ভাষা সৈনিক ও একাত্তরের শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের কুমিল্লা নগরীর ধর্মসাগর পাড়ের বাসভবনে থাকা ওয়ারিশানের নামযুক্ত সাইনবোর্ড ভেঙে ফেলে দিয়েছে এনসিপি।
দলটির নেতাকর্মীরা বলছেন, মালিকপক্ষ বাড়িটি বিক্রির চেষ্টা করছেন বলে তারা জানতে পেরেছেন। তারা চান, ঐতিহ্যবাহী এই বাড়িটি সংরক্ষণ করে স্মৃতি জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করা হোক।
সাইনবোর্ড ভেঙে ফেলে দেওয়ার একটি ভিডিও এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদে উর্দু ও ইংরেজির পাশাপাশি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি উত্থাপন করে ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছেন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। ১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ রাতে কুমিল্লার বাসভবন থেকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তাকে ও তার ছেলে দিলীপ কুমার দত্তকে ধরে নিয়ে যায়। এরপর তাদের আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৭ সালে তাকে মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করা হয়।
বিভিন্ন সময়ে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বাড়িটি সংস্কার, স্মৃতি জাদুঘর প্রতিষ্ঠা ও সংরক্ষণের দাবি উঠলেও বাস্তবায়ন করেনি কেউ। সম্প্রতি শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের নাতনি আরমা দত্ত ওই সম্পত্তির বৈধ ওয়ারিশ দাবি করে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেন। পারিবারিক উত্তরাধিকার সূত্রে তিনি এই সম্পত্তির ওয়ারিশ।
সাইনবোর্ডে লেখা ছিল- “এই জমির প্রকৃত মালিক ওয়ারিশ সূত্রে আরমা দত্ত। পিতা মৃত সঞ্জিব দত্ত। দাগ নং ১৮০০, মৌজা ছোটরা, খতিয়ান নং- ২০২৬-১০০১৩০, কুমিল্লা সদর।”
আরমা দত্ত শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বড় ছেলে সঞ্জিব দত্তের মেয়ে। একাদশ ও দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি সংরক্ষিত নারী আসনে সংসদ সদস্য ছিলেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, শুক্রবার সন্ধ্যার পর এনসিপি নেতারা সেখানে গিয়ে প্রথমে বাড়িটি সংরক্ষণের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বক্তব্য দেন এবং পরে সাইনবোর্ড ভেঙে ফেলেন।
পরে রাতে এনসিপি কুমিল্লা মহানগর শাখার সদস্যসচিব মাসুমুল বারী কাওসার স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটি কোনো সাধারণ স্থাপনা নয়; এটি ভাষা আন্দোলন ও মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ঐতিহ্য। তাই বাড়িটি ব্যক্তিগত বেচাকেনার বিষয় না করে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সংরক্ষণ করতে হবে।
এ বিষয়ে এনসিপি কুমিল্লা মহানগর শাখার সদস্যসচিব মাসুমুল বারী কাওসার বলেন, “আমরা জানতে পেরেছি, বাড়ি বিক্রির প্রচেষ্টা হিসেবে সেখানে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দিয়ে পুরাতন স্থাপনা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তাই বাড়ি বিক্রি প্রতিহত করতে সেখানে ঝুলানো সাইনবোর্ড ভেঙে দেওয়া হয়েছে।
“আমরা একটি ঐতিহাসিক বাড়ি রক্ষা করতে সাইনবোর্ড ভেঙে ফেলেছি। এখানে অন্য কোনো উদ্দেশ্য নেই। এ কাজে আশা করি সরকার ও ওয়ারিশ হিসেবে আরমা দত্তকে পাশে পাব।”
তবে এ বিষয়ে সাবেক সংসদ সদস্য আরমা দত্ত বলেন, “এটা আমাদের পৈত্রিক সম্পত্তি। আমি এর বৈধ ওয়ারিশ। এটা কুমিল্লাবাসীও জানে। তাই এ বাড়িটির জায়গা আমি কি করবো, রাখবো না বিক্রি করবো- এটা একান্তই আমার ব্যক্তিগত বিষয়।
“কিন্তু রাতে এভাবে একটি বাড়ির বৈধ সাইনবোর্ড ভেঙে দেওয়ার বিষয়টি দুঃখজনক। আমি প্রশাসনকে বিষয়টি অবহিত করবো।”
এ বিষয়ে কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি তৌহিদুল আনোয়ার বলেন, “শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বাড়ির সাইনবোর্ড কারা ভেঙেছে, তা জানা নেই। লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্তপূর্বক আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”