ব্যস্ততার অজুহাতে ইবাদতে অবহেলা নয়

আপডেট : ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ০১:৪৪ এএম

জীবিকার তাগিদে আমাদের কাজ করতে হয়। পরিবারকে সময় দিতে হয়। এসব জীবনের অংশ। কিন্তু এসব ব্যস্ততার কারণে যখন মানুষ আল্লাহর ইবাদতে অবহেলা করে, তখন তা চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। যে রব মানুষকে জীবন দিয়েছেন, অসংখ্য নেয়ামত দিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছেন, তার জন্যই মানুষের সময় হয় না! অথচ দুনিয়ার প্রতিটি কাজের জন্য মানুষ সময় বের করে নেয়।

ইসলাম দুনিয়াবিমুখ হতে শেখায় না। বরং দুনিয়ার দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি আল্লাহর ইবাদতে যতœবান হওয়ার শিক্ষা দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) ও সাহাবিদের জীবনে এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রয়েছে। তারা রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন, ব্যবসা করেছেন, পরিবারকে সময় দিয়েছেন, যুদ্ধ করেছেন, মানুষের সমস্যা সমাধান করেছেন। এত ব্যস্ততার মধ্যেও ইবাদতের প্রতি তাদের গুরুত্বে কখনো ঘাটতি দেখা যায়নি। তাদের জীবন থেকে আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে।

মানুষের জীবনের মূল উদ্দেশ্য আল্লাহর ইবাদত করা। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি জিন ও মানুষকে কেবল আমার ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছি।’ (সুরা জারিয়াত ৫৬)

এই আয়াত মানুষের জীবনের উদ্দেশ্য স্পষ্ট করে দিয়েছে। মানুষ দুনিয়ায় আসবে, জীবিকা অর্জন করবে, পরিবার গঠন করবে, সমাজে দায়িত্ব পালন করবে। তবে এসবের কোনোটিই তার সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্যকে ভুলিয়ে দিতে পারে না। বরং একজন মুমিনের প্রতিটি বৈধ কাজও সঠিক নিয়ত ও আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে করলে ইবাদতে পরিণত হবে।

ইবাদত বলতে কেবল নামাজ, রোজা ও জিকিরকে বোঝায় না। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হালাল উপার্জন, পরিবারের ভরণপোষণ, মানুষের উপকার এবং দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করাও সওয়াবের কাজ। তবে এসব কাজের অজুহাতে ফরজ ইবাদত অবহেলা করার সুযোগ নেই।

মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন একজন রাসুল, রাষ্ট্রপ্রধান, বিচারক, সেনাপতি, শিক্ষক ও পরিবারের অভিভাবক। অসংখ্য মানুষের দায়িত্ব তার ওপর ছিল। রাষ্ট্র পরিচালনা, সাহাবিদের শিক্ষা, সামাজিক সমস্যা সমাধান, বিভিন্ন গোত্রের সঙ্গে যোগাযোগ এবং যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে হতো তাকে। এত দায়িত্বের মধ্যেও তিনি ইবাদতের প্রতি ছিলেন অত্যন্ত যতœবান।

আয়েশা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) রাতে এত দীর্ঘ সময় নামাজ পড়তেন যে তার পা ফুলে যেত। তাকে বলা হলো, আপনার অতীত ও ভবিষ্যতের সব গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে, তারপরও এত কষ্ট করেন কেন? তিনি বললেন, আমি কি কৃতজ্ঞ বান্দা হব না? (সহিহ বুখারি ৪৮৩৭)

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে নামাজ ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেছেন, ‘আমার চোখের প্রশান্তি রাখা হয়েছে নামাজে।’ (সুনানে নাসায়ি ৩৯৩৯)

সাহাবিরা ছিলেন কর্মব্যস্ত মানুষ। কেউ ব্যবসা করতেন, কেউ কৃষিকাজ করতেন, কেউ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করতেন, কেউ জ্ঞানচর্চায় সময় দিতেন। কিন্তু তাদের কাছে ইবাদত ছিল জীবনের অপরিহার্য অংশ।

আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) সবকিছু থেকে ইবাদতকে প্রাধান্য দিতেন। তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসরণে অত্যন্ত যতœবান ছিলেন। তার সম্পর্কে নাফি (রহ.) বলেন, তিনি রাতে দীর্ঘ সময় নামাজ পড়তেন এবং শেষ রাতে বেতর আদায় করতেন।

আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) ছিলেন সফল ব্যবসায়ী। বিপুল সম্পদের মালিক হয়েও তিনি দান-সদকা ও আল্লাহর পথে ব্যয়ের ক্ষেত্রে অগ্রগামী ছিলেন। তার জীবন প্রমাণ করে, সম্পদ ও ব্যস্ততা ইবাদতের পথে বাধা হয় না।

আবু তালহা (রা.)-এর একটি ঘটনা বিশেষভাবে শিক্ষণীয়। তিনি ছিলেন মদিনার একজন ধনী সাহাবি। তার সবচেয়ে প্রিয় সম্পদ ছিল বায়রুহা নামের একটি বাগান। সুরা আলে ইমরানের ৯২ নম্বর আয়াত নাজিল হলে তিনি নিজের প্রিয় বাগানটি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দান করে দেন। (সহিহ বুখারি ১৪৬১) তাদের কাছে দুনিয়ার সম্পদ ও ব্যস্ততার চেয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি ছিল বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

ইসলাম মানুষকে কাজকর্ম ছেড়ে সারাক্ষণ ইবাদতে মগ্ন থাকতে বলেনি। বরং দুনিয়ার দায়িত্ব পালন এবং আল্লাহর স্মরণে অবিচল থাকার মধ্যে ভারসাম্য শিখিয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘অতঃপর যখন নামাজ শেষ হবে, তখন তোমরা জমিনে ছড়িয়ে পড়বে এবং আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধান করবে। আর আল্লাহকে অধিক পরিমাণে স্মরণ করবে, যাতে তোমরা সফল হতে পারো।’ (সুরা জুমুআ ১০)

এই আয়াতের আগের আয়াতে জুমার আজান হলে ব্যবসা-বাণিজ্য ছেড়ে আল্লাহর স্মরণের দিকে এগিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ প্রয়োজনের সময় জীবিকার কাজ করতে হবে, আবার নামাজের সময় হলে সব ব্যস্ততার ঊর্ধ্বে ইবাদতকে প্রাধান্য দিতে হবে। ইসলাম জীবিকার সন্ধানকে নিরুৎসাহিত করে না, বরং ইবাদতের সঙ্গে জীবনের কাজগুলোকে সমন্বয় করতে শেখায়।

অনেকের ধারণা, জীবনের ব্যস্ততা কমলে ইবাদতে মনোযোগী হবেন। চাকরি, ব্যবসা কিংবা পড়াশোনার চাপ শেষ হলে নিয়মিত নামাজ পড়বেন। বয়স বাড়লে কোরআন তেলাওয়াত করবেন। অবসর গ্রহণের পর বেশি বেশি নফল ইবাদত করবেন। এভাবে মানুষ ইবাদতের জন্য ভবিষ্যতের ওপর নির্ভর করে থাকে। অথচ কারও জীবনে অবসর আসবে কি না, তা নিশ্চিত নয়।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘দুটি নেয়ামতের ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত। তা হলো সুস্থতা ও অবসর।’ (সহিহ বুখারি ৬৪১২)

সুস্থতা ও অবসর মানুষের জীবনের মূল্যবান সম্পদ। কিন্তু অনেকেই এগুলোর যথাযথ ব্যবহার করেন না। যখন অসুস্থতা আসে, তখন ইবাদত করতে চাইলেও শরীর সায় দেয় না। যখন বয়স বেড়ে যায়, তখন আগের মতো কর্মক্ষমতা থাকে না। তাই সুস্থতা ও সুযোগ থাকতে ইবাদতে মনোযোগী হওয়া জরুরি।

বর্তমান সময়ে মানুষের ব্যস্ততা বেড়েছে। প্রযুক্তি, কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের দৈনন্দিন জীবনে বড় জায়গা দখল করেছে। কিন্তু এসব ব্যস্ততার মধ্যে অনেকেই ইবাদতের জন্য প্রয়োজনীয় সময় বের করতে পারছেন না। আবার অনেক ক্ষেত্রে সময় থাকলেও ইবাদতকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না।

কেউ সকালে ঘুম থেকে উঠে অফিসে যাওয়ার প্রস্তুতি নেন, কিন্তু ফজরের নামাজের জন্য ঘুম থেকে উঠতে পারেন না। কেউ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খোলা রাখতে ব্যস্ত থাকেন, অথচ নামাজের সময় দোকান বন্ধ করতে চান না। কেউ পরীক্ষার প্রস্তুতি, ক্লাস ও পড়াশোনার অজুহাতে নামাজে অবহেলা করেন। আবার কেউ দীর্ঘ সময় সামাজিক মাধ্যমে কাটান, বিনোদনের অনুষ্ঠান দেখেন, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেন, কিন্তু কোরআন তেলাওয়াত কিংবা জিকিরের জন্য কয়েক মিনিটও বের করতে পারেন না।

অনেকের কাছে কাজের সময় এক মিনিট নষ্ট করাও অপছন্দনীয়। অথচ নামাজের সময় পেরিয়ে গেলেও তাদের মধ্যে তেমন অস্থিরতা দেখা যায় না। মোবাইলের চার্জ শেষ হলে দ্রুত চার্জ দেওয়ার ব্যবস্থা করেন, কিন্তু অন্তরের ইমানি শক্তি বাড়ানোর জন্য কোরআন পড়ার সময় বের করেন না। এসব আচরণ আমাদের অগ্রাধিকার নির্ধারণের দুর্বলতাই প্রকাশ করে।

এমনকি অনেকে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়লেও কাজের চাপে তা নির্ধারিত সময় থেকে পিছিয়ে দেন। কেউ নামাজের সময় হলে ভাবেন, কাজটি শেষ করেই পড়বেন। এভাবে এক ওয়াক্তের পর আরেক ওয়াক্ত চলে আসে। অথচ সময়মতো নামাজ আদায় করা আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয় আমল।

আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করলাম, আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল কোনটি? তিনি বললেন, ‘সময়মতো নামাজ আদায় করা।’ (সহিহ বুখারি ৫২৭)

একজন চাকরিজীবী কর্মক্ষেত্রে নামাজের সময় অনুযায়ী কাজের পরিকল্পনা করতে পারেন। একজন ব্যবসায়ী নামাজের সময় দোকান বন্ধ রেখে জামাতে অংশ নিতে পারেন। একজন শিক্ষার্থী পড়াশোনার রুটিনে নামাজের সময় নির্ধারণ করতে পারেন। একজন গৃহিণী সংসারের কাজের ফাঁকে কোরআন তেলাওয়াত ও জিকির করতে পারেন। যাতায়াতের সময়ও অনেকে জিকির, দরুদ ও প্রয়োজনীয় ইসলামি জ্ঞান অর্জনে সময় দিতে পারেন।

তবে মনে রাখতে হবে, নফল আমলের পরিমাণ বাড়াতে গিয়ে ফরজ দায়িত্ব অবহেলা করা যাবে না। পরিবারের ভরণপোষণ, মানুষের অধিকার ও কর্মক্ষেত্রের দায়িত্বও যথাযথভাবে পালন করতে হবে। কারণ মানুষের হক নষ্ট করে ব্যক্তিগত ইবাদতে মগ্ন থাকাও ইসলামের শিক্ষা নয়।

ইবাদতে যতœবান হতে হলে প্রথমেই জীবনের অগ্রাধিকার ঠিক করতে হবে। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজকে দিনের প্রধান কাজ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। কাজের পরিকল্পনা এমনভাবে করতে হবে, যাতে নামাজের সময় বাদ না পড়ে। প্রতিদিন কোরআন তেলাওয়াতের জন্য নির্দিষ্ট সময় রাখা প্রয়োজন। অল্প হলেও নিয়মিত আমল করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল হলো যা নিয়মিত করা হয়, যদিও তা অল্প হয়।’ (সহিহ বুখারি ৬৪৬৪)

তাই একদিন অনেক নফল ইবাদত করে পরবর্তী সময়ে ছেড়ে দেওয়ার চেয়ে প্রতিদিন অল্প অল্প করে নিয়মিত ইবাদত করা উত্তম। পাশাপাশি ঘুম, কাজের সময়ও নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। অপ্রয়োজনীয় কাজে সময় নষ্ট করার অভ্যাস পরিহার করতে হবে।

মানুষ জানে, একদিন তাকে পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হবে। কিন্তু মৃত্যুর প্রস্তুতি নেওয়ার ক্ষেত্রে অনেকেই উদাসীন। মনে করেন, এখনো অনেক সময় বাকি। অথচ মৃত্যু কখন আসবে, তা কারও জানা নেই। তাই আগামীকাল থেকে শুরু করার চিন্তা বাদ দিয়ে আজ থেকেই আল্লাহর দিকে ফিরে আসা প্রয়োজন।

লেখক : ধর্মীয় নিবন্ধকার

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত