শিশুমৃত্যুর প্রধান কারণ নিউমোনিয়া

আপডেট : ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ০১:১২ এএম

ডা. মারিয়া কিবতিয়ার

শিশুরোগ ও নবজাতক রোগ বিশেষজ্ঞ।

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়

১২ নভেম্বর বিশ্ব নিউমোনিয়া দিবস। বাংলাদেশে শিশুস্বাস্থ্যের জন্য নিউমোনিয়া এখনো একটি বড় উদ্বেগের নাম। বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু ও বয়স্করা এ রোগে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। শীতের আগমনে বাড়ে শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণের আশঙ্কা। অপুষ্টি, বায়ুদূষণ, ঘনবসতিপূর্ণ পরিবেশ এবং সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে রোগটি জটিল হয়ে ওঠে। তবে সচেতনতা, সময়মতো টিকাদান, পুষ্টি নিশ্চিত করা এবং দ্রুত রোগ শনাক্ত ও যথাযথ চিকিৎসার মাধ্যমে নিউমোনিয়াজনিত মৃত্যু অনেকটাই প্রতিরোধ সম্ভব। এবারের প্রতিপাদ্য তাই আধুনিক টিকা, উন্নত রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসাসেবার সুফল সবার কাছে পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি নিউমোনিয়া মোকাবিলায় নতুন করে উদ্যোগী হওয়ার আহ্বান।

গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে ৫ বছরের কম বয়সী শিশুমৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ নিউমোনিয়া। একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রতি ৩৯ সেকেন্ডে একজন শিশু নিউমোনিয়ায় মারা যায়। এখনো আমাদের দেশে ৫ বছরের নিচে শতকরা ১৩ শতাংশ শিশুর মৃত্যুর প্রধান কারণ নিউমোনিয়া। তবে সঠিক সময়ে টিকা দেওয়ার মাধ্যমে এবং সঠিক চিকিৎসা পদ্ধতি জোরদার করার মাধ্যমে নিউমোনিয়া দ্বারা বছরে প্রায় ৪২ হাজার শিশুমৃত্যু কমিয়ে আনা সম্ভব।

নিউমোনিয়া রোগের কারণ

শরীরে ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাস সংক্রমণের জন্য ফুসফুসে প্রদাহ তৈরি হলে এটিকে নিউমোনিয়া বলে। নিউমোনিয়া ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া যেকোনো কারণে হতে পারে। ব্যাকটেরিয়াজনিত কারণে নিউমোনিয়া হলে বাচ্চার অনেক বেশি জ¦র থাকে সেই সঙ্গে ঘন কফযুক্ত কাশি থাকে। ভাইরাসজনিত কারণে নিউমোনিয়া হলে বাচ্চার জ¦র থাকে সে সঙ্গে সর্দি, কাশি থাকে এবং দেখা যায় পরিবারের অন্য সদস্যদের মধ্যেও কেউ কেউ সেই সময়টিতে জ¦র, সর্দি, কাশিতে আক্রান্ত হয়ে থাকে। এ ছাড়া বাচ্চার ঘন ঘন নিউমোনিয়া হলে যক্ষ্মা, জন্মগত হার্টের সমস্যা, ইমুনোডেফিসিএন্সি এই জিনিসগুলো মাথায় রাখতে হয়।

করণীয়

বাচ্চার যদি নিউমোনিয়ার লক্ষণগুলো কম মাত্রায় থাকে তাহলে বাসাতেই বাচ্চাকে চিকিৎসা দিতে হবে।

জ্বরের জন্য বাচ্চাকে প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধ দিতে হবে সেই সঙ্গে ঘন ঘন কুসুম গরম পানি দিয়ে বাচ্চার গা মুছে দিতে হবে। কাশি ও সর্দির জন্য বাচ্চাকে একটু একটু করে গরম পানি খাওয়াতে হবে। মধু, তুলসী পাতার রস, লাল চা খাওয়ানো যেতে পারে। অ্যান্টিহিস্টামিন, কফ সিরাপ দেওয়া যেতে পারে। ভাইরাল ইনফেকশন চিন্তা করলে বাচ্চাকে প্রচুর পরিমাণে তরল এবং ভিটামিন সি জাতীয় খাবার খাওয়াতে হবে। নাক বন্ধ থাকলে নরমাল স্যালাইন ড্রপ অথবা জাইলোমেটাজলিন, অক্সিমেটাজলিন ড্রপ দেওয়া যেতে পারে। বমি হলে অ্যান্টিইমেটিক সিরাপ দিতে হবে। ওষুধের দোকান থেকে ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া যেকোনো অ্যান্টিবায়োটিক অথবা অন্য কোনো ওষুধ খাওয়ানো যাবে না। বাচ্চার শরীর খারাপ হয়ে যাওয়া অথবা হাসপাতালে ভর্তি করার লক্ষণগুলোর দিকে খেয়াল রাখতে হবে। বাচ্চার যদি ঘন ঘন নিউমোনিয়া হয়, অনেক জ¦র থাকে, ঘন কফযুক্ত কাশি হয় তাহলে সঙ্গে সঙ্গে একজন শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ গ্রহণ করতে হবে।

কখন বাচ্চাকে হাসপাতালে ভর্তি করবেন

বাচ্চার বয়স ১ মাসের কম হলে। বাচ্চা ঘন ঘন শ্বাস নিলে। নীল হয়ে গেলে। বুকের খাঁচা দেবে গেলে। বুকে ঘর ঘর শব্দ করলে। বাচ্চা খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দিলে। অতিরিক্ত বমি করলে। প্রস্রাবের পরিমাণ কমে গেলে। খিঁচুনি হলে।

প্রতিরোধ

বাচ্চাকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। বাচ্চাকে ঘন ঘন হাত ধোয়ানোর অভ্যাস করাতে হবে, সেই সঙ্গে বাসার বাইরে গেলে মাস্ক পরাতে হবে। এসির তাপমাত্রা ২৬-২৮ সেন্টিগ্রেটে রাখতে হবে, বাচ্চা বেশি ঘামালে বার বার ঘাম মুছে দিতে হবে। সময়মতো ইপিআই শিডিউল অনুযায়ী টিকা দিতে হবে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত