নির্বাচনে হেরে যুক্তরাষ্ট্রে ‘পালালেন’ বলসোনারো

পাসপোর্ট বাতিল, অবস্থান নিয়ে জল্পনা ও সীমান্তে তল্লাশির পর মিয়ামিতে পৌঁছেছেন ফ্লাভিও বলসোনারো। তার বিরুদ্ধে ব্রাজিলের সুপ্রিম ফেডারেল কোর্টে চলছে দুটি তদন্ত।

আপডেট : ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:২০ এএম

ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পরাজয়ের পর নানা জল্পনা ও বাধার মধ্যে অবশেষে যুক্তরাষ্ট্রের মিয়ামিতে পৌঁছেছেন দেশটির সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারো। রবিবারের নির্বাচনে বামপন্থী প্রতিদ্বন্দ্বীর কাছে হেরে যাওয়ার পর তার অবস্থান নিয়ে কয়েক দিন ধরে নানা ধরনের খবর ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে তিনি আর্জেন্টিনায় গেছেন বলে খবর প্রকাশিত হয়। পরে মঙ্গলবারই তার যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানোর খবরও সামনে আসে, যদিও তখন তা নিশ্চিত ছিল না। খবর বিবিসি।

ফ্লাভিও বলসোনারো ও তার পরিবারের সদস্যদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের জন্য ভিসা দেওয়ার কথা জানিয়েছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর। তবে ব্রাজিলের কর্তৃপক্ষের কাছে নির্ধারিত ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পাসপোর্ট জমা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় তাঁর ভ্রমণ নথি বাতিল করা হয়। চলমান একটি ফৌজদারি তদন্তের অংশ হিসেবে তাকে পাসপোর্ট জমা দিতে বলা হয়েছিল। ফ্লাভিও অবশ্য তাঁর বিরুদ্ধে কোনো অন্যায়ের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

ব্রাজিলের পুনর্নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা ফ্লাভিওর দেশত্যাগের সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘যাদের লুকানোর কিছু নেই, তাদের ভয় পাওয়ারও কিছু নেই।’

ফ্লাভিওর অবস্থান নিয়ে প্রথম জল্পনা তৈরি হয় আর্জেন্টিনার একটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনের পর। ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, তিনি ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা স্থলসীমান্ত পার হয়ে একটি ব্যক্তিগত উড়োজাহাজে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন। খবরটি গুরুত্বের সঙ্গে নেয় ব্রাজিলের পুলিশ। মঙ্গলবার ভোরে সীমান্ত পারাপারের বিভিন্ন স্থানে তল্লাশি চালিয়েও তার দেশত্যাগের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। আর্জেন্টিনার কর্মকর্তারাও জানান, তার সীমান্ত পার হওয়ার বিষয়ে তাদের কাছে কোনো তথ্য নেই।

এদিকে, ফ্লাভিওর আইনজীবীরা তার অবস্থান সম্পর্কে জানেন না বলে জানানোর পর নতুন করে জল্পনা ছড়িয়ে পড়ে যে তিনি হয়তো ব্রাজিল ছেড়ে চলে গেছেন। পরে একাধিক সূত্র বিবিসি ও অন্যান্য সম্প্রচারমাধ্যমকে জানায়, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের পথে রয়েছেন। বিবিসি ব্রাসিল ও বিবিসি মুন্ডো বলসোনারো পরিবারের ঘনিষ্ঠ তিনজনের কাছ থেকেও তার যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানোর খবর পায়।

ফ্লাভিও ও তার ছোট ভাই এদুয়ার্দো বলসোনারোর ঘনিষ্ঠ এক চাচাতো ভাই বিবিসি ব্রাসিলকে জানান, ফ্লাভিও মিয়ামিতে পৌঁছেছেন। এদুয়ার্দোর আরেক ঘনিষ্ঠ সহযোগী বিবিসি মুন্ডোকে বলেন, ফ্লাভিও তার ছোট ভাইয়ের সঙ্গে মিয়ামিতে রয়েছেন। তবে সে সময় ফ্লাভিও বা এদুয়ার্দোর কারও সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

কয়েক ঘণ্টা পর আর্জেন্টিনার অভিবাসন কর্তৃপক্ষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানায়, স্থানীয় সময় মঙ্গলবার রাতে ফ্লাভিও, তার স্ত্রী ও দুই মেয়ে স্থলপথে আর্জেন্টিনায় প্রবেশ করেন। প্রায় একই সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘আমি শুনেছি, তিনি আর্জেন্টিনায় ছিলেন।’

বিবিসি যাচাই করা উড়োজাহাজের গতিবিধিসংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, বলসোনারো পরিবারের সদস্যরা বুধবার স্থানীয় সময় রাত ১২টা ১৮ মিনিটে আর্জেন্টিনার পুয়ের্তো ইগুয়াজু থেকে ইকুয়েডরের গুয়ায়াকিলের উদ্দেশে রওনা হন। গ্রিনিচ মান সময় তখন ছিল ০৩টা ১৮ মিনিট। সেখানে অল্প সময়ের বিরতির পর একই ব্যক্তিগত উড়োজাহাজ তাদের নিয়ে মিয়ামি-ওপা-লকা নির্বাহী বিমানবন্দরে পৌঁছায়। স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ৯টার কিছু আগে, অর্থাৎ গ্রিনিচ মান সময় দুপুর ১টা ৩০ মিনিটে, তাদের উড়োজাহাজ থেকে নামতে দেখা যায়।

ফ্লাভিওর আগমনের অপেক্ষায় বিমানবন্দরে জড়ো হয়েছিলেন আলোকচিত্রীরা। তিনি বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার সময় তাকে ঘিরে ধরেন তারা। এ সময় তার দলের সদস্যরা ছাতা দিয়ে তাকে আড়াল করার চেষ্টা করেন। এর মধ্য দিয়ে তার অবস্থান নিয়ে কয়েক দিন ধরে চলা জল্পনার অবসান ঘটে।

ফ্লাভিওর বাবা জাইর বলসোনারোও এর আগে ব্রাজিল ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলেন। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে ফ্লোরিডায় চলে যান তিনি। তার উত্তরসূরি লুলার শপথ গ্রহণের আগেই তিনি দেশ ছাড়েন। জাইর তখনো যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছিলেন, যখন তার সমর্থকেরা ব্রাজিলের সরকারি ভবন ও সুপ্রিম কোর্টে হামলা চালান।

অন্যদিকে, এদুয়ার্দো বলসোনারো ব্রাজিলের কংগ্রেস থেকে ছুটি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে বসবাস করছেন। সেখানে তিনি তার বাবার বিরুদ্ধে চলা অভ্যুত্থান মামলায় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তদবির করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্র ব্রাজিলের ওপর শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপ করে এবং দেশটির গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়। এদুয়ার্দোকে তার অনুপস্থিতিতেই দোষী সাব্যস্ত করা হয়।

ফ্লাভিও বলসোনারোর যুক্তরাষ্ট্র সফরের চূড়ান্ত গন্তব্য কী, কিংবা তিনি সেখানে কত দিন থাকবেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়। বর্তমানে ব্রাজিলের সুপ্রিম ফেডারেল কোর্টে তার বিরুদ্ধে দুটি তদন্ত চলছে।

এর একটি তদন্তে তার বাবাকে নিয়ে নির্মিত ‘ডার্ক হর্স’ চলচ্চিত্রের জন্য বেসরকারি ব্যাংক ব্যাংকো মাস্টার থেকে প্রায় ৭ কোটি ডলার স্থানান্তরের ঘটনায় সম্ভাব্য অনিয়ম খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এই অর্থের পরিমাণ প্রায় ৫ কোটি ৩০ লাখ পাউন্ড। দ্বিতীয় তদন্তটি অর্থপাচারের অভিযোগসংক্রান্ত। ফ্লাভিও বলসোনারো উভয় অভিযোগই অস্বীকার করেছেন।

আগামী ৩১ জানুয়ারি তার আট বছরের সিনেট মেয়াদ শেষ হবে। ওই দিন তিনি সংসদীয় দায়মুক্তি হারাবেন।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত