নীলফামারীর সৈয়দপুরে শিক্ষার্থীদের বিনা মূল্যে বিতরণের জন্য বরাদ্দ করা সরকারি পাঠ্যবই কেজি দরে বিক্রির অভিযোগ উঠেছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আফরোজ আহমেদের বিরুদ্ধে। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) দুপুরে বিদ্যালয়টিতে বস্তায় ভরে ভ্যানে পাঠ্যবই তোলার দৃশ্য ধারণ করেন স্থানীয় বাসিন্দা ও সাংবাদিকরা। টেন্ডার ছাড়াই গোপনে বই বিক্রির অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
এ ঘটনায় তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা। অন্যদিকে, সৈয়দপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হবে।
জানা গেছে, প্রতিবছরের মতো ২০২৬ সালেও শিক্ষার্থীদের বিনা মূল্যে বিতরণের জন্য সরকারি পাঠ্যবই সংগ্রহ করে বিদ্যালয়টি। তবে শিক্ষার্থীর সংখ্যার তুলনায় অতিরিক্ত চাহিদা দেখিয়ে বই সংগ্রহের পর সেগুলো যথাযথভাবে বিতরণ না করে কেজি দরে বিক্রি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
মঙ্গলবার দুপুরে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা বিদ্যালয়টিতে যান। সেখানে পাঠ্যবই বস্তায় ভরে ভ্যানে তোলার দৃশ্য দেখতে পান তারা।
বই কেনার সঙ্গে যুক্ত এক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, টেন্ডার ছাড়াই ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক তার কাছে প্রতি কেজি ২১ টাকা দরে বই বিক্রি করেছেন। প্রতিটি বস্তায় ৬০ কেজি করে বই রয়েছে বলেও জানান তিনি। ওই ক্রেতার ভাষ্য, ‘আমাদের আর কী করার আছে? আমি ২১ টাকা কেজি দরে বই কিনেছি, বিক্রি করব ২২ টাকা কেজি দরে।’
বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপক ও প্রধান শিক্ষকের যোগসাজশে আগেও এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মচারী দাবি করেন, ব্যবস্থাপক ও প্রধান শিক্ষকের যোগসাজশে বিদ্যুৎ চত্বরে নিয়মিত এ ধরনের কর্মকাণ্ড চলে। তার ভাষ্য, প্রধান শিক্ষক যোগদানের এক বছর হয়েছে। ব্যবস্থাপকের সম্পৃক্ততা না থাকলে প্রধান শিক্ষক কীভাবে এমন ঘটনা ঘটাতে পারেন, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য নিয়ে তদন্ত করার আহ্বান জানান ওই কর্মচারী।
পাঠ্যবই বিক্রির অভিযোগ, বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীসংখ্যা, বইয়ের বরাদ্দ এবং কতটি বই পাওয়া গেছে—এসব বিষয়ে তথ্য জানতে চাইলে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আফরোজ আহমেদ তা দিতে চাননি বলে অভিযোগ করেছেন উপস্থিত সাংবাদিকরা। এ সময় তিনি তাদের ধারণ করা ভিডিও মুছে ফেলার অনুরোধ করেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
প্রধান শিক্ষক বলেন, ‘ব্যবস্থাপকের সঙ্গে কথা হয়েছে। আপনি সম্মানিত মানুষ, আপনারদের সম্মানী দিয়ে দিচ্ছি। ভিডিওগুলো ডিলিট করে দেন।’
এ বিষয়ে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সৈয়দপুরের ব্যবস্থাপক (নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়) প্রকৌশলী মো. গোলাম মোরসেলীন বলেন, ‘বিষয়টি তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
টাকা দিয়ে সাংবাদিকদের ম্যানেজ করার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি তা অস্বীকার করেন। তার দাবি, এ ধরনের কোনো কথা তার সঙ্গে হয়নি। তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগও অস্বীকার করেন তিনি।
সৈয়দপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম প্রামাণিক বলেন, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হবে।
সৈয়দপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারাহ ফাতেহা তাকলিমা মুঠোফোনে বলেন, সরকারি পাঠ্যবই শিক্ষার্থীদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করার গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। এসব বই শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিতরণ না করে কেজি দরে বিক্রি করা হলে তা গুরুতর অনিয়মের মধ্যে পড়ে। এ বিষয়ে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে দ্রুত তদন্ত কমিটি গঠনের জন্য তিনি বলছেন বলেও জানান।
সরকারি পাঠ্যবই শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিনা মূল্যে বিতরণের জন্য বরাদ্দ করা হয়। ফলে এসব বই কীভাবে বিক্রির পর্যায়ে গেল, বিদ্যালয়টি কত পরিমাণ বই সংগ্রহ করেছে, কতটি বিতরণ করা হয়েছে এবং অবশিষ্ট বই বিক্রির কোনো অনুমোদন ছিল কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
বই সংগ্রহ, বিতরণ ও বিক্রিসংক্রান্ত নথি যাচাই করে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন এবং অনিয়ম প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
লিটন ইসলাম নামের এক এলাকাবাসী বলেন, সরকার তাদের সন্তানদের জন্য বিনা মূল্যে পাঠ্যবই দেয়। একজন শিক্ষককে বাবা-মায়ের চেয়েও সম্মানজনক স্থানে রাখা হয় উল্লেখ করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, একজন শিক্ষক কীভাবে এমন কাজ করতে পারেন।
অন্যদিকে, মোজাহারুল ইসলামসহ কয়েকজন এলাকাবাসী অভিযোগ করেন, বিদ্যালয়টিতে নিম্ন আয়ের পরিবারের অনেক সন্তান পড়াশোনা করে। আগে শিক্ষার্থীদের মাসিক বেতন ছিল ৬০ টাকা। তবে বর্তমান প্রধান শিক্ষক যোগদানের পর তা বাড়িয়ে ১৫০ টাকা করা হয়েছে। পাশাপাশি সেশন ফি ও অন্যান্য ফিও বাড়ানো হয়েছে বলে তাঁদের অভিযোগ।
এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের নির্ধারিত গাইড বই কিনতে চাপ দেওয়ার অভিযোগও তুলেছেন তারা। তাদের দাবি, এসব গাইড বইয়ের দাম এক হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা। সরকারি পাঠ্যবই বিনা মূল্যে দেওয়ার পরও শিক্ষার্থীদের কেন অতিরিক্ত টাকা খরচ করে গাইড বই কিনতে চাপ দেওয়া হচ্ছে, সেই প্রশ্ন তুলেছেন অভিভাবকেরা।