মোবাইলের কাভারে লেখা পঙক্তিটিই সত্য হলো আইআইইউসি ছাত্রীর জীবনে

আপডেট : ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ০৭:৩৭ পিএম

‘জীবন হোক গ্রীষ্মের ফুলের মতো সুন্দর, আর মৃত্যু হোক শরৎকালের (ঝরে যাওয়া) পাতার মতো।’—স্নিগ্ধ গোলাপি রঙের একটি মোবাইল ফোনের কাভারে খোদাই করা ছিল এই কাব্যিক বার্তাটি। এটি আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামের (আইআইইউসি) ইংরেজি বিভাগের দ্বিতীয় সেমিস্টারের শিক্ষার্থী মাইশা মুশফিরাতের। কে জানত, তরুণ মনের এই সুন্দর জীবনবোধের বার্তাটি এত দ্রুত তার নিজের জীবনের পরিণতি হয়ে দাঁড়াবে!

মঙ্গলবার সকালে সীতাকুণ্ডে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের অদূরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় মারা যান মাইশা মুশফিরাত। এসময় আহত হন বিশ্ববিদ্যালয়টির আরও দুই শিক্ষার্থী। 

নিহত মাইশা মুশফিরাত মিরসরাই উপজেলার নয়দুয়ারিয়ার দেওয়ান আলী ভুঁইয়া বাড়ির মৃত সাখাওয়াত হোসেনের মেয়ে। তার নানা নুরুন্নবী ফারুকী মিরসরাই লতিফিয়া কামিল মাদরাসার ভাইস প্রিন্সিপাল। ছোটবেলায় বাবাকে হারানোর পর মাইশা নানার বাড়িতেই লালিত-পালিত হয়েছেন। 

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, বিভাগে একটি অনুষ্ঠান থাকায় ক্লাস স্থগিত করা হয়। মাইশক বিভাগে এসে ক্লাস হচ্ছে না দেখে ফিরে যাচ্ছিল। রাস্তা পার হয়ে মিরসরাইগামী বাসের জন্য অপেক্ষা করছিল। এসময় তার পাশে এসে একটি বাস থামে। মুহূর্তের মধ্যেই একটি লরি বাসটিকে ধাক্কা দিলে মাইশাসহ কয়েকজনের উপর উল্টে পড়ে। মাইশাকে উদ্ধার করে দ্রুত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন। এই ঘটনায় আহত আরও দুই শিক্ষার্থীকে চিকিৎসা শেষে বাড়ি পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। 

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, পঞ্চম শ্রেণীতে পড়া অবস্থায় বাবাকে হারিয়েছিল মাইশা। বাবার স্নেহ-ছায়াহীন সেই শৈশবে তার আশ্রয় হয়ে উঠেছিলেন নানা-নানি। মিরসরাই সদরে নানার বাড়িতেই বেড়ে ওঠা, সেখান থেকেই পড়াশোনা। নানা নুরুন্নবী ফারুকীর ছিল পিতৃহারা একমাত্র নাতনির প্রতি অপরিসীম স্নেহ। নাতনিকে ঘিরে ছিল তার অনেক স্বপ্ন ও প্রত্যাশা। কিন্তু মাত্র ২১ বছর বয়সে এক সড়ক দুর্ঘটনা সব স্বপ্ন কেড়ে নিল। আদরের নাতনিকে হারিয়ে শোকের ভারে নুয়ে পড়েছে পরিবার।

মাইশার আকস্মিক মৃত্যুতে পরিবারে চলছে শোকের মাতম। আদরের একমাত্র মেয়েকে হারিয়ে বারবার মুর্ছা যাচ্ছেন মা সালমা আক্তার। চমেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে মাতম করে বলেন, পঞ্চম শ্রেণিতে থাকতে তার বাবা মারা যায়। কত কষ্ট করে বড় এতটুকু নিয়ে গেছি। আমার মেয়েকে যুদ্ধ করে আমি পড়ালেখা করাইছি। আমার মেয়ের স্বপ্ন ছিলো সিএ পড়বে। আমার মেয়ের স্বপ্নপূরণ হইলো না।

তিনি বলেন, মেয়ের সাথে সর্বশেষ সোমবার রাতে দুই মিনিট কথা হয়েছে। তখন বলেছিল মাথা ব্যাথা করে। এটাই যে শেষ কথা হবে তা কি আমি জানতাম?

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর মোস্তফা মুনির বলেন, ক্লাস না হওয়ায় মাইশা মিরসরাই যেতে বাসের জন্য অপেক্ষায় ছিল। এসময় ৮ নম্বর একটি বাস পাশে এসে দাঁড়ালে একটি লরি এসে তাকে ধাক্কা দেয়। বাসটি উল্টে মাইশাসহ তিন শিক্ষার্থীর গায়ে পড়ে। 

শিক্ষার্থীদের মহাসড়ক ও রেলপথ অবরোধ, তীব্র যানজট

এদিকে দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়টির বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা ওই এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করেন। এতে মহাসড়কের উভয় পাশে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। দেখা দেয় প্রায় ১০ কিলোমিটার যানজট। মহাসড়কের পাশাপাশি ঢাকা-চট্টগ্রাম রেললাইনও অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা। ফলে সীতাকুণ্ডের দুটি স্টেশনে দুটি ট্রেন আটকা পড়ে। এতে বাস যাত্রীদের পাশাপাশি ট্রেনে চলাচলকারী যাত্রীরাও দুর্ভোগের মধ্যে পড়েন। এসময় তারা ক্ষতিপূরণ আদায়, পদচারী-সেতু নির্মাণসহ আট দফা দাবি জানায়। পরবর্তীতে বিকেল সোয়া চারটার দিকে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা ও পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম ঘটনাস্থলে এসে শিক্ষার্থীদের দাবি-দাওয়া পর্যায়ক্রমে মেনে নেওয়ার আশ্বাস দিলে শিক্ষার্থীরা অবরোধ তুলে নেন। এরপর যানবাহন ও ট্রেন চলাচল শুরু হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী চৌধুরী সিয়াম ইলাহী বলেন, ডিসি ও এসপি ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আমাদের দাবিগুলো সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে বাস্তবায়নের আশ্বাস দেওয়ায় আমরা অবরোধ তুলে নিয়েছি। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দাবি আদায় না হলে আমরা অসহযোগ আন্দোলনে যাব।

বার আউলিয়া হাইওয়ে থানার সার্জেন্ট শফিউল ইসলাম বলেন, স্থানীয় লোকজন দুইটি লরি জব্দ করেন। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে জব্দ লরি দুটি ও মিনিবাসটি উদ্ধার করে হাইওয়ে থানায় নিয়ে আসে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত