-ইথাইল কিটোন ইত্যাদি। কালক্রমে দেশে নীরবে ছড়িয়ে পড়েছে নতুন প্রজন্মের বিচিত্র অনেক মাদক। এর মধ্যে সর্বাধিক পরিচিত সিনথেটিক বা কৃত্রিম মাদক। অধিক ব্যয়বহুল এই মাদকগুলোর মধ্যে রয়েছে এমডিএমবি, এলএসডি, ব্রাউনি, ক্রিস্টাল মেথ বা আইস, ফেন্টানাইল, ব্ল্যাক কোকেন, এমডিএমএ, ডিএমটি, ডিওবি, কুশ, ট্যাপেন্টডল, ট্রামাডল, কিটামিন, এমফিটামিন পাউডার, ডায়েমেখিল ট্রাইপ্টেমিন, এস্কাফ ও ম্যাজিক মাশরুমের মতো ভয়ানক আরও বেশ কিছু মাদক। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাবি, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শহরে তরুণদের বড় অংশের মধ্যে নতুন এই মাদকের ব্যবহার বাড়ছে, যা জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তার জন্য নতুন হুমকি হিসেবে প্রতিভাত। ভৌগোলিক কারণে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালানের রুট ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল’ (মিয়ানমার-থাইল্যান্ড-লাওস) এবং ‘গোল্ডেন ক্রিসেন্ট’ (পাকিস্তান-আফগানিস্তান-ইরান) এর মাঝামাঝি অবস্থানে হওয়ায় প্রতিবেশী দেশ ভারত ও মিয়ানমার থেকে অরক্ষিত সীমান্তপথে সবচেয়ে বেশি মাদকের অনুপ্রবেশ ঘটে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর মাদকের প্রবেশপথ হিসেবে বাংলাদেশের সীমান্ত সংলগ্ন ৩২টি জেলাকে ঝুঁকিপূর্ণ জেলা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। বাংলাদেশের পূর্ব সীমান্ত দিয়ে ভারতের আসাম, ত্রিপুরা এবং মিজোরামের চারটি পয়েন্ট দিয়ে সিলেট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা এবং ফেনীতে মাদক ঢুকছে। বিজিবির প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়, মিয়ানমারে ইয়াবা তৈরির কারখানা আছে ২৯টিরও বেশি। এসব কারখানায় উৎপাদিত ইয়াবার সিংহভাগ পাচার হয় বাংলাদেশে। মিয়ানমারের আইসের বাজার বাংলাদেশমুখী। সাম্প্রতিককালে সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত ঢাকার কেরানীগঞ্জে রঙের কারখানার আড়ালে ১০ বছর ধরে ইয়াবা উৎপাদনের সংবাদ খুবই হতাশাব্যঞ্জক।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের দায়িত্বে শিথিলতায় অসাধু মাদক কারবারিদের বেপরোয়া কর্মকা-ে মাদক দেশে ভয়ানক আকার ধারণ করেছে। স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে দেশের প্রতিটি নগর-শহরের অলিগলিতে হাত বাড়ালেই মিলছে মাদক। শহরের বাইরে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলেও মাদক এখন সহজলভ্য। পাশাপাশি তরুণদের অনেকেই অনলাইনেও রমরমা মাদকের ব্যবসা চালাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি বাড়ানো হলেও, বিভিন্ন কৌশলে মাদক কারবারিরা দেশে মাদকের চালান স্থানান্তর করছে। অ্যাম্বুলেন্স, সবজিসহ নিত্যপণ্যের গাড়িতে ইয়াবা, ফেনসিডিল, হেরোইনসহ নানা মাদক তারা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে যাচ্ছে। সুস্পষ্ট যে, ধর্ষণ-হত্যা-ছিনতাই-রাহাজানিসহ বহুমাত্রিক অপরাধের মূলে রয়েছে এই মাদক। বিভিন্ন সময়ে পরিচালিত মাদকবিরোধী অভিযানে ভয়াবহ এসব মাদকের চালান-বাহকরা গ্রেপ্তার হলেও মূল হোতা ও মাদক কারবারির পৃষ্ঠপোষকরা হাতের নাগালের বাইরে থেকে যাচ্ছে। দেশের সচেতন মহলের দাবি, মাদক পাচার-সেবন বন্ধ করতে মাদকের চাহিদা কমানোর পাশাপাশি জোগানও হ্রাস করতে হবে। এছাড়াও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের প্রয়োগ ও অনমনীয় বাস্তবায়ন, মাদক ব্যবহারের ধ্বংসাত্মক প্রভাব সম্পর্কে গণসচেতনতা তৈরি, সীমান্ত এলাকা সুরক্ষিত করে মাদক চোরাচালান কমানো এবং মাদকাসক্তদের সামাজিক-সাংস্কৃতিক-ক্রীড়ায় সম্পৃক্তকরণসহ যথাযথ পুনর্বাসন করা গেলে মাদকের বেপরোয়া আগ্রাসন অনেকটা বাধাগ্রস্ত করা সম্ভব।
বর্তমান সরকারের উদ্যোগে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮ (সংশোধন) ২০২৬- এর খসড়া প্রণয়ন আশাব্যঞ্জক। এতে অনলাইনের মাধ্যমে মাদক কারবারের বিরুদ্ধে বিশেষ বিধান যুক্ত সময়োপযোগী পদক্ষেপ। প্রস্তাবিত আইন অনুযায়ী তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, ইন্টারনেট, সামাজিক মাধ্যম, মোবাইল অ্যাপ, এনক্রিপ্টেড মেসেজিং কিংবা অন্য কোনো ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে মাদক বেচাকেনা-সরবরাহ-পরিবহন বা বিতরণ করা ফৌজদারি অপরাধ। যথাযথ প্রায়োগিক ব্যবস্থা গ্রহণে রাষ্ট্র-সমাজ-পরিবারের ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস অনিবার্য। অন্যথায় সংকট উত্তরণের সব পন্থা রুদ্ধ হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।
লেখক : শিক্ষাবিদ, সমাজবিজ্ঞানী ও জলবায়ু বিশ্লেষক