সংস্কৃতির শেকড় ও শক্তিকে চিনতে হবে...

আপডেট : ২২ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৪৩ এএম

মফিদুল হক একুশে পদকপ্রাপ্ত প্রাবন্ধিক, গবেষক এবং মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের অতীত ভবিষ্যৎ এবং স্মারক ও ইতিহাস সংরক্ষণের নানা খুঁটিনাটি নিয়ে তিনি মুখোমুখি হয়েছেন দেশ রূপান্তরের। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন অনিন্দ্য নাহার হাবীব

প্রশ্ন : মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রতিষ্ঠার ভাবনাটা দিয়ে আলাপটা শুরু করা যেতে পারে। এই ভাবনার শুরু কোথা থেকে?

মফিদুল হক : আমরা আটজন ট্রাস্টি, কিন্তু এই জাদুঘর প্রতিষ্ঠার পেছনে অনেকের ভূমিকা আছে। ১৯৯৬ সাল সেগুনবাগিচায় একটি পুরনো ঔপনিবেশিক ভবনে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের যাত্রা শুরু হয়। তার প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল ১৯৯৫ সালে।

আমরা মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্ম। মুক্তিযুদ্ধ এমন একটা অভিজ্ঞতা, যেটা আমাদের তাড়িত না করে পারে না। এর সঙ্গে এত কিছু জড়িত যে এর অভিঘাত এখনো অনেকটা অনুধাবন করা হয়নি, লিপিবদ্ধও হয়নি। কিন্তু এটা বিদ্যমান, একটা অন্তঃসলিলাভাবে।

স্বাধীনতার পর বিজয়ের আনন্দ-উল্লাস, অনেক প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু স্বপ্নভঙ্গ হতে লাগল। একটা বড় আঘাত এলো ’৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যার মধ্য দিয়ে। যাদের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল, সেই মতাদর্শ, চিন্তা ও রাষ্ট্রাদর্শের অবসান হয়েছে বলে মনে হয়েছিল। আসলে সমাজে অনেক কিছুর জের থেকে যায়। ’৭৫ সালের হত্যাকান্ড ছিল খুব নিষ্ঠুর, নির্মম। এটা শুধু রাজনৈতিক হত্যাকান্ড নয়, একটা মধ্যযুগীয় হত্যাকান্ডের মতো, যেখানে পরিবারের নারী, শিশুও রক্ষা পায়নি।

এরপর ইতিহাসের বিকৃতি ও বিস্মৃতি শক্তিশালীভাবে শুরু হলো। নানা সময়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ হয়েছে, ক্ষমতার হাতবদলও হয়েছে, কিন্তু পালাবদল যে হয়েছে, তা বলা যায় না। হয়তো তীব্রতা কমেছে, কিন্তু এটা বহমান ছিল।

স্বাধীনতার ২৫ বছর সামনে আসছিল। আমরা সমমনা কয়েকজন দেশের পরিস্থিতি নিয়ে আলাপ করতাম আমরা কী করতে পারি? তখন দেখলাম, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণের কোনো জাতীয় উদ্যোগ নেই। বিভিন্ন জায়গায় ছোট ছোট উদ্যোগ ছিল, কিন্তু জাতীয়ভাবে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। সরকারের কাছে দাবি জানালে হয়তো আরও ১৫-২০-২৫ বছর চলে যাবে, এর মধ্যে অনেক স্মারক হারিয়ে যাবে। তখনই মনে হলো, আমরা একটা উদ্যোগ নিতে পারি।

১৯৯৫ সালে মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি ট্রাস্ট গঠন করা হলো। শুরু থেকেই আমাদের উপলব্ধি ছিল, আটজন ট্রাস্টি বা কোনো ক্ষমতাবান গোষ্ঠী একটা মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর তৈরি করতে পারবে না, যদি না সমাজ এটাকে সমর্থন করে এবং নিজেদের প্রয়াস হিসেবে গ্রহণ করে। আমরা মানুষের কাছে আবেদন জানিয়েছিলাম, নিরপেক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তুলে ধরতে চাই। এর জন্য উপকরণ, তথ্য-উপাত্ত ও স্মারক দরকার। আমরা সমাজের সহায়তা চেয়েছিলাম।

প্রশ্ন : কাজটা কতটা কঠিন ছিল?

মফিদুল হক : সহজ ছিল না, আবার সহজও ছিল। মানুষের অন্তরে একটা চাহিদা ছিল, সেটাই সবকিছুকে সহজ করে দিয়েছে। একটা ভাবনাকে বাস্তব রূপ দিতে গেলে নানা রকম চ্যালেঞ্জ থাকে। আমরা বিভিন্ন জেলার বিভাগীয় শহরে গিয়েছি, স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ পরিবার ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলেছি। সবখানেই এই উদ্যোগের প্রতি সমর্থন দেখেছি। ফলে বাধা যা-ই থাকুক, সেগুলো পেরিয়েই মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রতিষ্ঠার দিকে এগিয়েছি।

মুক্তিযুদ্ধকে আমরা বলি জনযুদ্ধ। কিন্তু এই কথাটার বাস্তব রূপ কী? প্রত্যেকটা পরিবার, প্রত্যেকটা মানুষ এর সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল। মানুষের যে আত্মদান, সেটা কোনো একটা জায়গায় সীমিত করে রাখা যায় না।

বাঙালি সমাজ নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে এই জায়গায় এসেছে। সেখানে নেতৃত্বের বিশাল ভূমিকা ছিল, আবার সাধারণ মানুষের সম্পৃক্তিও ছিল। সবটা মিলিয়েই মুক্তিযুদ্ধ। এই সামাজিক শক্তির উদ্বোধন হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধে। আমরা সেই শক্তিটাকে ধারণ করেই মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর করেছি।

প্রশ্ন : সময়ের সঙ্গে সেই সামাজিক শক্তির পরিবর্তন দেখছেন কি? সেটা কেমন?

মফিদুল হক : ইতিহাস সব সময় উত্তুঙ্গ শিখর স্পর্শ করে না বা সেখানেই অবস্থান করে না। আরেকটা শিখরে যেতে হলেও পতন-অভ্যুদয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। ইতিহাসের এটাই বৈচিত্র্য ও শক্তি।

তখন আর এখন আলাদা। কিন্তু তখন বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে একটা জাদুকরী মুহূর্ত তৈরি হয়েছিল। সেটা কোনো জাদুমন্ত্রে নয়, বাস্তবের মধ্য দিয়ে। সেই ইতিহাস থেকে আমি কী আস্থা ও শক্তি পেতে পারি, সেটাই বড় কথা। শুধু হা-হুতাশ করার কিছু নেই।

প্রশ্ন : ইতিহাস সংরক্ষণে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নিয়ে জানতে চাই তথ্যগত ভুল, ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক পক্ষপাত কীভাবে এড়ানো যায়?

মফিদুল হক : মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে আমরা শুরুতেই আলোচনা করে ঠিক করেছিলাম, ইতিহাসটা শেষ করব ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। এর পরের ঘটনায় আমরা যাব না। আমরা মুক্তিযুদ্ধটাকেই তুলে ধরতে চাই। তবে মুক্তিযুদ্ধ মানে শুধু ৯ মাসের যুদ্ধ নয়। এর পেছনে পাকিস্তান পর্ব, বিশ শতকের নানা আন্দোলন, ঔপনিবেশিক শাসন এবং আরও দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে।

আমরা প্রাচীন ইতিহাস থেকে শুরু করেছি। এই গাঙ্গেয় অববাহিকায় নানা সভ্যতার প্রবাহ এসে মিলেছে। বৌদ্ধধর্মের প্রসার, পাল ও সেন যুগ, বাংলায় মুসলিম আগমন, সুলতানি ও মোগল আমল, ঔপনিবেশিক শাসন সবকিছুর মধ্য দিয়ে এই অঞ্চলের মানুষের নিজস্ব পরিচয় গড়ে উঠেছে। সেই পরিচয় ভাষাভিত্তিক, এই নদীবাহিত অঞ্চলের জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত।

এই পরিচয়ের বিপরীতে ধর্মের নামে বিভাজন তৈরির চেষ্টা হয়েছে। বিশেষ করে পাকিস্তান আমলে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের ভিত্তিতে যে রাষ্ট্র গঠিত হয়েছিল, তা এই অঞ্চলের মানুষের ওপর ঔপনিবেশিক শোষণ চাপিয়ে দিয়েছিল। আমরা ইতিহাসকে সেই ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়ে তুলে ধরতে চেয়েছি।

আমাদের লক্ষ্য ছিল মূল্যবোধের উদ্ভব ও বিবর্তনকে ধারাবাহিকভাবে দেখা, কোনো কিছু চাপিয়ে দেওয়া নয়। ইতিহাস থাকছে তথ্য ও দলিলের মধ্য দিয়ে কী ঘটেছে, কে কী করেছেন, কী বলেছেন, কীভাবে মানুষ ভূমিকা পালন করেছে, শিল্প-সাহিত্য ও রাজনৈতিক আন্দোলনে কীভাবে সেসব প্রতিফলিত হয়েছে। কোনো একটি ঐতিহাসিক বয়ান আমরা চাপিয়ে দিতে চাই না। দর্শক সিদ্ধান্ত নেবেন।

১৬ ডিসেম্বরেই ইতিহাস শেষ করার একটা কারণ আছে। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে রাজনৈতিক বিভাজন ও মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে। আমরা চেয়েছি, নতুন প্রজন্মের মতাদর্শ যা-ই হোক, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস যেন সর্বজনীনভাবে আবেদন রাখতে পারে। এটা সবার ঐতিহ্যের অংশ। রাজনৈতিক বিবেচনা যার যার থাকতে পারে, কিন্তু ইতিহাসের সঙ্গে যেন তার সংযোগ তৈরি হয়।

ইতিহাস সংরক্ষণে ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক পক্ষপাত মোকাবিলায় প্রয়োজন ইতিহাস চর্চার উপযুক্ত পদ্ধতি এবং তথ্যনির্ভর দলিল। ইতিহাসকে প্রসারিতভাবে দেখতে হবে। জাতীয় ইতিহাস, রাজনৈতিক ইতিহাস, সামরিক ইতিহাস কিংবা সাধারণ মানুষের ইতিহাস সব দিক বিবেচনায় নিতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, ইতিহাসের ক্ষেত্রে রায় দেওয়ার দিকে না ঝুঁকে চর্চার দিকে মনোযোগী হতে হবে।

প্রশ্ন : মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষদর্শী প্রজন্ম একসময় থাকবে না। তাদের অভিজ্ঞতা কি নতুন প্রজন্মের মধ্যে সঞ্চারিত করা সম্ভব?

মফিদুল হক : ইতিহাসের একটা ধারাবাহিকতা আছে, পরম্পরা আছে। একটা প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে ইতিহাস মুছে যায় না, থেকে যায়। তবে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে ফারাক তৈরি হয়। প্রত্যক্ষদর্শীর অভিজ্ঞতা পরের প্রজন্ম সেভাবে পাবে না। কিন্তু সেটা কীভাবে থেকে যায়, সেটাই প্রশ্ন।

মানুষের স্মৃতিও অনেক সময় বিভ্রান্ত করে। একজন প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষ্যের সঙ্গে আরেকজনের ভাষ্যের পার্থক্য থাকতে পারে। কিন্তু ইতিহাসের দায়িত্ব হলো সেগুলো যাচাই করা। নানা রকম সাক্ষ্য ও দলিলের মধ্য দিয়ে ঘটনা যাচাই-বাছাই হয়। আমি প্রত্যক্ষদর্শী বলে কিছু লিখে দিলেই সেটা ইতিহাস হয়ে যায় না।

কেউ চাইলেই একটা ঘটনাকে অন্যভাবে লিখে, ছবি এঁকে বা কথা বলে পাল্টে দিতে পারে না। ইতিহাসের নিজস্ব যাচাইয়ের পদ্ধতি আছে।

প্রশ্ন : ইদানীং প্রায়ই শোনা যায়, ‘৭১ বড় না ২৪ বড়?’ ইতিহাস সঠিকভাবে জানলে কি এমন প্রশ্ন আসে?

মফিদুল হক : প্রশ্নটা আসলে কোনটা কত বড়, সেটা নয়। দুটোই ঐতিহাসিক ঘটনা। ১৯৭১ সালের ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধ এবং তার সঙ্গে জড়িত নির্মমতা, নৃশংসতার ইতিহাস যখন কেউ জানবে, তখন মূল বিষয় দাঁড়ায় সমাজে ইতিহাসবোধ তৈরি করা। সেই বোধের মধ্য দিয়েই প্রশ্নগুলো বাছাই হয়ে যায়।

আমরা এখন ইতিহাসকে অনেক বেশি রাজনীতি দিয়ে বোঝার, দেখার ও ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করি। ইতিহাস মানে এই নয় যে আমি একটা বই বা পুস্তিকা লিখে দিলাম, আর সেটাই সঠিক ইতিহাস হয়ে গেল। ইতিহাস চর্চার বিষয়। ইতিহাসের প্রতি সম্মানবোধ রাখতে হবে। ইতিহাস চর্চা যত বেশি করতে পারব, এই প্রশ্নগুলো তত সুন্দরভাবে মোকাবিলা করতে পারব।

প্রশ্ন : সামাজিক মাধ্যমের এই সময়ে জাদুঘর কি পিছিয়ে পড়ছে? এগুলোকে আরও আধুনিক করার সুযোগ আছে?

মফিদুল হক : একটা জাদুঘরের দায় হচ্ছে সমাজের সঙ্গে সেতুবন্ধ তৈরি করা। আর সমাজ পাল্টে যাচ্ছে। ১৯৭১ সালের সঙ্গে তুলনা করলে পরিবর্তনগুলো অবিশ্বাস্য মনে হয়। সামাজিক মাধ্যম পাল্টে যাচ্ছে, মানুষের তথ্য আহরণের পথ-পদ্ধতি পাল্টে যাচ্ছে। অনেক তথ্য এখন হাতের কাছে।

এই তথ্যের সমুদ্রে মানুষ যখন মুখোমুখি হয়, তখন আগের পদ্ধতিতে চলা কঠিন। অল্প সময়ে অনেক কিছু জানার একটা ইতিবাচক দিক আছে। কিন্তু অ্যালগরিদমের মাধ্যমে তথ্য সাজানোর একটা ঘাটতিও রয়েছে। আমি অনেক কিছু জানতে পারছি, কিন্তু সবকিছু জানতে পারছি না।

তাই জাদুঘরকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করা গুরুত্বপূর্ণ। এখন বলা হয়, ‘মিউজিয়াম উইদাউট ওয়ালস’। জাদুঘরে আসতে হলে আগারগাঁওয়ে গিয়ে টিকিট কেটে চারটি গ্যালারি দেখতে হবে এর বাইরে ভার্চুয়াল মিউজিয়াম হতে পারে কি না, আরও অন্যভাবে মানুষের কাছে পৌঁছানো যায় কি না, এগুলো আমাদের বড় চ্যালেঞ্জ।

এটা শুধু জাদুঘরের প্রশ্ন নয়। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও যোগাযোগমাধ্যম ঘৃণা এবং হিংসা প্রচারের জায়গা হয়ে উঠছে। বাকস্বাধীনতা থাকবে, সেটাকে নিয়ন্ত্রণ করা হবে না; কিন্তু কেউ অন্যকে লক্ষ্য করে সহিংসতা তৈরি করতে পারবে না। পুরো সমাজকে এই বিষয়গুলো নিয়ে ভাবতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে। এখন শুধু সাক্ষরতা নয়, ডিজিটাল সাক্ষরতারও প্রয়োজন।

সভ্যতা পাল্টে যাচ্ছে। সেই সভ্যতাকে ইতিবাচক দিকে নিয়ে যাওয়ার দায় আমাদের। পৃথিবীজুড়েই হিংস্রতা, হানাহানি ও রক্তপাত বেড়েছে। তরুণ প্রজন্মকে এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হচ্ছে। ভার্চুয়াল জগতে বুঁদ হয়ে থাকলেও বাস্তব জীবনের চ্যালেঞ্জ এড়ানো যাবে না। আমরা একটা যুগসংকটের মধ্যে আছি।

প্রশ্ন : পরবর্তী প্রজন্মের হাতে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের দায়িত্ব তুলে দেওয়ার বিষয়ে আপনাদের ভাবনা কী?

মফিদুল হক : দায়িত্ব থাকবে কি থাকবে না, সেটা প্রশ্ন নয়। এটাই সত্য। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর বহু উপকরণ জমা হওয়ার মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে। এটা মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে বড় তথ্যভা-ার হিসেবে গড়ে উঠেছে। এখানে শুধু তথ্যই আছে এমন নয়। এখানে মানুষের কষ্টের গল্প আছে, বাধার বিপরীতে লড়াইয়ের ইতিহাস আছে।

এসব সমাজের কাছে তুলে ধরতে বড় সামাজিক উদ্যোগ দরকার। আমাদের দেশে শিক্ষা ও জাদুঘরের মধ্যে সম্পৃক্তির অভাব আছে। পৃথিবীর অনেক দেশে শিক্ষার সঙ্গে জাদুঘরের একটা সম্পর্ক থাকে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদের জাদুঘর ঘুরে দেখার বিষয়টি নেই।

অথচ সারা দেশে অনেক ঐতিহাসিক স্থান রয়েছে। পাহাড়পুর, ময়নামতী বা ধরো ষাটগম্বুজ মসজিদ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছেলেমেয়েরা সেখানে যাবে না কেন? সেখানে গেলে তারা সরাসরি ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত হবে। সারা দেশের বধ্যভূমিগুলোও যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা দরকার। সরকার স্থাপনা করে দিলেই হবে না, সেগুলোকে সমাজের সঙ্গে সংলাপ তৈরি করতে হবে।

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর হয়তো এসব উপলব্ধি সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করছে, কিন্তু এটাকে পুরো সামাজিক উদ্যোগে পরিণত হতে হবে। শ্রেণিকক্ষের বাইরে গিয়ে শিক্ষার তাগিদ তৈরি করতে হবে। এসব বিষয়কে রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের বাইরে নিয়ে আসা দরকার। আমাদের রাষ্ট্র নতুন, একাত্তরে জন্ম নিয়েছে, কিন্তু সভ্যতা প্রাচীন। ফলে গণমাধ্যম, শিক্ষাব্যবস্থা, অভিভাবক ও গবেষক সবারই দায়িত্ব আছে।

প্রশ্ন : গবেষণা ও শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে তরুণদের মধ্যে হতাশা আছে। তারা অনেক সময় শিক্ষকদের সঙ্গেও যোগাযোগ করতে পারেন না। এ অবস্থায় কী করা উচিত?

মফিদুল হক : এই অঞ্চলের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যাবে, একটা কঠোর, শক্ত রাষ্ট্র কখনো এখানে সবকিছু করে দেয়নি। রাষ্ট্র তখনই সার্থকতা পেয়েছে, যখন সমন্বয়ের মধ্য দিয়ে চলেছে। আর সংঘাতের মধ্যে গেলেই অধঃপতন হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, এটা কোনো সরকারি নির্ভর প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠেনি। মানুষের সহায়তার ওপরেই দাঁড়িয়ে গেছে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯০৫ সালে একটা বিষয় শনাক্ত করেছিলেন পাশ্চাত্য রাষ্ট্রপ্রধান, আর প্রাচ্য সমাজপ্রধান। সমাজের শক্তিকে জাগিয়ে তুলতে হবে। তিনি যে আত্মশক্তির কথা বলেছিলেন, আমরা দৃঢ়ভাবে মনে করি, সেই আত্মশক্তিতেই জাগরণ সম্ভব। বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করা যাচ্ছে না বা প্রশাসনের সহায়তা নেই, তখন ভাবতে হবে, ‘আমরা কী করতে পারি?’

আমরা এখন অনেক বেশি রাষ্ট্রনির্ভর বা সরকারনির্ভর হয়ে যাচ্ছি। কমিউনিটি ভ্যালুগুলোকে উপেক্ষা করছি। আগে দূর-দূরান্তের সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও একেকটা উৎকর্ষকেন্দ্র ছিল। শিক্ষার বিস্তারের সঙ্গে সমাজের গভীর সম্পৃক্তি ছিল। জাতীয়করণ করতে গিয়ে সমাজের সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সম্পর্কটা দুর্বল করে ফেলেছি। সরকারের সহায়তা থাকবে, কিন্তু সমাজের সম্পৃক্তিটাই মূল হতে হবে। শত ফুল ফুটতে দেওয়ার মতো পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

প্রশ্ন : কবিতা অনুবাদ, প্রকাশনা, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কাজ এত কিছু একসঙ্গে কীভাবে সামলান?

মফিদুল হক : এটা তো জীবনের আনন্দ! আমরা খুব ভাগ্যবান একটা প্রজন্ম। পাকিস্তান আমলের পীড়নের বিপরীতে যে জাগরণ, তার সঙ্গে আমরা কোনো না কোনোভাবে সম্পৃক্ত হতে পেরেছিলাম। এই জাগরণ মূলত ছিল সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ। সেই সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ পরে রাজনৈতিক প্রতিরোধ হলো, শেষ পর্যন্ত সশস্ত্র প্রতিরোধে রূপ নিল।

এর গোড়ায় ছিল ভাষাভিত্তিক পরিচয় ও আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্য। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে শুধু আন্দোলন নয়, গান গাইতে হবে, কোন গান গাইতে হবে, কীভাবে পরিবেশন করতে হবে, শহীদ মিনার কীভাবে সাজানো হবে এ সবের মধ্য দিয়েও বাঙালিত্বের ধারণা তৈরি হচ্ছিল। ওই সময়টাই আমাদের বহুসাংস্কৃতিক করে দিয়েছে। চলচ্চিত্র ও নাটকের মধ্য দিয়ে নতুন ভাষা তৈরি হচ্ছিল। ব্যক্তিগতভাবেও দেশ-বিদেশের বহু বিচিত্র মানুষের সঙ্গে মেলামেশার সুযোগ পেয়েছি। মুক্তিযুদ্ধ হয়ে বাংলাদেশ হয়েছিল বলেই এই অভিজ্ঞতাগুলো সম্ভব হয়েছে।

প্রশ্ন : বর্তমান সমাজে দ্রুত বিচার করে ফেলার প্রবণতা কি বেড়েছে?

মফিদুল হক : মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি হলো সে জানতে চায়, বুঝতে চায়, বিকশিত হতে চায়। তবে রাজনীতি বা পারিপার্শ্বিকতার কারণে যে মূল্যবোধ তৈরি হচ্ছে, সেখানে একটা পরীক্ষা করা যায় তুমি সমাজে সম্প্রীতি গড়তে পারছ, নাকি সংঘাত তৈরি করছ? মতাদর্শ কি সমাজকে বিভক্ত করছে, নাকি সম্প্রীতির জায়গায় নিয়ে যাচ্ছে?

আমার বিপরীত চিন্তা বা ধর্মের মানুষও তো রক্ত-মাংসের একজন সমঅধিকারসম্পন্ন মানুষ। সংঘাত নিরসন করতে হবে অহিংস উপায়ে।

ছায়ানটে যে বোমা হামলা হয়েছিল, এটা তো ভাবা যায় না যে কেউ ঘটাতে পারে! কিন্তু একটি বিশেষ মতাদর্শই এটা ঘটিয়েছে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর ইউনেসকো প্রতিষ্ঠার সময় তাদের প্রস্তাবনার প্রথম বাক্যটি ছিল, ‘সংঘাত শুরু হয় মানুষের মনে’। তাই মানুষের মনস্তত্ত্বকে শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির মাধ্যমে ইতিবাচক রূপ দিতে হবে।

সমস্যার সমাধান রাষ্ট্র একা করতে পারবে না, সমাজকেই দায়িত্ব নিতে হবে। সমাধান প্রতিটি সংকটেরই আছে।

প্রশ্ন : এত কিছুর পরও আপনি আশাবাদী?

মফিদুল হক : (হেসে) এত কিছুর পরেও কি বোঝা যায় না যে আমি আশাবাদী?

প্রশ্ন : তরুণদের মধ্যে ডিকলোনাইজেশন বা বিনির্মাণ নিয়ে আগ্রহ দেখা যায়। বিষয়টিকে কীভাবে দেখেন?

মফিদুল হক : কেউ যদি ডিকলোনাইজেশনে আগ্রহী হয়, তবে এটা খুবই ইতিবাচক বিষয়। ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে জাদুঘরগুলোতেও বড় আলোচনা হচ্ছে। ঔপনিবেশিক আমলে বহু সম্পদ লুট হয়ে গেছে, সেটা যেমন সত্য, তেমনি এর আদর্শিক ও ঐতিহাসিক দিকটাও দেখতে হবে। ডিকলোনাইজেশন মানে শুধু বাইরে গিয়ে পড়া নয়, আমার নিজের সমাজে এটা কীভাবে কাজ করছে, তা বোঝা।

আমরা প্রায়ই ‘আমরা ওরা’ বিভাজনে আটকে যাই। কিন্তু আমার প্রাত্যহিক জীবনে ঔপনিবেশিকতার প্রভাবটা কী? আমাদের সমাজের মূল সমস্যা হচ্ছে সাম্প্রদায়িকতা। ঔপনিবেশিক শক্তি ধর্মীয় বিভাজনের ওপর ভিত্তি করে রাষ্ট্রসীমা তৈরি করে দিয়ে গেছে, পাকিস্তান তৈরি করেছে। আমাদের সমাজ অতীতে তখনই শক্তিশালী ছিল, যখন এই ধর্মীয় বিভাজনগুলো অতিক্রম করতে পেরেছে।

ডিকলোনাইজেশনের উত্তর আমাদের নিজেদের ইতিহাসেই খুঁজতে হবে। মুক্তিযুদ্ধে নারীদের ওপর নির্যাতন নিয়ে শাহীন আখতারের ‘তালাশ’ উপন্যাসটি কোরিয়ায় অনূদিত হয়ে দারুণভাবে সমাদৃত হয়েছে। কারণ, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে কোরীয় নারীদেরও কমফোর্ট ওমেন হিসেবে একই রকম নিপীড়নের শিকার হতে হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ ও ওকাকুরা একসময় ‘এশিয়া ইজ ওয়ান’ ধারণার কথা বলেছিলেন।

বাংলাদেশের অভ্যুদয় নিজেই ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকারের বিরুদ্ধে বড় আঘাত ও উদাহরণ। ঔপনিবেশিক শক্তি ধর্মের ভিত্তিতে যে রাষ্ট্রকাঠামো চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল, তাকে অস্বীকার করেই বাংলাদেশের জন্ম। তাই ডিকলোনাইজেশন অধ্যয়নের জন্য বাংলাদেশ নিজেই একটা দারুণ ক্ষেত্র।

আফ্রিকার স্বাধীনতাসংগ্রামী আমিলকার কাবরাল ইউনেসকোর এক বক্তৃতায় বলেছিলেন, ‘অ্যাক্ট অব কালচার ইজ অ্যান অ্যাক্ট অব রেজিস্ট্যান্স’। আফ্রিকার ড্রাম বিট শত নির্যাতনের পরও তাদের নিজস্ব সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রেখেছিল। আমাদেরও নিজেদের সংস্কৃতির শেকড় ও শক্তিকে চিনতে হবে। কাজী নজরুল ইসলামও তার কবিতার মধ্য দিয়ে ঔপনিবেশিকতাবিরোধী লড়াইকে বেগবান করেছিলেন।

আমাদের নিজেদের জাতীয় শক্তি ও ইতিহাসকে যথাযথভাবে চর্চা করতে হবে। ডিকলোনাইজেশন নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরও আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন আলোচনা ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের পরিকল্পনা করছে। আমাদের জাতীয় শক্তি বাড়ানোই এখন সবচেয়ে বড় কাজ।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত